শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৯

আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে কাশ্মীরিরা, হাড়হিম করা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট

রিপোর্ট প্রকাশ করছেন সদস্যরা
কাশ্মীরে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ হওয়ার পরে সেখানকার জনগণের মানবাধিকার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, মতপ্রকাশের অধিকার, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলি নিয়ে জোর চর্চা চলছে বিশ্বজুড়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৩ জন সাংসদ মোদি সরকারের আতিথ্যে ডাল লেকে শিকারা-ভ্রমণ সহ কাশ্মীরের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখেও গেলেন। তাঁদের বড় অংশই কাশ্মীরে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মোদি সরকারের ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে ৫ আগস্টের পর সেখানে যাওয়া সবচেয়ে বড় ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং দলটি যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে– তাতে উঠে আসছে হাড়হিম করা তথ্য। টিমটির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে– বিচারবিভাগ এখন কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে। কাশ্মীরি যুবকদের তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করা হচ্ছে। আর যারা অবশিষ্ট থাকছেন, তারা ট্রমার শিকার হচ্ছেন। আতঙ্ক তাড়া করছে কাশ্মীরি পরিবারগুলিকে– কখন তাদের বাড়ির কোনও সদস্যকে তুলে নিয়ে যায়---এই দুর্ভাবনায়।

এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের সদস্য ছিলেন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী মিহির দেশাই, লারা জেসানি, বীনা গৌড়া, ডি রোজারিও, আরতি মুন্ডকুর ও সরঙ্গ উগালমুগলে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অমিত সেন, ট্রেড ইউনিয়নের নেতা গৌতম মোদি এবং সমাজকর্মী নাগারি বাবাই, রামদাস রাও, স্বাতী শেষাদ্রি। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁরা উপত্যকার ৫টি জেলা ঘুরে কাশ্মীরিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। 

তাঁদের রিপোর্টে কাশ্মীরিদের উপর অত্যাচারের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। শারীরিক অত্যাচারের ফলে চিৎকারের শব্দের রেকর্ডও রয়েছে এতে। রিপোর্টে প্রকাশ, নারী-পুরুষ-বালকদের জননেন্দ্রিয়ে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে এবং আরও নানাভাবে যৌন হেনস্থাও করা হচ্ছে। কিশোর-যুবকরা অনেকে ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। দুশ্চিন্তা– উদ্বিগ্নতা– আতঙ্কে মানসিক সমস্যা বেড়েছে কিশোরদের মধ্যে। বাহিনীর আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে যুবকদের। অনেকে আত্মহত্যার চেষ্টাও করছেন। ইতিমধ্যে আত্মহত্যার খবরও এসেছে দু’টি। তবে যাদের উপর এই অত্যাচার হচ্ছে বা হয়েছে, যারা সাক্ষী ছিল– তারা কেউই নিজেদের নাম প্রকাশ করেনি এই টিমের কাছে। ইতিপূর্বে এমন একটি অত্যাচারের কাহিনি বিবিসিকে জানিয়েছিল একজন। বিবিসি সেটা নিয়ে একটি স্টোরি করে। রাষ্ট্রীয় রাইফেলস সেটা জানতে পেরে শোপিয়ানের সেই যুবকের উপর ফের অত্যাচার চালায় এবং বলতে থাকে– ‘কতবড় সাহস! তুই মিডিয়াকে এ কথা বলেছিস কেন?’

 যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় বিচারবিভাগীয় কাজও কিছু হচ্ছে না বলে অভিযোগ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের। কাশ্মীরের হাইকোর্টের আইনজীবীরা টিমটিকে জানিয়েছে, মানুষ চলাফেরাই করতে পারছে না, তো কোর্টে আসবে কী করে। তাছাড়া ৩৭০ রদের প্রতিবাদে অনেকে আদালতের দৈনন্দিন কাজকর্ম বয়কট করেছে। এমনকী বার অ্যাসোসিয়েশনের নামী আইনজীবীরা গ্রেফতারও হয়েছে। তবে এরই মধ্যে বার অ্যাসোসিয়েশন পাবলিক সেফটি অ্যাক্টে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে আদালতে। বন্দিদের সঙ্গে যাতে পরিবারের লোকেরা দেখা করতে পারে, সে ব্যাপারেও তদারকি করছে তারা। এছাড়া বন্দিদেরকে কী কারণে আটকে রাখা হয়েছে– তার বিচারের জন্য তাদেরকে কোর্টে তোলা হচ্ছে কি না---সে সংক্রান্ত হেবিয়াস করপাস আবেদনগুলিও তারা করছে। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ৫ আগস্ট’১৯-এর আগে প্রায় ২০০ হেবিয়াস করপাস আবেদন বিচারাধীন অবস্থায় ছিল। এখন সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৬০০-তে। অর্থাৎ, অধিকাংশ আটকদের কোর্টে হাজির না করিয়েই তাদের বন্দি করে রাখা হচ্ছে বিনা বিচারে। কাশ্মীরিদের দাবি, ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে ট্রায়াল ছাড়াই বন্দি করে রাখা হয়েছে পাবলিক সেফটি অ্যাকটের অজুহাতে। আর পুলিশও এফআইআর নিতে চাইছে না। ফলে কারা কারা বন্দি রয়েছে, তার কোনও প্রমাণ দেখাতে পারছে না পরিবারের লোকজন।     

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only