রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৯

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এনআরসি নিয়ে ক্ষোভ প্রশান্ত ভূষণ, আরশাদ মাদানি, ইমরানের




এনআরসি নিয়ে দিল্লিতে জাতীয় কনভেনশন


এনআরসি নিয়ে দিল্লিতে ওয়েলফেয়ার পার্টি ও জমিয়তে উলামার জাতীয় কনভেনশনে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সর্বভারতীয় সভাপতি আরশাদ মাদানি, সাংসদ, পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান, জামায়াতে ইসলামি হিন্দের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ সেলিম, অসমের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজসেবী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরি, ছাত্র সংগঠন আমসুর উপদেষ্টা আজিজুর রহমান প্রমুখ। শনিবার দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বিশিষ্টজনদের নিয়ে এনআরসি-বিবোধী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ওয়েলফেয়ার পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি ড. এসকিউআর ইলিয়াস বলেন---রাজনৈতিক স্বার্থে দলিত– সংখ্যালঘু এবং অশিক্ষিত মানুষদের ভয় দেখানোর জন্য এনআরসি করার কথা বলা হচ্ছে। আইনি দিক দিয়ে পুরো পদ্ধতি ভারতীয় সংবিধান-বিরোধী। তাই এই বিষয়ে সমস্ত জাতি– ধর্ম– ভাষার মানুষকে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এনআরসি ইস্যু শুধু মুসলিমদের ইস্যু নয়। এটা ভারতীয় সমস্যা– আন্তর্জাতিক সমস্যা।’

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সর্বভারতীয় সভাপতি হযরত মাওলানা আরশাদ মাদানি বলেন---এটা আল্লাহর  ইচ্ছা যে– অসমে ষাট-সত্তর লাখ মুসলিমকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত সফল হয়নি। তাই আমি সবার কাছে অনুরোধ করব– আপনার নাম দশ জায়গায় আছে তো সব জায়গায় একই করার চেষ্টা করুন। বাবার নাম– মায়ের নাম সব জায়গায় এক রাখার চেষ্টা করুন।

আমরা পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে লড়াই করছি। নেহরু-লিয়াকত চুক্তি অনুযায়ী– সেদিন যে কেউ এ দেশে থাকতে কিংবা পাকিস্তানে যেতে পারত। এই চুক্তির পরেও লক্ষ লক্ষ লোক পাকিস্তান থেকে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে। তারপর লক্ষ লক্ষ মানুষ এদিক-সেদিক হয়েছে। আমরা আইনি লড়াই করেছি। আলহামদুলিল্লাহ– মুসলিমদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে যে অভিযোগ উঠেছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যে পাঁচ-ছয় লাখ মুসলিমের নাম বাদ গিয়েছে, এখনও আইনি পথ খোলা আছে। আশা করি সমাধান আসবে। আমরা আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখি, বাদ পড়া ওই সব মানুষ একদিন ন্যায়বিচার পাবেন।’

তিনি আরও বলেন--- মুসলিমরা এখানে আসেনি– এখান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছে। ফ্রান্স, আমেরিকায় গিয়েছে। মুসলিমরা বাইরে থেকে আসেনি। আমরা অসমে ডি ভোটার থেকে মানুষকে মুক্ত করার যে লড়াই চালাচ্ছি, সেখানে হাজার হাজার হিন্দু আছে। আমরা তাদের জন্যও কাজ করছি। আমরা মানুষের জন্য কাজ করছি।’

মাদানি সাহেব মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন--- শরিয়ত অনুযায়ী ওয়ারিশের অংশ না দিলে কিয়ামতের দিন যা হবার আল্লাহ্ করবেন, কিন্তু দুনিয়াতেও বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হবে। যেমন, অসম সহ বহু জায়গায় মেয়েদেরকে জমি ও সম্পত্তির হিস্যা দেওয়া হয় না। এর ফলে তারা দলিল দেখাতে পারে না। এটা একটি বড় সমস্যা।

সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বলেন– ‘আমার জন্ম সার্টিফিকেট নেই। তাহলে কী হবে? ধর্মীয়ভাবে নাগরিকদের ভাগ করা চলবে না। আমরা কোর্টে লড়াই করব। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে এনআরসি হলে কমপক্ষে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যেন না হয়– সেটা দেখতে হবে। সরকারের উদ্দেশ্য বিভেদের মাধ্যমে এনআরসি করা। এটা হলে দেশের জন্য ভয়ংকর হবে।’

এ দিন এনআরসি কনভেনশনে এসেছিলেন পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান। তিনি বলেন, অসমে ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসেবে যাদের বাছা হয়েছে এবং যেভাবে মানুষকে নোটিফিকেশন দিয়ে পাঁচ-ছয় শত কিলোমিটার দূরে মাত্র এক বা দু’দিনের মধ্যে হাজির হতে বলা হয়েছে, তা ছিল সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এমনও হয়েছে কোন ট্রাইব্যুনাল কতজনকে বিদেশি ঘোষণা করতে পেরেছে– তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়েছে। তারপরও যে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করা হয়েছে– তাতে খুশি নয় বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। এমনকী অসমের প্রভাবশালী মন্ত্রী যিনি আগে কংগ্রেস করতেন ও পরে আরএসএস বিজেপি করেন– সেই হিমন্ত বিশ্বশর্মা ওই তালিকা মানছেন না।’

আহমদ হাসান ইমরান আরও বলেন– ‘বাংলাতেও ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। হিন্দু-মুসলিম সহ কয়েকজন আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছেন– বাংলায় কোনও এনআরসি হবে না। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বিল পাস হলে ওপার থেকে আসা হিন্দু বাঙালিরাও ব্যাপক সমস্যায় পড়বে। কেন-না তাদের প্রমাণ করতে হবে যে– বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে এসেছে। তাছাড়া তাদের নিজেকে প্রথমে বিদেশি ঘোষণা করতে হবে– তারপর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হবে।’

তাঁর মতে, ‘বাংলার মুসলিমরা আরব থেকে, ইরান থেকে, ইরাক থেকে আসেনি। বর্ণবৈষম্যের কারণে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছে। মুসলিমরা এখানকার ভূমিপুত্র। এনআরসি নিয়ে তার পরেও চক্রান্ত হলে অমিত শাহরা ব্যর্থ হবেন।’

দীর্ঘদিন ধরে অসমে এনআরসি নিয়ে আন্দোলন করছে আমসু। ওই সংগঠনের উপদেষ্টা আজিজুর রহমান এ দিনের এনআরসি কনভেনশনে বলেন, অসমে বেনাগরিক হওয়ার আগেই ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর বৈষম্য হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে এনআরসি হলেও নিয়ন্ত্রণ করছে কিছু রাজনৈতিক দল ও আধিকারিক। বাবা-মায়ের নাম এলেও ছেলেমেয়েদের নাম আসেনি। একই লিগ্যাসি তথ্য ব্যবহার করেও একজনের নাম এসেছে তো আর একজনের আসেনি। কিছু অফিসারের জন্য এটা হচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম, এনআরসিতে নাম এলে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু ইচ্ছে করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সে কারণে গত ৩১ আগস্ট নাগরিকপঞ্জির তালিকা প্রকাশ পেলেও কেন নাম বাদ পড়েছে– সেটা জানানো হচ্ছে না। বহু লোক এমন আছে, যাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে ভারতীয় নাগরিক ঘোষণা করা হয়েছে। তবুও তাদের নাম এনআরসিতে আসেনি।’

এ দিনের সভায় দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাছাইকৃত বিশিষ্টজনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী রাজীব দাবান, দিল্লি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অপূর্বানন্দ প্রমুখ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only