মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯

ইন্ডিগো উড়ান: মানবিকতা কিন্তু আসমানে

একাই হাঁটার চেষ্টা করছেন রুবিয়া বিবি। হাতে ক্র্যাচ, পায়ে প্লাস্টার।

আহমদ হাসান ইমরান
১৮ নভেম্বর সোমবার ছিল লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন। অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য এয়ার ইন্ডিয়ার রাতের উড়ান ধরে নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে যখন নামলাম তখন ঘড়িতে প্রায় ১১টা ২০মি.। লাগেজ সংগ্রহের জন্য যখন কনভেয়ার বেল্টের দিকে যাচ্ছি তখন খুব বেশি ভিড় নেই। হঠাৎ দেখি প্রায় বছর সত্তরের একজন মহিলা একা একা হেঁটে চলেছেন। বয়সের ভারে একটু নুয়ে পড়েছেন। লক্ষ্য করলাম, প্রতিটি পদক্ষেপে রীতিমতো তিনি খুঁড়িয়ে চলছেন। বোঝাই যাচ্ছিল তাঁর বেশ কষ্ট হচ্ছে। একটু কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম তাঁর বাঁ-হাতে একটি ক্র্যাচ। আর বাঁ-পায়ের পাতা পর্যন্ত প্লাস্টারে ঢাকা। তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছেন কনভেয়ার বেল্টের দিকেই। পরে তাঁদের কাছ থেকে শুনেছি, ওই মহিলা রুবিয়া বিবি মক্কায় পড়ে গিয়ে বাঁ-পা ভেঙে গিয়েছিল, তাই ওই ভারি প্লাস্টার। তাঁর পোশাক এবং আরও ২-৩ জন যাত্রীকে দেখে মনে হচ্ছিল এঁরা উমরাহ করে ফিরছেন। 
একটু কাছে গিয়ে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলাম, ক্যায়া আপ মক্কা সে আ রাহি হ্যাঁয়? উমরাহ ম্যা গ্যায়িথী? আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন---হ্যাঁ বাবা, আল্লাহর ঘর থেকে ফিরছি। বুঝলাম নিখাদ বাঙালি। বললাম আপনার বাড়ি কোথায়? বুজুর্গ মহিলা জানালেন, কলকাতায়। আমি বললাম কলকাতার কোথায়? জানালেন, বসিরহাটে। সেখানে কোথায়? বৃদ্ধা বললেন কাটিয়াহাটে। 
বিমান সংস্থাটির প্রতি প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। বৃদ্ধার সাথে চলে আমিও তাঁর আকাঙ্খিত ৯নং বেল্টে পৌঁছালাম। দেখলাম সেখানে রয়েছেন তাঁর স্বামী। তাঁরও বয়স হয়েছে। চলতে তাঁরও সমস্যা। তাঁকে অবশ্য হুইল চেয়ার দেওয়া হয়েছে। তিনি বসে আছেন হুইল চেয়ারটিতে। জানা গেল, তাঁর নাম আবদুল কাইয়ুম। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম কোন এয়ার লাইন্সে এসেছেন? বললেন ‘ইন্ডিগো’। তাঁদেরকে সেখানে ছেড়ে আমি খুঁজলাম ইন্ডিগোর আউটলেটটি বিমানবন্দরে কোথায়? জানলাম বেশ খানিকটা দূরে।
স্বামী আবদুল কাইয়ুমের সঙ্গে রুবিয়া বিবি। 
এদিকে এত রাতে যিনি আমাকে নিতে এসেছেন তাঁর বার বার ফোন আসছে। তবুও মনে হল ইন্ডিগোর কোনও অফিসারের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। খুঁজতে লাগলাম এয়ারপোর্ট অথরিটির জিএমআর-এর কাউন্টারটি কোথায়। সেটি ছিল খানিকটা দূরেই। তাঁদের বললাম, ইন্ডিগোর কোনও অফিসারকে ডাকতে। কারণ, ৯নং বেল্টের সামনে বহু খুঁজেও ইন্ডিগোর কোনও স্টাফের আতা-পাতা পাইনি। জিএমআর-এর স্টাফ সব শুনে ফোনে ইন্ডিগোর অফিসারকে খবর দিলেন। এয়ার ইন্ডিয়ার যে ছেলেটি আমার লাগেজ নেওয়ার জন্য সঙ্গে ছিল সে জিএমআর-এর স্টাফদের জানাল আমি একজন সাংসদ। শুনে জিএমআর-এর স্টাফটি নিজেই ইন্ডিগোর কোনও অফিসারকে খুঁজে আনতে গেলেন। ইন্ডিগোর লোগো বুকে লাগিয়ে সুটেড-বুটেড এক স্মার্ট তরুণ হাজির হলেন। তাঁকে বললাম, আপনারা কি মানবিকতা শব্দটি শোনেননি? বললেন কেন? তাঁকে জানানো হল, তাদেরই যাত্রী একজন বুজুর্গ ভদ্রমহিলার সঙ্গে তারা কী ধরনের আচরণ করেছেন। জেদ্দা বা নয়াদিল্লিতে ওই মহিলাকে হুইল চেয়ার ও হেল্পার দেওয়া হয়নি। কেন দেওয়া হয়নি জিজ্ঞেস করাতে তাঁর রাগ হল। বললেন, আমি তো সেখানে ছিলাম না। কিন্তু ইন্ডিগোর এয়ার হোস্টেস সহ গ্রাউন্ড স্টাফরা তো ছিল, তারা কেন মহিলার এই দয়নীয় অবস্থা দেখে কোনও পদক্ষেপ নিল না। এই প্রশ্নে তিনি আরও ক্ষেপে গেলেন। আমি একপ্রকার জোর করে তাঁকে নিয়ে এলাম ওই বৃদ্ধ দম্পতির কাছে। বললাম আমি এই বিষয়টি ছেড়ে দেব না। ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষকে এর জন্য যথেষ্ট ভুগতে হবে। এ কথা শুনে ফোন বের করে তিনি হুকুম দিলেন এখনই একটি হুইল চেয়ার ও একজন হেল্পার নিয়ে এসো। একটু সরে গিয়ে ফোনে আরও কিছু বললেন। ভরসা দিলেন আর কোনও অসুবিধা হবে না। তাঁরাই উমরাহ-প্রত্যাগত এই দম্পতিকে কলকাতাগামী বিমানে তুলে দেবেন। এবার আমি ৬নং বেল্ট থেকে আমার নিজের লাগেজ সংগ্রহ করতে গেলাম। দেখি ততক্ষণে রুবিয়া বিবির জন্য হুইল চেয়ার ও হেল্পার এসে গেছে। ওই অফিসারটি এগিয়ে এসে আমাকে ধরলেন, আর জানালেন সমস্ত ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আর কোনও অসুবিধা হবে না। ওই দম্পতির দুটো বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে বললেন, স্বামীর বোর্ডিং পাসে হুইল চেয়ার কথাটি লেখা আছে। রুবিয়া বিবির বোর্ডিং পাসে তা নেই। তাই নাকি এই বিপত্তি। আবদুল কাইয়ুম সাহেব তখন জানালেন, জেদ্দায় ইন্ডিগো কাউন্টার থেকে তাঁকে হুইল চেয়ার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর জন্য হুইল চেয়ার চাইলে বলা হয়, আর হুইল চেয়ার নেই। মহিলাকে নয়াদিল্লিগামী এই বিমানে যেতে হলে হেঁটেই উঠতে হবে। মনে হল, এঁদের অভিধানে দয়া, মায়া কিংবা মানবিকতা বলে কোনও শব্দ নেই, নেই দায়িত্ববোধও। জেদ্দায় ইন্ডিগোর ব্যবস্থাপকরা ইচ্ছে করলেই তাদের নয়াদিল্লি অফিসে জানাতে পারতেন যে, এক ভদ্রমহিলার জন্য হুইল চেয়ার লাগবে। নয়াদিল্লি বিমানবন্দরের ইন্ডিগো অফিসারটি জানালেন, এখানেও তাঁদের কাছে আর হুইল চেয়ার ছিল না বলে রুবিয়া বিবিকে দেওয়া যায়নি। কিন্তু অমানবিকতার মাত্রা এত চরমে যে হুইল চেয়ার তো নয়ই, একজন হেল্পার বা সাহায্যকারীকেও রুবিয়া বিবির সঙ্গে না দিয়ে তাঁকে একা ছেড়ে দেওয়া হয়। ইন্ডিগোর মতো এয়ারলাইন্সগুলি মুনাফা কামাতেই ব্যস্ত। যাত্রীদের জন্য মানবিকতার প্রয়োজনেও তাদের কোনও হেলদোল নেই। যখন আমি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি দেখলাম ওই দম্পতিকে হুইল চেয়ারে তুলে ইন্ডিগোর কর্মীরা এগিয়ে নিয়ে চলেছে। রুবিয়া বিবির চোখে মুখে খানিকটা স্বস্তির ছাপ। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only