রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯

এখন কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন এপার বাংলার মুসলিমরা? আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় বিশিষ্টজনেরা

অধ্যাপক অমিতাভ কুণ্ডু
সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর দেখা গিয়েছিল, দেশের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরিতে সবচেয়ে পিছিয়ে এ বাংলার মুসলিমরা। স্বাধীনতার পর ৭০ বছর পার হয়ে গেছে। ইতিহাস ও সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাঙালি মুসলিমরা। এখন তারা কোন পথে কীভাবে যাবে--- এসবের সম্ভাবনা ও সমস্যাগুলি নিয়ে শনিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হল আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে। আলিয়ার সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগ এবং বেঙ্গল অ্যাকাডেমিয়া ফর সোশ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট (বেস) আয়োজিত ‘বেঙ্গলি মুসলিম অ্যাট দ্য ক্রসরোডস­ পসিবিলিটিজ অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক এই আলোচনাচক্রে উপস্থিত ছিলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বতন অধ্যাপক অমিতাভ কুণ্ডু, সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, আল আমীন মিশনের সেক্রেটারি এম নুরুল ইসলামম অধ্যাপক আমজাদ হোসেন, কাজী মুহাম্মদ শেরিফ, বাংলাদেশ থেকে আগত অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান খন্দকার, অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল মাতিন, অধ্যাপক অনুসূয়া চ্যাটার্জি, গবেষক সাবির আহমেদ, অধ্যাপক সাইফুল্লা, আবু সালেহ, মির রেজাউল করিম, গাজী আবদুর রহিম প্রমুখ বিশিষ্টজন। এদিনের আলোচনায় মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের সংকট ও উত্তরণের পথ নিয়ে বক্তারা তাঁদের মতামত প্রদান করেন। 

বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান খন্দকার। তিনি বলেন– মধ্যযুগে অনেক মুসলিম কবি ছিলেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও করেন মুসলিম শাসকরা। কিন্তু শাসন ক্ষমতা হারানোর পর ইংরেজ আমল থেকে মুসলিমদের ক্রমশ পশ্চাদপদতা শুরু হয়– যা এখনও চলছে। তিনি এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আধুনিক শিক্ষার দিকে মুসলিমদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। দুই বাংলাকে হাত ধরাধরি করে এগোতে হবে বলেও তিনি মত ব্যক্ত করেন। 

আল আমীন মিশনের সেক্রেটারি এম নুরুল ইসলাম বলেন– আমাদের মধ্যে যে আলো আছে– তা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই সমাজের উন্নতি হবে। অনেকে না জেনে সমালোচনা করেন। এটা ঠিক নয়। গঠনমূলক সমালোচনা চাই। 

সাংসদ ও পুবের কলমের সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান এদিন বলেন, যুক্ত বাংলায় মুসলিম বৌদ্ধিক সমাজ গড়ে উঠেছিল। সেখানে মুসলিমরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। রাজনীতিতেও এসেছিল তারা। হোসেন সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমউদ্দিন, এ কে ফজলুল হকের মতো দাপুটে নেতা বাংলা দেখেছিল। আর এটা মেনে নিতে পারেননি শ্যামাপ্রসাদের মতো উচ্চবর্ণের নেতারা। ফলে এলিট কনফ্লিক্ট দেখা দেয়। দেশ ও বাংলা ভাগের পর এপার বাংলায় মেধাশূন্যতা দেখা দেয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভেঙে পড়ে। তার ফলে মুসলিমরা পিছিয়ে পড়ে। তিনি অসমের উদাহরণ টেনে বলেন, দেশভাগ হলেও অসমের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভেঙে পড়েনি। এর কোপ পড়ে মূলত নিম্নবিত্তের উপর। ৬ লক্ষের বেশি মানুষকে অসম থেকে বিতাড়িত করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। কিন্তু অসমের সঙ্গে বাংলার পার্থক্য ছিল এই যে– বাংলার অগ্রণীরা পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হয়। স্বাধীনতার পরেও দেড় বছর এ দেশে থেকে গিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছে। তাতে তিনি দমে যাননি। 

বিভাগ-পরবর্তী পশ্চিম বাংলার মেধাশূন্য মুসলিমদের আরেক কোপ পড়ে সিপিএম সরকারের ‘অপারেশন বর্গা’র সময়। মুর্শিদাবাদ– মালদার মতো বেশকিছু জেলায় মুসলিমদের জমি এই সময় কেড়ে নেওয়া হয়। বহু মুসলিম জমি হারিয়ে মধ্যবিত্ত থেকে গরিবে পরিণত হয়। বিড়ি বেঁধে– মুড়ি ভেজে– জরির কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করে। আহমদ হাসান ইমরান মন্তব্য করেন, এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা-সচেতন মধ্যবিত্ত মুসলিম বাঙালি সমাজ তৈরি হওয়া সম্ভব ছিল না। সে কাজটি শুরু হয় মিশনারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উদ্যোগে। যাকাত– ফিতরার অর্থে মিশন স্কুলগুলি গড়ে ওঠার ফলে নিম্নবিত্ত মুসলিম ঘরের ছেলেমেয়েরা ডাক্তার– ইঞ্জিনিয়ার– শিক্ষকতা ইত্যাদি পেশার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে এখন একটি মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠেছে। তবে বর্তমানে উচ্চবিত্তরাও তাদের ছেলেমেয়েদের মিশনে পড়তে পাঠাচ্ছেন। তিনি  জোরের সঙ্গে বলেন, এখনই সময় নতুন কিছু করার। তবে আধুনিক মুসলিম প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতির শিকড় যেন না ভুলে যায়– সে ব্যাপারেও তিনি সচেতন করেন।

সংখ্যালঘুদের অবস্থার চিত্র তুলে ধরতে কেন্দ্র সরকার ‘কুণ্ডু কমিটি’ গঠন করে। সেই কমিটির প্রধান, অধ্যাপক অমিতাভ কুণ্ডু হাজির ছিলেন আলোচনা সভায়। স্বভাবতই তাঁর বক্তব্যের দিকে নজর ছিল দশর্কদের। এদিন তিনি বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলিতে মুসলিম জনঘনত্ব নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি তথ্যের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে দেখান– এসসি বা এসটিদের তুলনায় শহরে বসবাসকারী মুসলিমদের সংখ্যার হার ক্রমশ কমছে। তবে মুসলিম মেয়েদের ক্ষমতায়ন অন্যান্যদের তুলনায় বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। মুসলিমদের ক্ষেত্রে কন্যাভ্র*ণ হত্যাও কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। ‘প্রতীচী’র গবেষক সাবির আহমেদ বাংলায় মুসলিমদের কর্মসংস্থানের হাল-হকিকত বর্ণনা করে জানান, রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী প্রভৃতি প্রকল্পের ফলে মুসলিম মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সংখ্যাটি বেড়েছে। তবে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিমদের উপস্থিতি তেমন বাড়েনি বলে মত সাবিরের।

বেস-আয়োজিত এই আলোচনা সভাটি আজও চলবে। দেশ-বিদেশের অধ্যাপক, গবেষকরা তাঁদের সুচিন্তিত মতামত পেশ করবেন।       

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only