রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯

'একপেশে' ও 'স্ববিরোধী' অযোধ্যা রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন ডিএন ঝা, ইরফান হাবিবদের

শীর্ষ আদালতকে চিঠি 

 ৯ নভেম্বর ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ মামলার রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রায় পাঁচশো বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের দাবি মেনে নেয় শীর্ষ আদালত। মুসলিমপক্ষ রায়ে খুশি না হলেও কোর্টকে সম্মান জানিয়ে রায় মেনে নিয়েছে তারা। কিন্তু– বাবরির রায় বেরনোর পরপরই দেশ ও বিদেশের মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে প্রবল সমালোচনার ঝড় তুলেছে। মুসলিমপক্ষকে ৫ একর জমি দেওয়া নিয়েও আপত্তি তুলেছেন অনেকে। মুসলিম নেতৃত্বও জমি না নেওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। যুক্তিবাদী মানসিকতার বহু মানুষ (ধর্ম নির্বিশেষে)– লেখক– ইতিহাস বিশেষজ্ঞ– অধ্যাপক– মানবাধিকার সংগঠন এই রায়ের সমালোচনা করেছে। রায়ে যুক্তি ও প্রমাণের চেয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের অভিমত। মানতে না পেরে এবার সেই একই পথে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানালেন দেশের প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবিদরা। তাঁদের মতে– যাঁরা ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করেন তাঁদের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এই রায়। রিভিউয়ের আবেদনের বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী বিশিষ্টজনদের মধ্যে রয়েছেন ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব– ডিএন ঝা– জ্যোতি ঘোষ– বদ্রি রায়না– সোহাইল হাশমি– অনিল ভাট্টি– অন্তরা দেবসেন– আয়েশা কিদওয়াই– সুধীর চন্দ্র– ধীরেন্দ্র কে ঝা– গার্গী চক্রবর্তী– গীতা কাপুর– কবিতা সিংহ– প্রভাত পট্টনায়েক– রাহুল রায়– প্রশান্ত মুখার্জি প্রমুখ নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা। শিক্ষা ও চর্চার জগতে এরা স্বনামধন্য ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বীকৃত।  

তাঁদের মতে, ‘আদালত রায় দিয়েছে যে– করসেবকদের দ্বারা ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি মারাত্মক অপরাধ ও বেআইনি কাজ ছিল স্পষ্টভাবে। এখন সেই আদালতই রায় দিচ্ছে– জমি রামমন্দিরের। মন্দির গড়তে গেলে অবশিষ্ট বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলতে হবে। সেটা তো সুপ্রিম কোর্টের মতে বেআইনি। এমন স্ববিরোধী রায় আমাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।’ তাঁরা আরও জানিয়েছেন, রামের জন্মস্থান যে এই মসজিদেরই ভেতরে– তার কোনও প্রমাণ কিন্তু নেই। এই ধারণাটিও খুব একটা পুরনো নয়। প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের বিচার করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ‘একপেশে’ মনোভাব দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা। ‘মুসলিমরা মুঘল ও নবাবি যুগে নামায বন্ধ রেখেছিল, সুপ্রিম কোর্টের এমন ধারণারও শক্ত কোনও ভিত্তি নেই। এমনকি তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’-এও রামের নির্দিষ্ট জন্মস্থান নিয়ে কোনও উল্লেখ নেই। সুপ্রিম কোর্ট এই ব্যাপারটি এড়িয়ে গেছে কেন?’ প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা। 

চিঠির শেষে রামমন্দির ট্রাস্ট তৈরির ব্যাপারটিকেও তাঁরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আবেদনে লেখা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্ট রামমন্দির বানানোর জন্য তিন মাসের মধ্যে কেন্দ্র সরকারকে একটি ট্রাস্ট গঠন করতে বলেছে হিন্দুপক্ষের সংগঠনগুলিকে নিয়ে। এই রায়দানের মাধ্যমে শীর্ষ আদালত বোঝাতে চেয়েছে– হিন্দু ধর্মের সুযোগ-সুবিধা দেখা ও তা সম্পাদন করা সরকারের কাজ! একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের আদর্শের সঙ্গে এই বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত।’ সেকুলার রাষ্ট্রের এমন ধরন হতেই পারে না বলে বিদ্বজ্জনদের অভিমত। চিঠির শেষে লেখা হয়--- তাই, আমরা যারা নিম্নে স্বাক্ষর করছি, আন্তরিকতার সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন রাখছি--- এই রায় ফের বিবেচনা করা হোক।
        

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only