সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯

অযোধ্যায় মসজিদের জন্য বিকল্প জমি নেব না, রিভিউয়ের আর্জি নিয়ে শীর্ষকোর্টে যাচ্ছে ল' বোর্ড


আবদুল বারি মাসুদ, নয়াদিল্লি
অযোধ্যা রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি নিয়ে মামলা দায়ের করবে অল ইন্ডিয়া পার্সোনাল ল’ বোর্ড এবং জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দ। রবিবার এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছে তারা। এদিন সকালে লখনউতে বৈঠকে বসেছিলেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের প্রতিনিধিরা। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় যে এই রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হবে। একমাসের মধ্যে এই আবেদন জানানো হবে।
জমিয়ত সভাপতি মাওলানা সৈয়দ আরশাদ মাদানি এদিন বলেন, ৯ নভেম্বর সমস্ত যুক্তি এবং তথ্য-প্রমাণের তোয়াক্কা না করে রায় ঘোষণা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হবে। জমিয়ত আগেই স্পষ্ট জানিয়েছে, বিশ্বের কোনও কিছুর বদলে মসজিদ ছেড়ে দেওয়া যায় না। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে জমিয়তের ৫ সদস্যের এক্সপার্ট প্যানেল এই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের ব্যাপারে সম্মতি দেয়।
অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের সেক্রেটারি জাফরইয়াব জিলানি জানান, ‘শরিয়াহ অনুযায়ী এই জমি আল্লাহর। এটা কাউকে দেওয়া যায় না। অযোধ্যায় মসজিদের জন্য বিকল্প ৫ একর জমিও নেবে না ল’ বোর্ড। মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড জানিয়েছে, মসজিদের জন্য কোনও বিকল্প ব্যবস্থা হতে পারে না।’ তিনি আরও বলেন, এই মামলা দেশের সমস্ত মুসলিমের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। বোর্ড আসলে গোটা সম্প্রদায়ের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করছে। আইনজীবী রাজীব ধাওয়ানই যে মুসলিমপক্ষের হয়ে এই মামলা লড়বেন, সেকথাও স্পষ্ট করে দেন জাফরইয়াব। 
পার্সোনাল ল’ বোর্ডের অপর সদস্য এসকিউআর ইলিয়াস বলেন, ‘আমরা রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানাতে যাচ্ছি। কারণ আমরা মসজিদের বদলে বিকল্প কোনও জায়গা নিতে পারি না। সে কারণেই এই জমি গ্রহণ করা আমাদের জন্য উচিত হবে না।’
ভিএইচপি নেতা অলক কুমার এদিনই জানিয়েছেন, ‘মামলা পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানোর যে সিদ্ধান্ত মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড নিয়েছে তা দুর্ভাগ্যজনক। ভালো হত, সুপ্রিম কোর্টের রায় যদি মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা হত। এই আর্জি জানিয়ে কোনও লাভ হবে না বলে আমার মনে হয়। সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে সেটাই চূড়ান্ত। ওরা আইনি যুদ্ধে হেরে গিয়েছে। এখন ছায়া যুদ্ধ চালাচ্ছে।’
এই আর্জি জানিয়ে আদৌ কি কোনও লাভ হবে? এই প্রশ্ন যখন সবার মনে তখন মাওলানা মাদানি নিজেই এর জবাব দিয়েছেন। এদিন তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে বলেন, ‘আমাদের আর্জি যে খারিজ হয়ে যাবে সে সম্পর্কে আমরা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত। কিন্তু এই আবেদন জানানো আমাদের অধিকার।’ এর আগেও মাদানি বলেছেন, ‘একবার যদি কোনও মসজিদ তৈরি হয়ে যায়, তা  কেয়ামত পর্যন্ত তা মসজিদই থাকে। সুপ্রিম কোর্ট যে রায়ই দিক না কেন, আমাদের কাছে বাবরি মসজিদ ছিল, আছে এবং থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট যদি বলত মন্দির ধ্বংস করে সেখানে বাবরি মসজিদ তৈরি হয়েছে, তাহলে আমরা দাবিতে ইতি টানতাম। তাছাড়া সেখানে যদি আমাদের কোনও দাবিই না থাকে, তাহলে বিকল্প জমিই বা কেন দেওয়া হল? সব বিচার করেই আমরা বলেছি সুপ্রিম কোর্টের রায় বিভ্রান্তিকর।’ 
বাবরির অন্যতম মামলাকারী ইকবাল আনসারি জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানাবেন না। এ প্রসঙ্গে জাফরইয়াব জিলানিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পার্সোনাল ল’ বোর্ড কেবলমাত্র সাংবিধানিক অধিকার দাবি করছে, এর বেশি কিছু নয়।
সুপ্রিম কোর্টের ১০৪৫ পাতার রায়ের কপির বেশ কিছু জায়গায় আন্ডারলাইন করেছে জমিয়ত প্যানেল।বাবরি মসজিদ ধ্বংস প্রসঙ্গে এএসআই-এর রিপোর্ট উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কোনও মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ তৈরি হয়নি। মসজিদের তলায় যে মন্দিরই রয়েছে একথাও নিশ্চিত করেনি পুরাতত্ত্ব বিভাগ। ১৯৪৯ সালে বাবরির গম্বুজের নীচে রাখা হয় রামলালার মূর্তি। মুসলিমদের মসজিদ থেকে সরানোর ছক কষে যে একাজ করা হয়েছিল সে-কথাও উল্লেখ করে শীর্ষকোর্ট। যার অর্থ ১৯৪৯ পর্যন্ত সেখানে নামায হয়েছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস যে চূড়ান্ত অপরাধ তাও উল্লেখ করা হয় রায়ে। ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত বাবরি মসজিদে যে  নিয়মিত পাঁচবার নামায হয়েছে তার বহু প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু ১৫২৮ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত মুসলিম দখলদারির প্রমাণ দেখাতে পারেনি মুসলিমপক্ষ। রায়ে এমনটাই জানিয়েছিল ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ। সকলে জানেন, ১৫২৮ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত দেশের শাসন ভার মুসলিম শাসকদের হাতেই ছিল। ফলে বাবরি মসজিদে তখন নামায হত না, একথা কষ্ট করেও মানা যায় না। 
রায়ের শুরুতে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে বলতে শুরু করে, তাতে সকলেই ভেবেছিল অন্তত আস্থায় রায় হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আস্থাই বেঁচে থাকল। কেবল মুসলিমপক্ষ নয়, এই রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরাও। সুপ্রিম কোর্টকে চিঠি দিয়েছেন স্বনামধন্য ঐতিহাসিক ডিএন ঝা, ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব, জ্যোতি ঘোষ, রাহুল রায়, কবিতা সিংহ, প্রশান্ত মুখার্জি, সুধীর চন্দ্র, ধীরেন্দ্র কুমার ঝা, গার্গী চক্রবর্তী, গীতা কাপুর, অন্তরা দেবসেন, অনিল ভাট্টি, সোহাইল হাসমি এবং আয়েশা কিদওয়াই-এর মতো  ইতিহাসবিদরা। 
রায় শুনে অসন্তোষ চেপে রাখেননি সুপ্রিম কোর্টের  অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলি। তিনি বলেছেন, বাবরি মসজিদ যদি ধ্বংস করা না হত  এবং হিন্দুপক্ষ যদি বলত বাবরি মসজিদের ভিতরেই রামজন্মভূমি, আদালত কি তখন মসজিদ ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিত? কোর্ট যদি তখন তেমন নির্দেশ দিতে না পারে তাহলে এখন কোন যুক্তিতে আদালত এই রায় দিল? রামমন্দির তৈরি করতে কেন্দ্রকে জমি দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নয় বলে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত এই প্রাক্তন বিচারপতি। 
ধর্ম মত নির্বিশেষে যা সকলকে বিস্মিত করেছে তা হল,  রামলালা জমির মালিক হতে পারে না। একথা বলার পরও কীভাবে হিন্দুপক্ষকে জমির অধিকার দেওয়া হল। মাওলানা মাদানি বলেছেন, পুনর্বিবেচনার আবেদনে হয়তো কিছুই বদলাবে না। যদিও শবরীমালার রায় ৭ সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে। অযোধ্যার মতোই এই রায়ও দিয়েছিল ৫ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ। সেখানে আর্জি পুনর্বিবেচনা মেনে নিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ। আস্থাকে সেখানেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৭ নভেম্বর অবসর গ্রহণ করলেন বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। সেদিনই রায় পুনর্বিবেচনার কথা জানাল মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only