সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯

ভিক্ষের ঝুলি হাতে অতীতের নামি বাউল শিল্পী কোহিনুর


সুবিদ আবদুল্লাহ্
এক সময় বাউলের আসর কাঁপাতেন তিনি। শান্তিনিকেতন পৌষমেলা কমিটি সহ রাজ্যের বিভিন্ন মেলা কমিটি শিল্পীকে আগাম বায়না করে রাখত। চাহিদা ছিল ঠিক এমনই। ‘মাটির-গানের’ সেই বাউল শিল্পী কোহিনুর বিবির এখন দিন কাটে পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষে করে।
মুর্শিদাবাদকে বহু মানুষ চেনে আলকাপের জেলা হিসেবে। পাশাপাশি চর্চা আছে বাউল সংস্কৃতিরও। জেলার ডোমকল মহকুমার জলঙ্গি থানা বাউল চর্চার জন্য বিখ্যাত। কোহিনুর সেই মাটিতেই বেড়ে ওঠেন। সংগীতের নেশায় কুড়ি বছর আগে আলকাপ শিল্পী নওসাদ শেখের কাছে নাড়া বাঁধেন তিনি। তার আগেও বাড়িতে গানের চর্চা করে গেছেন। বাবা ছিলেন ঘোড়ার গাড়ির চালক। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গাড়িতে বসে গুণগুণ করে গাইতেন। ঘোড়ার খুরের ছন্দবদ্ধ শব্দ তাল মেলাত সে গানের সুরে। সংগীত রসিকরা পরামর্শ দিতেন মেয়েকে গান শেখানোর।
কোহিনুর বিবি জানান যে, বাবা কালু শেখ ছিলেন আলকাপ গানের অনুরাগী। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আলকাপের আসরে যেতেন। যেতেন বাউলের আসরেও। সেখান থেকেই কোহিনুরের বাউলপ্রেম। তাতে আগ্রহ ও প্রশ্রয় ছিল বাবারও। বাবার আগ্রহেই কোহিনুর তাঁর গুরু নওসাদের কাছে বাউল সাধনার সূচনা করেন। 
ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল বড় সংগীতশিল্পী হবেন। কিন্তু বিধি বাম। মাত্র চোদ্দ বছরেই স্বপ্ন শেষ করে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। পনেরোতে সন্তানের মা। পঁচিশে বিধবা। স্বামী সাবের আলির অকালপ্রয়াণে ভেঙে পড়েন তিনি। অকালেই নেমে এল বৈধব্যের অভিশাপ। সে সবকে মুছে ফেলতে আবার আঁকড়ে ধরেন সংগীতকেই। সংগীতকে সঙ্গী করেই তিনি সর্বত্র পরিচিতি পান। একুশ শতকের প্রথম দশকেও কোহিনুর বিবির দাপট ছিল বাউল সাম্রাজ্যে। মঞ্চ কাঁপিয়েছেন বীরভূমের শান্তিনিকেতন পৌষমেলায়, পাথরচাপুড়ির দাতাবাবার উরস মেলায়, নদিয়া ও বর্ধমানের গ্রামীণ মেলায়। সম্মান ও শ্রদ্ধা পেয়েছেন গুণিজনের কাছে। বাউল গবেষক শক্তিনাথ ঝাঁ কোহিনুরের বাউল শুনে মুগ্ধ হয়ে যান। যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মুর্শিদাবাদের মেয়ে হিসেবে বাউল গানে তাঁর খ্যাতি ছিল। পৌষমেলায় গেয়েই তিনি গুণিজনের নজরে পড়েন। স্বীকৃতির সম্মানও মেলে। বর্তমান সরকারের সংগীত বিভাগের স্বীকৃত শিল্পী তিনি। মাসিক ভাতা পান ১,০০০ টাকা। তাতে কি চলে? ছেলে থেকেও নেই। বউমা-নাতিদের মুখে অন্ন তুলে দিতে ভিক্ষার ঝুলিকেই সম্বল করেছেন এককালের সুকণ্ঠী বাউলশিল্পী কোহিনুর বিবি। 
জলঙ্গি থানার উত্তর পাকুড়দিয়াড়ের সরকারি জমিতে ছোট্ট কুঁড়েঘর শিল্পীর বর্তমান ঠিকানা। প্রতিবছর কালবৈশাখী উড়িয়ে নিয়ে যায় ঘরের ছাউনি। মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে উদোম চাল ঢাকেন ত্রিপল বা খড়ের ছাউনিতে। দুঃখকে আনন্দে ঢেকে দিতে দালানে বসে গান ধরেন। লালন সাঁই তাঁর সাধনার ভূমি। 
প্রতিবেশী হাফিজুল, হানিফরা চেষ্টা করছেন শিল্পীকে স্থায়ী আশ্রয় দেবার। পঞ্চায়েতের আবাস যোজনায় তাঁকে বাড়ি করে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাও সম্ভব হচ্ছে না কোহিনুরের নিজস্ব জমি নেই বলে। ফলে জলঙ্গির সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের চেষ্টায় শিল্পীকে স্থায়ী আবাস দেবার চেষ্টাও ব্যর্থ। এক সাক্ষাৎকারে আধিকারিক জানাচ্ছেন, চেষ্টা চলছে শিল্পীকে সরকারি পাট্টা দিয়ে সেখানে স্থায়ী আবাস গড়ে দেওয়া যায় কি না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only