রবিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯

রায় শিরোধার্য, তবে এ মামলা কিন্তু ৫ একর জমির জন্য ছিল না

রায় বেরনোর পর হিন্দু সাধু, আইনজীবীরা বিজয়সূচক 'ভি' চিহ্ন দেখাচ্ছেন
শেষপর্যন্ত ১৩৪ বছর পর অযোধ্যার রায় বের হল। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়টি পড়ার পর মনে একটি প্রশ্ন জাগবেই। আর তা হল, বাবরি মসজিদ মামলা নিয়ে সত্যিই কী এত অশান্তি-উত্তেজনা-প্রাণহানি ও দাঙ্গার প্রয়োজন ছিল! এই রায়ে যেমনটি বলা হয়েছে যে, মুসলিম পক্ষকে অযোধ্যার কোনও ভালো জায়গায় ৫ একর জমি দিলেই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেল! এরপর আর ‘নো প্রবলেম’, ‘নো কোয়েশ্চেন’। 
কিন্তু বাবরি মসজিদ মামলা সত্যিই কি অযোধ্যা শহরের অন্যত্র ৫ একর জমি প্রাপ্তির জন্য ছিল? আর যদি ছিলই, তাহলে কেন ৫ একর জমি দিয়ে আদালত কিংবা সরকার তা আগেই মিটিয়ে নিল না? ভারতের বেশিরভাগ মুসলিম নেতা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় তারা অবশ্যই মেনে নিচ্ছেন কিন্তু এই রায় সন্তুষ্টিজনক নয়। বরং এই রায়ে তারা হতাশ।

রায় বেরোনোর পর ভারতের মুসলিমদের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ জোট সংগঠন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এক প্রেস কনফারেন্স করে। তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন– এই রায় বাবরি মসজিদের মামলাধীন জমিতে রাম মন্দির নির্মাণের সমস্ত পথ উন্মুক্ত করে দিল। একইসঙ্গে মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়ে দিযেছে– হতাশ এবং অসন্তষ্ট হলেও তারা চান সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর যেন শান্তি ও সদ্ভাব বজায় থাকে। মুসলিম পার্সোনাল ল’য়ের সেক্রেটারি এবং এই মামলার অন্যতম আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি বলেছেন, কয়েকটি তথ্য এবং সুপ্রিম কোর্টের কিছু আবিষ্কার নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। কিন্তু আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে শ্রদ্ধা করি এবং এই শ্রদ্ধার সঙ্গেই এই রায়ের কিছু অংশ নিয়ে আমরা ভিন্নমত পোষণ করছি। জাফরইয়াব জিলানি আরও বলেছেন, তাঁরা রায়টি ভালো করে পর্যালোচনা করবেন এবং তাঁদের প্রধান আইনজীবী রাজীব ধাওয়ানের সঙ্গেও পরামর্শ করবেন। মুসলিম পক্ষ রায়টির রিভিউয়ের জন্য প্রয়োজনে আবেদন করতে পারে। আর এই রায় নিয়ে যা কিছু আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তার সবই তাঁরা গ্রহণ করবেন। জিলানি দুঃখের সঙ্গে আরও বলেন, বাবরি মসজিদ চত্বরের ভেতরের প্রাঙ্গণও সুপ্রিম কোর্ট অন্য পক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে। এটা সঠিক হয়নি। উল্লেখ্য, বিচারপতি রঞ্জন গগৈ রায় দানের সময় স্বীকার করেন যে হিন্দুরা বাবরি মসজিদ চত্বরের বাইরের প্রাঙ্গণে পূজার্চনা করত। জাফরইয়াব জিলানি আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় তুলে ধরেছেন। আর তা হল– এই রায় উচ্চারণ করার সময় সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ ধারায় যে বিশেষ ক্ষমতা শীর্ষকোর্টকে প্রদান করা হয়েছে– তা ব্যবহার করেন। এ ছাড়াও বোর্ডের লিগ্যাল সেলের সদস্য এম আর সামসাদ বলেছেন, এই মামলাটি নিয়ে আমরা শেষপর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। কারণ আমরা মনে করছি যে– বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করে ১৯৯২ সালে একটা খুবই বেইনসাফি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আরও এক আইনজীবী সাকিল আহমেদ সাইদ বলেছেন, বাবরি মসজিদ মামলায় ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণ আমাদের দিকেই ছিল। আর এই জন্যই পার্সোনাল ল’বোর্ড খুবই হতাশ। পার্সোনাল ল’বোর্ডের মেম্বার কামাল ফারুকি বলেছেন, আমরা আশা করেছিলাম সুপ্রিমকোর্ট ‘বিশ্বাস’কে ভিত্তি করে নয়– বরং তারা ঐতিহাসিক সত্যতা এবং সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেবে। 

একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে প্রধান বিচারপতি গগৈ রায়দানের সময় কী কী কথা বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেন– 
হিন্দুরা বিশ্বাস করেন এখানে রামের জন্মভূমি ছিল। তবে কারও বিশ্বাস যেন অন্যের অধিকার হরণ না করে।
বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে জমির মালিকানা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
বিচারপতি রঞ্জন গগৈ জোর দিয়েছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের রিপোর্টের ওপর। তারা বলেছে, মসজিদের নীচে আরও একটি প্রাচীন কাঠামো ছিল। আর সেটা কোনও ইসলামি স্থাপত্য ছিল না। তবে খনন করার পর পুরাতাত্ত্বিক বিভাগ যে রিপোর্ট দেয়– তার মন্তব্য নিয়েও কিন্তু বিতর্ক রয়েছে। 
তবে বিচারপতি গগৈ এও বলেন, মসজিদের নীচে যে কাঠামোর সন্ধান মিলেছিল তা যেকোনও মন্দিরেরই কাঠামো ছিল পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের রিপোর্টে তা কিন্তু বলা হয়নি। বিচারপতি গগৈ আরও বলেছেন, যদি বাবরি মসজিদের নীচের কাঠামোটি কোনও হিন্দু স্থাপত্য হয়েও থাকে, তাহলেও এতদিন পর ওই জমিকে হিন্দুদের জমি হিসাবে মেনে নেওয়া ঠিক হবে না। 
বিচারপতি গগৈ বলেছেন, সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড কোনও প্রমাণ দিতে পারেনি যাতে বলা যায় ১৮৫৭-র আগে বাবরি মসজিদের মামলাধীন ওই জায়গাটির জমির দখল পুরোপুরি তাদের হাতে ছিল।সুপ্রিমকোর্টের রায় শিরোধার্য
তবে এ মামলা কিন্তু ৫ একর জমির জন্য ছিল না
সুপ্রিমকোর্টের রায়ে আরও বলা হয়েছে, ১৯৪৯ সালে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাবরি মসজিদে নিয়মিত নামায হয়েছে। এছাড়া ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে যে হিন্দুরা রাত্রিকালীন নামাযের পর মসজিদের মিম্বরে রামলালা ও সীতার মূর্তি স্থাপন করেন সেটাও ছিল অন্যায় ও বেআইনি কাজ।
এছাড়া ১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বর কথিত করসেবকদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংস করাও ছিল বেআইনি।
তবে বাবরি মসজিদের মামলাধীন জমির ওপর রামলালার অধিকার স্বীকার করে নেওয়াটা আইনশৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বহাল রাখার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। 
প্রথম থেকে মামলাটি ছিল ২.৭৭ একর জমির মালিকানা নিয়ে। বোঝা যাচ্ছে সুপ্রিমকোর্ট মালিকানার প্রশ্ন থেকে সরে গেছেন। আর পুরাতত্ত্ব বিভাগের যে রিপোর্টের ওপর সুপ্রিমকোর্ট জোর দিয়েছে যে, তা হল বাবরি মসজিদের জমির মাটির নীচে একটি  অ-ইসলামি স্থাপত্য ছিল। সুপ্রিমকোর্ট আরও স্বীকার করেছে তা যে মন্দির ছিল তার কোনও প্রমাণ নেই। এদিকে বৌদ্ধরাও দাবি করেছেন, বাবরি মসজিদের নীচে যে স্থাপত্যের কথা পুরাতত্ত্ব বিভাগ বলছে তা ছিল বৌদ্ধ স্তূপ। কিন্তু শীর্ষ কোর্ট তা সত্ত্বেও তাকে রামলালার জমি হিসাবে ঘোষণা করেছে। সুপ্রিমকোর্ট কিন্তু এও স্বীকার করেছে যে এর কোনও প্রমাণ নেই বাবরি মসজিদের জায়গায় অবস্থিত কোনও মন্দিরকে ধ্বংস করে ৫০০ বছর আগে বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল ।

প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সুপ্রিমকোর্ট কীসের ভিত্তিতে ওই মামলাধীন জমিকে রামলালার মালিকানাভুক্ত জমি হিসাবে ঘোষণা করল? সুপ্রিমকোর্টের খ্যাতনামা প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ও এই প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ৫০০ বছর ধরে বাবরি মসজিদ– ‘মসজিদ’ হিসাবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। এছাড়া সংবিধানে প্রত্যেক ধর্মের মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে যে তার ধর্মস্থান সুরক্ষিত থাকবে। সেই সঙ্গে একটি আইন রয়েছে ১৯৪৭ সালের পর কোনও ধর্মীয় স্থানের চরিত্র পাল্টানো যাবে না। তাহলে সুদীর্ঘ ৫০০ বছর পর কীসের ভিত্তিতে সুপ্রিমকোর্ট এই সিদ্ধান্ত নিল যে বাবরি মসজিদের জমিটি রামলালাকে অর্পণ করা হোক! অশোক গঙ্গোপাধ্যায় আরও বলেছেন, এটা আইন ও সংবিধানের ঘোরতর উলঙ্ঘন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সাংবিধানিক নৈতিকতা ও চেতনার কী হবে? সুপ্রিমকোর্ট নিজেই বলেছে, হিন্দুরা বাইরের প্রাঙ্গণে পুজো করতো। আর ভেতরের প্রাঙ্গনে মসজিদের মধ্যে হতো নামায। যুক্তি মতে, বাইরের প্রাঙ্গণটি মন্দিরের জন্য আবেদনকারী হিন্দুদের দেওয়া হলে আইন–সংবিধান ও ন্যায়বিচার রক্ষা হত। 
একজন মুসলিম সাংসদ মন্তব্য করেছেন, সুপ্রিমকোর্ট অবশ্যই সুপ্রিম, কিন্তু অ-ভ্রান্ত নয়। তিনি আরও বলেছেন– এই রায় হচ্ছে তথ্য প্রমাণের ওপরে বিশ্বাসের বিজয়। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন,  এই রায় ভারতের গণতন্ত্রের শক্তিকে প্রমাণ করল। আর এই রায়ে নাকি সকলে খুশি। এল কে আডবানি বলেছেন, তিনি আজ আনন্দিত, পরিতৃপ্ত। রাম মন্দির আন্দোলনে তিনি যে অবস্থান নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা সঠিক প্রমাণিত হল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only