বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯

মহানবী মুহাম্মদ সা.-কে নিয়ে কবি নাসের হোসেনের দীর্ঘ কবিতা

হিজরি ক্যালেন্ডারের রবিউল আওয়াল। এই মাসেই জন্মেছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা.। ২০১৯ সালে জন্মদিনটি পড়েছিল ১০ নভেম্বর। তাঁকে সা. নিয়ে  ১২১ লাইনের একটি কবিতা লিখেছেন কবি নাসের হোসেন। 


  
তিনি বলেছিলেন
নাসের হোসেন

তিনি বলেছিলেন মায়ের চরণতল হচ্ছে স্বর্গস্থান
বা সবচেয়ে পুণ্যস্থান, তিনিই বলেছিলেন মেয়েরা
সম্মাননীয়া, তাদের বিরুদ্ধে কখনো কটু কথা
বা কুৎসা বলো না, তিনিই বলেছিলেন
 নারী-পুরুষ পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবে তা-ই নয়
প্রতিটি মানুষ প্রতিটি মানুষকে শ্রদ্ধা করবে, কেন-না
প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রয়েছে অনন্ত সম্ভাবনা
সহসা  কোনো ত্রুটি হয়ে গেলে অনুশোচনার মধ্য দিয়ে
চেষ্টার মধ্য দিয়ে সে নিজের উন্নতিসাধন করতে
পারে। তিনিই বলেছিলেন পৃথিবীর সমস্ত জাতির মধ্যে
এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর অবতীর্ণ হয়েছেন
তাঁদের প্রত্যেককে শ্রদ্ধা করতে হবে, সেইসঙ্গে তাঁদের
যাঁরা অনুগামী তাঁরাও শ্রদ্ধার পাত্র। তিনিই তাঁর 
মদিনা সনদের টেস্টামেন্টে জানিয়েছেন, দেশের মধ্যে
মূর্তিপূজক, নিরাকারবাদী ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ
পরস্পরকে ভালোবাসবে সহযোগিতা করবে, যার-যার

ধর্মাচরণ তার-তার নিজের। তিনিই জানিয়েছিলেন
ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি কোরো না কেউ,
নিজেদের কর্তব্যগুলোকে ঠিকমতো পালন করার চেষ্টা
করে যাও, রিপুগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করো, একটাও খারাপ
কাজ করো না, খারাপ কথা বলো না, মনের মধ্যে
দয়াভাব রেখো, নিষ্ঠুরতা ও ঔদ্ধত্যকে  বর্জন করো
যার যেমন সাধ্য সেই সাধ্যের মধ্যে দান-ধ্যান করো
সমাজ পরিবার ও প্রকৃতিকে ভালোবাসো তাদের সুসংরক্ষণ

করো। খেয়াল রেখো সেই শয়তানি বুদ্ধির উদ্ভবের কথা
যখন মানুষকে সৃষ্টি করবার পর ঈশ্বর তাঁর প্রিয়পাত্র
অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ধ্যানী ইবলিশ-কে  বলেছিলেন, আমার
এই নতুন সৃষ্টির সামনে বিনয় দেখিয়ে নতজানু হও
ইবলিশ বলেছিল ঈশ্বরের সামনে ছাড়া আর
কারো সামনে সে নতজানু হবে না, তাছাড়া
মানুষের জন্মের অনেক আগেই তার জ্ঞানচর্চা ও
ইবাদাত শুরু হয়েছে এবং অসম্ভব এক স্বর্গের সিঁড়ি

নির্মাণের কাজ চলছে, তাই, সুতরাং, বয়সে বড়োই
হোক বা ছোটোই হোক কারো সামনেই নিজেকে
বিনয়ী দেখিয়ে সে কুর্নিশ করতে পারবে না। কিন্তু ঈশ্বর
তাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন, শুভবোধ
এমনই একটা জিনিস যা বিনয়ের নির্মাণ করে
জগতের প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে
যা বহুপূর্বে জন্মগ্রহণ করেছে অথবা সদ্য-সদ্য
জন্মগ্রহণ করলো, সব-সবকিছুর প্রতি শ্রদ্ধাবনত

থাকতে হবে, এটাই হচ্ছে ভালোবাসা, এটাই হচ্ছে
সুন্দর, এই ভালোবাসারই অপর নাম ঈশ্বর, তাই
কেউ যদি স্বঘোষিত নাস্তিকও হয়, সেও আসলে
জগতের সবকিছুকে ভালোবাসছে বলেই সব কর্তব্যগুলোকে
সমাধার প্রচেষ্টায় রত আছে বলেই, আস্তিক, আর
যে স্বঘোষিত আস্তিক সে আস্তিক্যের শত দাবি করলেও
যদি সে জগতের  সমস্ত সৃষ্টিকে  ভালো না বাসে
সংসার ও সমাজের করণীয় কর্তব্যগুলোকে না করে 

তাহলে তার শত ইবাদাত-আচার সত্ত্বেও সে-ই প্রকৃত
নাস্তিক। আসলে ভালোবাসা আর নমনীয়তা আর
কর্তব্যবোধটাই হচ্ছে বড়ো কথা, সবচেয়ে বড়ো ইবাদাত।
আর, সবচেয়ে বড়ো ইবাদাত হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা
করা, ললিতকলার চর্চা করা, নন্দনতত্ত্বই রুচি গড়ে তোলে।
নিজেদের  শরীর ও মনকে অন্ধকারের আবরণে ঢেকে
রেখো না, পুরুষ  নারী উভয়েই ক্ষেত্রবিশেষের পোশাকে
সজ্জিত রেখো, মনে রেখো, যা-যা সুন্দর সেগুলোই

শ্লীল, অজ্ঞানের অন্ধকারে নিজেদের অবরুদ্ধ কোরো না
শুধুমাত্র নিজের-নিজের স্বার্থের কথা ভেবে নিতান্ত
কোনো স্বার্থপর হয়ে উঠো না, অন্যদের কথাও ভাবো
অন্যদের এবং প্রকৃতির কথা, দেখো তোমার দ্বারা
প্রকৃতির  যেন বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয়। মনে রেখো
প্রতিটি দেশের সঙ্গে প্রতিটি দেশের সংযোগ আছে
পৃথিবীর সব ভাষাকে অনুবাদ করো, অনুবাদ করো
একে অপরের ভাষাকে, জল বাতাস ও নিসর্গের ভাষাকে।

তিনি বলেছিলেন, যদি একজন পুরুষ এবং একজন  নারী
সারাজীবন একসঙ্গে কাটাতে পারে তার থেকে সুন্দর
আর কিছু হতে পারে না, কিন্তু পরিস্থিতি সবসময়
একরকম যায় না, নানান কারণে যদি কখনো বিচ্ছেদ
কথাটা উচ্চারিত হয় কারো-কারো মুখে, তখন আত্মীয়স্বজন
ও বন্ধু-বান্ধবেরা আপ্রাণ চেষ্টা করবে তাদের মধ্য থেকে
বিচ্ছেদ শব্দটাকে সরিয়ে ফেলতে, কারণ বিচ্ছেদ কথাটা
উচ্চারিত হলে ঈশ্বর দুঃখিত হন, নানা কারণে মতের

অমিল হতেই পারে, তা যেন কখনোই মনের অমিলে
পরিণত না হয়। তিনি বলেছিলেন সবসময় চেষ্টার মধ্যে
থাকো, চেষ্টার মধ্যে থাকলেই তুমি তোমার অভীষ্ট
লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে, সুতরাং, তাই, অলৌকিক বলে
কোনো কথা নেই, শেষ বলে কিছু নেই, তবে
শেষবিচার বলে একটা কথা আছে, সেটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের
জন্ম ও  লয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে জড়িত। তিনি বলেছিলেন
আখের হচ্ছে প্রতি মুহূর্তের, পরের মুহূর্তের, আখের

সুতরাং, তাই, পরিণাম যাতে খারাপ না হয় সেটা
ভেবে কাজ করতে  হচ্ছে, এইরকম অজস্র আখেরের
সমষ্টি হচ্ছে শেষ-আখের বা মহা-আখের, অর্থাৎ
মহাপরিণাম, বহু-বহু বছর ধরে  তোমার পর-প্রজন্মের 
মানুষের মুখে তোমার কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা।
তিনিই বলেছিলেন জগতে দাসপ্রথার উচ্ছেদ হওয়া
দরকার, কোথা থেকে কোথায় ধরে নিয়ে এসে
পুরুষ-নারী ও শিশুদের বিক্রি করে দেওয়া হয়।

মানুষকে মানবিক হতে হবে, মানবিক হলেই ভালোবাসার
উত্থান হবে, মানবিকতাই ঈমান, কেন-না, ভালোবাসার
অর্থই হচ্ছে ঈশ্বর, সুন্দরের অর্থই হচ্ছে ঈশ্বর, তুমি
যখন প্রার্থনা করছো সকল মানুষের জন্য প্রার্থনা করছো
যারা জীবিত এবং যারা মৃত, কেন-না মৃত প্রিয়জনের
জন্য ভালোবাসা চিরকাল উজ্জীবিত থাকে, সেই অর্থে
ভালোবাসা শাশ্বত, ভালোবাসাই যে-কোনো কাজে
এগিয়ে চলবার প্রধান শক্তি। তিনিই বলেছিলেন

কোনোকিছুর অসুবিধেয় পড়লে তোমার সামনে
শুধুই একটিমাত্র পথই রয়েছে তা নয়, বিকল্প পথও
রয়েছে, প্রার্থনার আগে ওজুর জল-প্রক্ষালনের জল
না থাকলে শুদ্ধ-মৃত্তিকা দ্বারাও পবিত্র হয়া যাবে
মনে রেখো তোমার নিয়েত বা শুভ-ইচ্ছাটাই বড়ো কথা
মনে রেখো আচার-বিচারটাই শেষ-কথা নয়, তাই কখনো
কোনো কাজে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ো না, শুচিবাই-গ্রস্ত হয়ো না
যে কাজ করছো সে-কাজ সুষ্ঠুভাবে সমাধা করাটাই

হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেছিলেন, একসময়
লোকের অনেক-অনেক সন্তান হত এবং তারা ভুল ধারণাবশত
একটি সন্তানের বলি দিত ঈশ্বরকে খুশি করানোর জন্য
কিন্তু ঈশ্বর তো করুণাময়, তিনি কেন চাইবেন কারো
কোনো সন্তানের মৃত্যু তাঁকে খুশি করার জন্যে, তিনি
তা চাইবেন না, হযরত ইব্রাহীম বা আব্রাহাম এই 
কুপ্রথার অবসান ঘটান, এ কথাটা স্মরণ করিয়ে তিনি জানালেন
সন্তানদের ভালোবাসো আর হিংসা-প্রবৃত্তির বিনাশ ঘটাও।

মনে রেখো আমরা যেন-বা বিচিত্র সব সাজে সজ্জিত
ক্যারাভানে একটার পর একটা দেশ অতিক্রম করছি
ঋদ্ধ হচ্ছি গানে কবিতায় নাটকে, প্রকৃতি-বন্দনায়,
যে-প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং পরিবর্তনশীল নয়ও।
খুব শৈশবেই দুধ-মায়ের সঙ্গে উটের হাওদায় তিনি
দুলতে-দুলতে অনুভব করেছিলেন ক্যারাভানের বিপুল ছন্দ
সেই ছন্দই তাঁর জীবন কবিতায় ও গদ্যে পাওয়া যাবে
সেই ক্যারাভানের ছন্দই জীবনের আশ্চর্য নৃত্য-গীত নিয়ে বয়ে চলেছে।   
  
তিনিই বলেছিলেন, সবকিছুর শেষে রয়েছে কৃতকর্মের শেষের বিচার।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only