রবিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯

বিশ্বনবী সা.-এর দেখানো পথ থেকে সরে যাওয়াই মুসলিমদের অধঃপতনের কারণ:­ ফিরহাদ হাকিম

অনুষ্ঠানে বক্তব্যরত মহানাগরিক ফিরহাদ হাকিম



গোলাম রাশিদ


ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ধেয়ে আসার পূর্বাভাস ছিল। সকাল থেকেই বৃষ্টির বিরাম নেই। তবু সমস্ত প্রাকৃতিক বাধা-বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জন্মদিবস উপলক্ষ্যে পুবের কলম আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভিড় উপচে পড়ল আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাসস্থিত ক্যাম্পাসের মূল অডিটোরিয়ামে। দুর্যোগের বাধা সরিয়ে হাজির হন সম্মাননীয় অতিথিরাও। কলকাতার মহানাগরিক ও মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, প্রাবন্ধিক জাহিরুল হাসান, প্রাক্তন সাংসদ মইনুল হাসান, নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা শফিক কাসেমি, অধ্যাপক ওয়ায়েজুল হক, সংখ্যালঘু কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ইন্তাজ আলি শাহ, প্রাক্তন পুলিশ অফিসার মসিহুর রহমান, এ কে এম ফারহাদ, শিল্পী পলাশ চৌধুরি সহ বহু বিশিষ্টজন উপস্থিত হন অনুষ্ঠানের শুরুতেই। নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর প্রতি মানুষের এই ভালোবাসা ও আবেগ দেখে মুগ্ধ হন অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা পুবের কলমের সম্পাদক ও সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান। তিনি বলেন, মুহাম্মদ সা.-এর প্রতি ‘মুহাব্বতে’ই আজকের এই বিপুল দর্শক-সমাগম। দক্ষিণ দিনাজপুর, বর্ধমান, নদিয়া, চব্বিশ পরগনা সহ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন এসেছেন প্রিয়নবী সা. সম্পর্ক দু’কথা শোনার টানে।

এ দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় মাওলানা সাবা ইসমাইলের  কুরআন তিলওয়াতের মাধ্যমে। সূরা আদ-দোহার আরবি তিলাওয়াতের বাংলা অনুবাদ পেশ করেন সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান। এরপর অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা মহানবী মুহাম্মদ সা.-এর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বিশ্বনবী সা.-এর উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, হযরত মুহাম্মদ সা. শুধু মুসলিমদের জন্য পৃথিবীতে আসেননি, তিনি সব ধর্মের, সব বর্ণের মানুষদের জন্য এসেছিলেন। মানবতাকে পরিপূর্ণ করার জন্যই মহানবী সা.-এর আগমন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ দিন ফিরহাদ প্রিয়নবী সা.-এর সহনশীলতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি, বিশ্বের মানুষের জন্য তাঁর দরদ, সহানুভূতির জন্যই তিনি ‘বিশ্বনবী’। চাকর, অনাথদের সঙ্গে ব্যবহার, রাষ্ট্রশাসন-নীতি, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, আজকের মুসলিমরা তা থেকে বিচু্যত হয়েছে বলেই জাতির এই অধঃপতন। মুহাম্মদ সা. শত্রুকেও মাফ করে দিতেন– প্রতিশোধ নিতেন না। তাঁর চলার রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখা এক বুড়িকেও তিনি অসুস্থ হলে দেখতে গিয়েছেন। মহানবী সা.-এর এই অনুপম চরিত্রের জন্যই ইসলাম বিশ্বজয় করতে পেরেছিল। আজ আমাদের মধ্যে সেই চরিত্রের অভাব ঘটেছে বলেই আমরা ভাবি, আমরা অসহায়, আমাদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে। মুসলিম জাতি আজ পিছিয়ে, হীনম্মন্যতায় ভুগছে।’
কচিকাঁচাদের নাচ

বর্তমান পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে মেয়র ফিরহাদ হাকিম আরও বলেন, আমরা ভাবছি, আমাদের উপর সুবিচার হচ্ছে না। এই চিন্তায় ভুল রয়েছে। বিচার করার ক্ষমতা একমাত্র মহান আল্লাহর। নবী সা.-এর জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানে আসুন আমরা তাঁর দেখানো পথে চলার শপথ করি। তবেই সফলতা আসবে। হিংসার প্রদর্শন নয়। ক্ষমা ও বিশ্বাস দিয়ে সকলের মন জয় করতে হবে মহানবী সা.-এর দেখানো পথে।
বক্তব্যরত সম্পাদক, সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান  

বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও ইতিহাস-গবেষক জাহিরুল হাসান তাঁর বক্তব্যে ‘মানুষ’ নবী সা.-এর বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলেন। হযরত মুহাম্মদ সা.-এর চরিত্রের বিনয়, নির্লোভ, পরোপকারী ইত্যাদি গুণগুলি তিনি উল্লেখ করে বলেন, মুহাম্মদ সা. এমন বিনয়ী ব্যক্তি ছিলেন যে, অপরের ঊর্ধ্বে তিনি নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি কখনও। নিজেকে অত্যন্ত সাধারণ একজন হিসেবে ভাবতেন। কর্তৃত্বের দাপট প্রদর্শন করতেন না। ঘরের কাজ নিজে করতেন। নিজের জামা-কাপড় নিজে সেলাই করতেন। একজন রাষ্ট্রনেতার এমন জীবনযাপন আমাদের আশ্চর্য করে! 
অতিথি, দর্শক

জাহিরুল হাসান বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এখনকার নেতা-মন্ত্রীরা নিজের পরিবারের পুত্র বা অন্যদেরকে উত্তরাধিকার তৈরি করার জন্য ব্যস্ত হয়ে থাকেন। কিন্তু মুহাম্মদ সা. কোনও উত্তরাধিকার নিয়োগ করে যাননি। গনিমতের মাল তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য দান করে দিতেন। এটাই ছিল তাঁর মহানুভবতা। 
সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম

বঙ্গীয় সংখ্যালঘু বুদ্ধিজীবী মঞ্চের সভাপতি অধ্যাপক ওয়ায়েজুল হক এ দিনের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুসলিমদের মধ্যে ভেদাভেদকে দূর করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নিজেদের মধ্যে লড়াই করে কোনও লাভ নেই। আমরা যদি নবীজি সা.-কে সত্যিকারের ভালোবাসি, তবে ঐক্যবদ্ধ থাকব। অধ্যাপক ওয়ায়েজুল তাঁর বক্তব্যে মা-বাবার প্রতি ভালোবাসাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। নিজের পিতা-মাতাকে সঠিক সম্মান ও ভালোবাসা না দিলে সমস্ত কাজই নিষ্ফল হয়ে যাবে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন। উপস্থিত দশর্করা তাঁর মর্মস্পর্শী বক্তব্যে মুগ্ধ হন।
প্রাক্তন পুলিশ অফিসার মসিহুর রহমান

এ দিনের সভায় নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা শফিক কাসেমি বাবরি মামলার রায় প্রসঙ্গে বলেন, মুসলিমদেরকে ‘সবর’ করতে হবে। এই দেশ, সুপ্রিম কোর্ট আমাদের। এখানকার জনগণও আমাদের ভাই। তাই কোনও হিংসা, ঝগড়া নয়। 
প্রাক্তন সাংসদ মইনুল হাসান

পুবের কলম আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রাক্তন সাংসদ মইনুল হাসান। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাইকে সত্যের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেন তিনি। মহানবী সা. বদর যুদ্ধে বন্দিদের মুক্তি দিয়েছিলেন সাহাবাদের লেখাপড়া শেখানোর বিনিময়ে। এই ঘটনা উল্লেখ করে মইনুল জানান, ‘কোনও রাষ্ট্রনেতা এমন শর্তে কখনও বন্দিদের মুক্তি দেননি। এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, তিনি শিক্ষাকে কত গুরুত্ব দিতেন। এমন নবী সা.-এর জন্য বিশ্ব গর্ব অনুভব করে।’

আমার দিলের ইচ্ছা ঠোঁটে দোয়া হয়ে ফুটে উঠছে। ও আমার খোদা, আমার জীবনকে প্রদীপের আলোর মতো মঙ্গলময় করে তোল। বিশ্বনবী আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের লেখা ‘লাব পে আতি’ সংগীতের মূর্ছনায় এভাবেই নিজেদের জীবনকে সঠিক ও সত্যের পথে চালনা করার জন্য এ দিন প্রার্থনায় শামিল হয় তাওহীদ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের কচিকাঁচারা। অনুষ্ঠানে হাওড়ার ডোমজুড়ের এই ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছোট্ট ছোট্ট পড়ুয়ারা তাদের নাচের মাধ্যমে উপস্থিত দশর্কদের মন জয় করে নেয়। আহমদ হাসান ইমরান এ প্রসঙ্গে জানান, ওরা গ্রামের দিকের একটি স্কুলে পড়লেও খুব ভালো পারফরমেন্স করে। সেটা দেখেই এর আগে আমি ওদেরকে পার্ক সার্কাস ময়দানে অনুষ্ঠিত সংখ্যালঘু বিত্ত নিগমের মিলনোৎসবে পারফরমেন্স করার সুযোগ করে দিয়েছিলাম। আগামী প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এমন সুস্থ কালচারে উদ্বুদ্ধ হলে আমারও ভালো লাগবে।       
প্রাবন্ধিক, গবেষক জাহিরুল হাসান

অনুষ্ঠানটি নান্দনিক ভাবে সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক  শফিকুল ইসলাম। নবী সা.কে নিয়ে তাঁর কবিতাপাঠও মুগ্ধ করে দর্শকদের।   

    

      

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only