শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯

সিএএ-এর বিরুদ্ধে ফুঁসছে একের পর এক রাজ্য


পুবের কলম, ওয়েব ডেস্ক: সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল উত্তর-পূর্বে। তারপর এই প্রতিবাদ প্রবল হয়ে ওঠে বাংলায়। বলা ভালো, প্রতিবাদের ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে বাংলা। তারপর জামিয়ায় পুলিশি তাণ্ডব দেশজুড়ে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। বিজেপি এই নয়া আইনটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে সাফল্য পেতে চেয়েছিল। কিন্তু গোটা দেশ বুঝিয়ে দিল, এখনও দেশের মানুষ বৈচিত্র্যে  আস্থাশীল। এখানে মেরুকরণের কেন্দ্রীয় চেষ্টাকে ভালোভাবে নেয়নি দেশের মানুষ।

বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেও বৃহস্পতিবার যেভাবে বিক্ষোভ হয়েছে, তা শাহ-মোদিদের কপালে ভাঁজ ফেলার পক্ষে যথেষ্ট। এদিন যে শহরগুলি বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল সেগুলি হলদিল্লি, লখনউ, পটনা, গুয়াহাটি, কলকাতা, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, পুনে, মুম্বই এবং চণ্ডিগড়। লখনউয়ে পুলিশের  গুলিতে এদিন এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। মেঙ্গালুরুতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে কমপক্ষে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির জেরে কমপক্ষে ১৯টি উড়ান বাতিল হয়েছে। ১৬টি বিমান নির্ধারিত সময়ের থেকে অনেক দেরিতে উড়ছে।
বেঙ্গালুরুতে নিগ্রহের  শিকার ইতিহাসবিদ
রামচন্দ্র গুহ।
 বেঙ্গালুরুতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ প্রদর্শন করে আটক হন ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ। এদিন তিনি সাংবাদিকদের সামনে বলেন, ‘সংবিধান নিয়ে আমি যখনই কথা বলতে যাচ্ছিলাম তখনই পুলিশ আমাকে আটক করল। আমার হাতে তখন গান্ধিজির একটা ছবি ছিল। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই প্রতিবাদ করছিলাম। কোনও অশান্তি ছিল না। কেন্দ্রের অঙ্গুলি হেলনে পুলিশ এই কাজ করেছে।’

এদিন ট্যুইট করে সিএএ-র বিরোধিতা করেন তামিল তারকা তথা রাজনীতিবিদ কমল হাসান। রামচন্দ্র গুহের আটকের নিন্দায় সরব হন মু্খ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, সিএএ এবং এনআরসি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলায় দেশের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদকে আটক করা হল। আসলে এই সরকার ভয় পেয়ে গিয়েছে।
এদিন সকাল থেকেই উত্তপ্ত ছিল দিল্লির লালকেল্লা সহ বেশ কিছু এলাকা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকেই সেখানে মোতায়েন ছিল প্রচুর পুলিশ। বিক্ষোভকারীরা লালকেল্লায় জমায়েত হতেই পুলিশের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় দিল্লির ১৮ টি মেট্রো স্টেশন। বহু জায়গায় ইন্টারনেটও বন্ধ করা হয়।

সিএএ-র বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার প্রতিবাদে পথে নামেন বলিউড তারকা ফারহান আখতার, হৃত্বিক রোশন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, স্বরা ভাস্কর, সুশান্ত সিং রাজপুত সহ বহু তারকা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী। প্রতিবাদ যে এমন হিংসাত্মক রূপ নিতে পারে, তা আঁচ করতে পারেনি যোগীর পুলিশ।
এদিন কেবল শহর নয়, গ্রামগুলিতেও ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদ-আন্দোলন। পথে নামেন বুদ্ধিজীবীরা। লখনউয়ের রাস্তায় পুড়েছে বাস ও মোটরগাড়ি। পরিস্থিতি সামাল দিতে নাজেহাল হতে হয় প্রশাসনকে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশে দফায় দফায় বিক্ষোভ হয়। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিলতর হচ্ছে আঁচ করে এদিনই জরুরি বৈঠক ডাকেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দেশজুড়ে এ হিংসাত্মক পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা খতিয়ে দেখতেই এই বৈঠক বলে জানা গিয়েছে।

এদিন দেশজুড়ে পুলিশের সঙ্গে আম-জনতার খণ্ডযুদ্ধ হয়। বিজেপি অবশ্য বোঝানোর চেষ্টা করছে এর পিছনে রয়েছে বিশেষ সম্প্রদায়। নরেন্দ্র মোদি পোশাক-মন্তব্য করে সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছিলেন। জামিয়ায় বিনা প্ররোচনায় পুলিশের তাণ্ডবের নেপথ্যেও মোদির মন্তব্য। এমন অভিযোগ অনেকেরই। সিএএ-র প্রতিবাদ করার কারণে দিল্লিতে সিনিয়র আইনজীবী প্রশান্তভূষণ, সমাজকর্মী হর্ষ মান্দার, যোগেন্দ্র যাদবকে আটক করে পুলিশ। কর্নাটক এবং উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকার থাকলেও এই দুই রাজ্যই সামাল দিতে পারেনি জনরোষ। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে উত্তরপ্রদেশের সম্বলপুর জেলা। সরকারি বাসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। যোগী প্রশাসন পরিস্থিতি সামলাতে ইন্টারনেট বন্ধের আশ্রয় নেয়। বেঙ্গালুরুতেও পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ সহ ২০০ জনকে আটক করে পুলিশ। বেঙ্গালুরু টাউন হলে রাখা হয় তাঁকে। খ্যাতনামা এই ঐতিহাসিককে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় ইয়েদুরাপ্পার পুলিশ। লালকেল্লা থেকে আটক করা হয় যোগেন্দ্র যাদবকে। দিল্লির মান্ডি হাউস থেকে আটক করা হয় সীতরাম ইয়েচুরি, ডি রাজা, বৃন্দা কারাত ও নীলোৎপল বসুকে। কিন্তু তাতে বিক্ষোভের আঁচ কমেনি।

বিজেপির গড় বলে পরিচিত গুজরাতের আহমদাবাদেও এদিন প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ পালিত হয়। মেঙ্গালুরুতেও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আম-জনতা। এদিন দিল্লির বহু জায়গায় জারি হয়েছে ১৪৪ ধারা।  
মুম্বইয়ে বিক্ষোভ দেখান উত্তর-পূর্বের পড়ুয়ারা। রাজপথের্ মিছিল বের করেন তাঁরা। যোগী আদিত্যনাথ অবশ্য স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেছেন, প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া কোনও বিক্ষোভ কর্মসূচি হবে না। এই নির্দেশ অমান্য করে যারাই এই দাঙ্গা বাধাবে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। বৃহস্পতিবার মেঙ্গালুরু পুলিশ বিক্ষোভকারীদের দমন করতে লাঠিচার্জ করে। কেরলের মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন জানিয়েছেন, সংবিধানকে রক্ষা করার জন্য তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহকে যেভাবে নিগ্রহ করা হয়েছে তার নিন্দায় সরব হন বিজয়ন।

এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা ব্যাকফুটে বিজেপি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডি ঢোক গিলে বলেছেন, এনআরসি প্রক্রিয়া এখনও নোটিফায়েড হয়নি। কোনও নির্দেশিকাও তৈরি হয়নি। এখন দেশের আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক করাই অন্যতম লক্ষ্য। রেড্ডি সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেছেন, দিল্লি পুলিশ কাউকে মারধর করছে না। প্রশাসনের কারও উচিত নয় পড়ুয়ার কিংবা বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠি কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only