শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

ধ্বংসের দুঃখ বুকে নিয়েই নীরবে বাবরি-স্মরণ




গোলাম রাশিদ

দৈনিক পুবের কলম যখন আপনাদের হাতে পৌঁছবে, ১৯৯২-এর এই দিনে তখন অযোধ্যার বাবরি মসজিদ চত্বরের বাইরে করসেবকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের লোকজনের সংখ্যা এবং উত্তাপও। আদবানি, যোশী, বিনয় কাটিহাররা বাবরির অদূরে রাম কথাকুঞ্জে অবস্থান নিয়েছেন। করসেবক-নেতারা গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে বার বার বলছেন, ১২টা বাজতে দাও। তারপরই বেড়া টপকে ভেতরে ঢুকব। আজ সব শেষ করব। মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে।

পরিস্থিতি ক্রমশ পুলিশের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল। হাজার হাজার করসেবক হাজির হয়েছে ‘জোশ’ নিয়ে। ঘটনাস্থলে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এত মারমুখী করসেবক জড়ো হয়েছে, সামলাতে পারবেন?’ ‘ ইয়েস, ইট ইজ আন্ডার কন্ট্রোল।’ হাসতে হাসতে বলেছিলেন ফৈজাবাদের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. শ্রীবাস্তব। ‘আন্ডার কন্ট্রোল’ পরিস্থিতিতেও বেলা ১২টা বাজতেই একজন পৌঁছে যাবে বাবরির সৌন্দর্যমণ্ডিত গম্বুজের উপর। তারপরের ইতিহাস সবার জানা। পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষীরা উধাও। অদৃশ্য সমঝোতার মাধ্যমে ভেঙে ফেলা হবে ৪৬৪ বছরের পুরনো একটি স্থাপত্যকে। ভেঙে ফেলা হবে তিনটি গম্বুজ। কেড়ে নেওয়া হবে সাংবাদিকের ক্যামেরা। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বাবরি মসজিদ।

আজ সেই কালো দিন, বাবরি ধ্বংসের ২৭তম বার্ষিকী। ভারতের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকারতম, লজ্জাজনক দিন। এখন থেকে বছর বছর বার্ষিকী পালন হবে শুধু। কারণ, দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় ৯ নভেম্বর, ২০১৯-এ জানিয়ে দিয়েছে, ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি ধ্বংস ছিল অন্যায়। তবে হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী ওটা রামজন্মভূমি। তাই বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি পাবে হিন্দু কর্তৃপক্ষ। মুঘল সম্রাট বাবরের গভর্নর মির বাকি ১৫২৮ সালে যেখানে বাবরি মসজিদ গড়েছিলেন, সেটা পুরোপুরি ভেঙে ফেলে ৪৯১ বছর পর সেখানে তৈরি হবে রামমন্দির। মসজিদ গড়ার জন্য মুসলিমদের অযোধ্যারই অন্য স্থানে ৫ একর জমি দেওয়া হবে। তবে সেই জমি মুসলিমরা নেবে না, এমনই সিদ্ধান্ত এ পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন হয়েছে। তাই হয়তো প্রশাসন, নিরাপত্তাবাহিনী মনে করছে অযোধ্যার উত্তাপের আঁচ এখনও কমেনি। দেশের কোনও মুসলিম এখন পর্যন্ত কোনও উত্তেজনামূলক আচরণ করেনি। তবু বাবরি ধ্বংসের বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা অযোধ্যাজুড়ে। মোড়ে মোড়ে পুলিশ ফাঁড়ি। ‘৯ নভেম্বর, শীর্ষ কোর্টের রায় বেরনোর দিন যেমনভাবে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছিল অযোধ্যাকে, আজও তাই,’ জানাচ্ছেন উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এডিজি পিভি রামাশাস্ত্রী। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তল্লাশি করে তবে যেতে দেওয়া হচ্ছে বিতর্কিত স্থানের (এখন অবশ্য আর বির্তকিত নয়!) আশপাশের রাস্তা, মহল্লায়। হোটেল, ধর্মশালা ছাড়াও পাবলিক প্লেসগুলি তল্লাশি করে দেখা হচ্ছে, সেখানে বসে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে কি না। ২৬৯টি পুলিশ পিকেট বসেছে রামজন্মভূমি এলাকায়। জনগণকে এখনও বলা হচ্ছে, আপনারা গুজবে কান দেবেন না। সম্প্রীতি রক্ষা করুন। কে বা কারা সম্প্রীতি ভাঙার চক্রান্ত করছে, গুজব ছড়াচ্ছে, তা অবশ্য পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়নি। 

অন্যদিকে, হায়দরাবাদ পুলিশ সেখানে বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করেছে। নিরাপত্তা বেড়েছে মথুরা, মাদুরাই, আলিগড়েও। আলিগড়ের ডিএম সিবি সিংহ জানাচ্ছেন, চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেওয়ার পরে আর কোনও কালা দিবস পালন করার প্রয়োজন পড়ে না। তবে ফোর্স প্রস্তুত রয়েছে। কাউকে কোনও মিটিং-মিছিল করতে দেওয়া হবে না। শান্তি রক্ষায় সমস্ত রকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

নিরাপত্তার এত বহর দেখে অনেকে বলছেন, ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বরের দিন যদি এর অর্ধেক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সরকার করত, তাহলে আর এই দিনটি দেখতে হত না। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের স্মৃতি এখনও বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন অযোধ্যার মুসলিম, এমনকি অমুসলিমরাও।

বাবরি মসজিদ এলাকা থেকে ৩০০ মিটার দূরে পিতৃপুরুষের ভিটে ‘শৃঙ্গার ভবনে’ বাস করেন ৮৩ বছরের রামকিশোর গোস্বামী। তাঁর ছেলে নীরজ ও নিখিল, দু’জনের জন্মই আটের দশকে। এই সময়েই বাবরির তালা খুলে দেওয়া হয়। ইট নিয়ে আসা শুরু হয় মন্দির গড়ার জন্য। নিজেদের বাড়ির ছাদ থেকে বাবরির উপর উন্মত্ত করসেবকদের বর্বরতা (মধ্যযুগীয়? তবে ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর কোন যুগে) তারা দেখেছিল স্পষ্টভাবে। দুইভাই থরথর করে কেঁপে উঠেছিল। রামকিশোর জানাচ্ছেন, ১৯৪৯-এ অকস্মাৎ রামলালার মূর্তি স্থাপন করে এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি তখন ছোট। আযান ভেসে আসত মসজিদ থেকে। ভালো লাগত এর সুর। রামলালা বিরাজমান হওয়ার পর থেকেই আযান বন্ধ হয়ে যায়। আমার বাবা ১৯৪৯-এর ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। আমরা দেখেছি ১৯৯২-এর ধ্বংস। আমাদের পরের প্রজন্ম রামমন্দির দেখবে। ওরা ভুলেই যাবে, সেখানে কোনও মসজিদ ছিল।

রাজপুত বলবীর সিং ও যোগেন্দ্র পাল সেদিন বাবরি মসজিদ ভাঙতে অংশ নিয়েছিলেন করসেবকদের সঙ্গে। অপরাধের গ্লানি তাঁদের জীবনের বিশ্বাস পালটে দেয়। পরে তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বলবীর সিংয়ের দাবি, আমিই প্রথম মাঝখানের গম্বুজটায় উঠি। ভেবেছিলাম, বহু পুলিশ মোতায়েন থাকবে। কিন্তু নিরাপত্তার এমন শিথিলতা দেখে আমরা আরও উজ্জীবিত হই। মুহাম্মদ আমির ও উমর নামের সেই দু’জন এখন পর্যন্ত ৯০টি মসজিদ বানিয়েছেন। একটা বাবরি গেল, যাক্। বলবীর ও যোগেন্দ্রর পথ ধরে বাবরির মতো আরও বহু মসজিদ গড়ে তুলতে হবে দেশে--- বাবরি-বার্ষিকীর আগে এমনটাই ভাবছেন দেশের বহু মুসলিম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only