রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জন্ম-শতবর্ষ উপলক্ষে আলোচনাসভা আলিয়ায়

অসাম্প্রদায়িক চরিত্র, বিজ্ঞতা ও অসামান্য ব্যক্তিত্বের জন্য বাংলা তথা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় ছিলেন সুপরিচিত। তাঁর জন্ম-শতবর্ষ (১৯২০-২০১০) উপলক্ষে রবিবার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কসার্কাস সভাঘরে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘বাংলার জনরব’ নিউজ পোর্টাল ও সজাগ মঞ্চ। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের গ্রন্থাগার মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী, রাজ্যসভার সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, আইনজীবী সরদার আমজাদ আলী, সমাজসেবী সেখ আফতাবউদ্দিন সরকার প্রমুখ বিশিষ্টজনেরা। 

চলতি সংসদ অধিবেশনে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পেশ হচ্ছে সোমবার। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিদানকারী এই বিলটি অসাংবিধানিক বলে বরাবরই মত দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশজুড়ে চলছে বিক্ষোভ। তার আঁচ পড়ে এদিনের স্মরণসভাতেও। মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী সভায় বলেন, ‘এক কঠিন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশ। সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, সংবিধানের সুরক্ষা চ্যালেঞ্জের মুখে।’ একই সুরে সুর মেলান জামাআতে ইসলামি হিন্দের রাজ্য সভাপতি মাওলানা আব্দুর রফিক। তিনি বলেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে সংসদে সেকুলার দলগুলির একজোট হওয়া সময়ের দাবি। এ সময় সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় বেঁচে থাকলে নিশ্চয় সাংসদদের দুয়ারে দুয়ারে যেতেন তাঁদের একজোট করে এমন জনবিরোধী বিল পাস করানোর পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে। 

অপরদিকে, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে স্মরণ করতে গিয়ে মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ বলেন, ‘তিনি ছিলেন প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। প্রয়াত প্রাক্তন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বুঝেছিলেন, মুসলিমদের সঙ্গে নিয়ে চললেই সম্প্রীতি বাড়বে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগের নেপথ্যে ছিলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। আপন কর্মের কারণে তিনি বেঁচে থাকবেন মানুষের মনে।’ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জন্মের একশো বছর উপলক্ষে তিনি একটি স্মরণিকা প্রকাশ করার পরামর্শ দেন এদিনের অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা সেখ ইবাদুল ইসলামকে। 

সাংসদ ও পুবের কলমের সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান রবিবারের এই স্মরণসভায় সিদ্ধার্থশঙ্করকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘সত্তরের দশকের প্রথমদিকে আমি তাঁর সংস্পর্শে আসি। মুসলিম ইনস্টিটিউটে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তাঁর সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম।’ সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের অসাম্প্রদায়িক ও উদার চরিত্রের পরিচয় দিতে গিয়ে ইমরান উল্লেখ করেন, ‘৪-৫ বছর বাবরি মসজিদ মামলাটি তিনি লড়েছিলেন বিনা পারিশ্রমিকে। এমনকি একবার একটি চাকরির চূড়ান্ত তালিকায় (১০০ জনের বেশি) কোনও মুসলিমের নাম না থাকায় সচিবকে বলেন ২৫ শতাংশ মুসলিমের নাম ঢুকিয়ে নতুন তালিকা তৈরি করতে। তারপর তিনি তাতে স্বাক্ষর করেন।’ স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ইমরান নানা ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের দৌহিত্র সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় অনেকটা তাঁর মাতামহের মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। আইনসভা ও স্থানীয় পরিষদে বাঙালি মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে ও চাকরির সংরক্ষণে দেশবন্ধু ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ (১৯২৩) প্রস্তাব করেন। হঠাৎ তিনি মারা যাওয়ায় জমিদার ও উচ্চবিত্তদের সংগঠন কংগ্রেস আর এর বাস্তবায়ন ঘটায়নি। সিদ্ধার্থশঙ্কর সংরক্ষণ ছাড়াই তাঁর ক্যাবিনেটে (১৯৭২-৭৭) গণি খান চৌধুরী, আবদুস সাত্তার, মোতাহার হোসেন, জয়নাল আবেদিনদের মন্ত্রী করেন। থানাগুলিতে মুসলিম পুলিশ নিয়োগে জোর দেন।’ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুসলিমদের চাকরি দিয়ে– মন্ত্রী বানিয়ে মুসলিম রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করেন। তার ফলে বাংলার মুসলিম রাজনীতি শেষ হয়ে যায়। এতে লাভ না ক্ষতি হয়েছে তা ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে বলে ইমরান মন্তব্য করেন। 

এদিন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় নামাঙ্কিত স্মারক বক্তব্য দেন প্রাক্তন সাংসদ ও আইনজীবী সরদার আমজাদ আলী। প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ‘মানুদা’র সঙ্গে আমজাদ আলীর ব্যক্তিগত পরিচয় থাকায় এই বক্তব্য হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত। তিনি সিদ্ধার্থশঙ্করের জন্ম– পড়াশোনা– কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন মনোগ্রাহী ভাষায়। দুজনেই আইন-জগতের মানুষ হওয়ায় তাঁদের মধ্যে হ*দ্যতা গড়ে উঠেছিল– যা স্পষ্ট ফুটে ওঠে সরদারের বক্তব্যে। অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমী সিদ্ধার্থের জীবনের বেশকিছু ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলে, আসুন প্রার্থনা করি– আজকের এই স্খলিত সময়ে তাঁর মতো সন্তান ঘরে ঘরে জন্ম নিক। 
এদিন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সেখ ইবাদুল ইসলাম জানান, এখন থেকে প্রতি বছরই আমরা ‘বাংলার জনরব’-এর পক্ষ থেকে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় স্মারক বক্তব্যের আয়োজন করব। তাঁর মতো জনদরদী মানুষকে মনে রাখা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। বাংলার জনরব-এর সাহিত্য সম্পাদক শেখ আব্দুল মান্নান এদিনের অনুষ্ঠান আয়োজনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এদিনের সভায় আলিয়া মাদ্রাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, প্রাবন্ধিক কুমারেশ চক্রবর্তী, প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ সাদউদ্দিন, ড. সাইফুল্লা, অধ্যাপক সাফায়াত আলি, আবু সালেহ রেজওয়ানুল করিম, সেখ আহমদ আলী, বাহারুল ইসলাম প্রমুখ বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।       

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only