শনিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৯

নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতায় অগ্নিগর্ভ উত্তরপ্রদেশ, নিহত ৬

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিবাদে পথে নেমেছে দেশের জনতা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলন এখন রাজপথে। বাংলা, তেলেঙ্গনা, কেরল, মহারাষ্ট্র, দিল্লি কিংবা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে সীমাবদ্ধ নেই জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। উত্তরপ্রদেশে প্রতিবাদের জোয়ার অন্য রাজ্যকে ছাপিয়ে গেছে শুক্রবার। পুলিশ ও প্রতিবাদী জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ইউপি। এদিন জুমআর নামাযের পর যোগী-রাজ্যের নানা স্থানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু হয়। কিন্তু পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা জটিল আকার ধারণ করে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে পুলিশ ও জনতার মধ্যে প্রায় খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। সিএএ-এর প্রতিবাদ আন্দোলনে উত্তরপ্রদেশে ৬ জন নিহত হয়েছে এদিন।  পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়ছে– সঙ্গে সরকারি যানবাহন, ভবন, সম্পত্তিতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে লাঠিচার্জ করতে হয় ও বেশকিছু জায়গায় গুলি চালাতে হয়। তখনই রক্তক্ষয়ী কাণ্ড ঘটে। যদিও ইউপি পুলিশের ডিজি ওপি সিংহ দাবি করেছেন, আমরা একটি গুলিও চালাইনি। পুলিশের ছোড়া গুলিতে কেউ মারা যায়নি।

 উত্তরপ্রদেশ রাজ্য পুলিশের খবর অনুযায়ী, বিজনোরে ২জন এবং সাম্ভাল, ফিরোজাবাদ, মিরাট, কানপুরে ১জন করে নিহত হয়েছে। গতকাল একজন লখনউতে নিহত হয়। মিরাটে এদিন ২০ বছর বয়সী যুবকের মৃতু্য হয় বুলেটে আঘাতের ফলে। আনন্দ হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার ইকরাম খান জানান, আসিফ নামে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে গুলি লেগে। একই বয়সের সেলিম আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এদিন কানপুরের বেগমপুরার মুহাম্মদ আয়াজ (১৪) ও ছোটি বাজারিয়ার শাদাব (১৪) মসজিদে জুম্মার নামায পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় বিক্ষোভের মধ্যে পড়ে যান তারা। আয়াজ জানিয়েছে, পুলিশের একটি বুলেট তার তলপেটে লেগেছে। অন্যদিকে শাদাবের পায়ে গুলি লাগে। দু’জনেই আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। কানপুরে শুক্রবার কমপক্ষে ১২ জন আহত হয়েছে পুলিশের গুলিতে। এসবই ঘটেছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময়। 

সহিংস বিক্ষোভের জেরে ইউপিতে ৩৫০০ জনের বেশি মানুষকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ১৫টি জেলাতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের নির্দেশে। এর মধ্যে রয়েছে গাজিয়াবাদ, দেওবন্দ, লখনউ, বেরেলি– আজমগড়– আগ্রা– মিরাট– সাহারানপুর– কানপুর– পিলভিট ইত্যাদি জেলা। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন বহু সাধারণ মানুষ। গাজিয়াবাদে বসবাসরত বাঙালি সাহিত্যিক সোনালি বেগম জানিয়েছেন, ‘এখন শুধু ফোনে কথা বলে খবর নিতে পারছি। ফোনে মেসেজ এসেছে, অনির্দিষ্টকালের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ। জানি না, কতদিন এই অবস্থার মধ্যে থাকতে হবে।’ কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা রদ করার পর এই অবস্থা হয়েছিল সেখানে। এখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যেও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে মত সাধারণ মানুষের। 

লখনউ ও সাম্ভালে এদিনও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সামাল দিতে পুলিশ ৩৫০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করে। পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে ফিরোজাবাদেও। পুলিশ-পোস্ট ভেঙে ফেলা হয়। ৩টি যানবাহন ভাঙচুর করে উত্তেজিত জনতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। লখনউয়ের পরিবর্তন চকে একটি সরকারি বাস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বুলন্দশহর, গোরক্ষপুর ও বিজনোরেও একই চিত্র দেখা যায়। বুলন্দশহরে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে উত্তেজিত জনতা। পুলিশও পালটা পাথর ছোড়ে। পুলিশের চোখের সামনেই জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বেশকিছু গাড়ি।    

এইসব জেলাগুলি ছাড়াও এদিন মূল নজর ছিল আলিগড়ের দিকে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশি অভিযানের পর ক্যাম্পাস ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। বুলেটে জখম হয়ে হাত কাটতে হয় এক যুবকের। শুক্রবার জুমআর নামাযের পর বড় ধরনের বিক্ষোভ হতে পারে ধারণা করে জেলাশাসক চন্দ্রভূষণ সিং এদিন জেলাজুড়ে লাল সতর্কতা জারি করেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয় প্রশাসনের তরফ থেকে। ১০ কোম্পানি পিএসি ও ৪ কোম্পানির্ যাফ মোতায়েন করা হয়। ফলে আলিগড়ের রাস্তাঘাট জুড়ে সাধারণ মানুষের তুলনায় সামরিক বাহিনীরই ভারী বুটের আওয়াজ বেশি ছিল এদিন। 

বারানসী, দেওবন্দ, প্রয়াগরাজে অবশ্য শুক্রবারের পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই শান্ত। দেওবন্দের শারাফাত বাজার থেকে খানকা পুলিশ স্টেশন পর্যন্ত ২৫০০ জন মানুষের একটি মিছিল হয় জুমআর নামাযের পর। সিএএ বিরোধী স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে এদিনের মিছিলে ছিল ভারতের পতাকা। কোনও রাজনৈতিক দলের নাম বা চিহ্ন ছিল না। রাজ্যে সহিংস আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি এদিন বলেন, যারা এসব করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। অভিযুক্তদের সম্পত্তি থেকেই ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ করা হবে বলে তিনি জানান। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only