রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

সাংস্কৃতিক নিরক্ষরতা ঘোচাতে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ



গোলাম রাশিদ

গত শতকের দ্বিতীয় দশকের প্রথম দিকেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অবিভক্ত বাংলার, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিমদের শিক্ষাচর্চার ক্ষেত্রে এটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। ওই দশকেই সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও মুসলিমদের জাগরণ দেখা যায়। সওগাত, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের বিকাশ-পর্বও এটি। তার প্রায় ১০০ বছর পরে কলকাতায় নবরূপে যাত্রা শুরু করেছে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনোত্তর বাঙালি মুসলিমদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিকাশেও বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়, আরও স্পষ্ট করে বললে আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ। মুসলিমদের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধনকারী হিসেবে অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছে বয়সে নবীন এই সংসদ। উনিশ বা বিশ শতকের মুসলিম লেখকদের রচনার পুনর্মুদ্রণ কিংবা মধ্যযুগের পুঁথি-সাহিত্যকে সামনে আনা, বিস্মৃত হয়ে যাওয়া মুসলিম নারী কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিকদের দুষ্প্রাপ্য লেখার সংকলন প্রকাশ, তাঁদের নিয়ে আলোচনা সভা প্রভৃতির মাধ্যমে সমাজ ও দেশের সাংস্কৃতিক সেবা করে চলেছে আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ। রবিবার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কসার্কাস-স্থিত ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে এক আলোচনাসভায় ফুটে উঠল এরই একটি ঝলক। আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ ও বুকস স্পেসের উদ্যোগে আয়োজিত বইপ্রকাশ ও আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ১০০ বছরের ব্যবধানে এই আশ্চর্য সমাপতনকে এভাবেই দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করলেন বিশিষ্ট গবেষক জাহিরুল হাসান। তিনি বলেন, সেই সময়ে যেমন বুদ্ধির মুক্তি খোঁজ করেছে মুসলিম সমাজ, তেমনই এই সময়েও সাংস্কৃতিক নিরক্ষরতা দূর করতে চলছে সচেতন মানুষদের সম্মিলিত প্রয়াস। এ ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবে আলিয়া সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে জড়িত সাইফুল্লা, অধ্যাপক আমজাদ হোসেন ও তরুণ ছাত্র-গবেষকদের উৎসাহ ও নিরলস কাজের প্রশংসা করেন। জাহিরুল পরামর্শ দেন– অতীতের সাহিত্য-সংস্কৃতি পুনঃপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংসদকে সমসাময়িক বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার
মোকাবিলাতেও এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের বাঙালি জাতিসত্তা ও চেতনার জাগরণ ঘটাতে হবে। আমরা শুধু বাঙালি মুসলিম বা সংখ্যালঘু নই---আমরা বাঙালি, এই সর্বজনীন ভাবনা নিয়ে কাজ করতে হবে। 

এদিন স্বপন বসুর সম্পাদনায় ‘সংবাদ-সাময়িকপত্রে উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজ’ গবেষণা-গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সে সময়ে মুসলিমদের খবর তেমন একটা দেখা যেত না সংবাদ-সাময়িকপত্রের পাতায়। আজও সেই ট্রাডিশন পাল্টায়নি। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রাক্তন সাংসদ ও প্রাবন্ধিক মইনুল হাসান জানান, স্বপন বসু যে কাজটি করেছেন তা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রশংসাযোগ্য। বরাবরই সংবাদপত্রে মুসলিমদের উপস্থিতির হার খুব কম। স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর এই বর্তমান সময়েও তথাকথিত মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমগুলিতে মুসলিমদের খবর খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা আজও উপেক্ষিত। স্বপন বসুর বইটি পড়ে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংখ্যালঘুদের এই প্রান্তিকতা যদি ঘোচাতে আমরা সচেষ্ট হই, তবেই তাঁর কাজটির প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখানো হবে। একই অভিযোগ করেন গবেষক সুমিতা দাশ। তিনি বলেন, সংস্কৃতি-সাহিত্য বা সংবাদপত্রের আলোচনাতে  বাঙালি মুসলমানদের উপস্থিতি অত্যন্ত কম। পাশ্চাত্যের ইতিহাস পড়ে আমরা মেয়েদের অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করি– সচেতনহই। অথচ বেগম রোকেয়ার রচনা, নারীমুক্তি নিয়ে মতামত, মেয়েদের স্বাধীনতার জন্য তাঁর লড়াই আমাদের চোখে পড়ে না।

উনিশ শতকে বাঙালি সমাজে নবজাগরণ বা ইউরোপীয় রেনেসাঁর অনুকরণে এক ধরনের সমাজ-সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। হাড় হিম করা সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহের প্রবর্তন ঘটে এর ফলে। তবে একটি অভিযোগ রয়েছে, এই রেনেসাঁ থেকে দূরে থেকেছে মুসলিম সমাজ। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আবদুর রাউফ বলেন, মুসলিম সমাজে এই ধরনের রেনেসাঁর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি। কারণ, সতীদাহের মতো লজ্জাজনক ও বীভৎস অপরাধ এ সমাজে ছিল না। বিধবা বিবাহের চলও ইসলামের শুরু থেকেই রয়েছে। তাই মুসলিমদের আধুনিকতার ধরন অন্যদের থেকে ভিন্ন। তারা আধুনিক হবে তাদের বিচার-বুদ্ধি ও সংস্কার অনুসারে। উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমান সমাজে নবচেতনা নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক স্বপন বসুও। এদিনের সভায় বিশ্বকোষ পরিষদের সম্পাদক পার্থ সেনগুপ্ত, প্রাবন্ধিক মিলন দত্ত, আলিমুজ্জমান, অধ্যাপক আমজাদ হোসেন, অশোক উপাধ্যায়, নতুন গতির সম্পাদক এমদাদুল হক নূর, সাহিত্যিক রক্তিম ইসলাম, অধ্যাপক আবদুল মাতিন ওয়াসিম, আল-আমীন বার্তার কার্যনির্বাহী সম্পাদক সেখ হাফিজুর রহমান প্রমুখ বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন। এই অনুষ্ঠানে সাইফুল্লা ও কামরুল হাসান সম্পাদিত ‘প্রাক-সাতচল্লিশ পর্বে বাঙালি মুসলিম মেয়েদের সাহিত্য চর্চা’ গ্রন্থের চারটি খণ্ডের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন হয়। অধ্যাপক সাইফুল্লা জানান, মুসলিম নারী লেখকদের দুষ্প্রাপ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক চার খণ্ডের এই বৃহৎ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।    

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only