শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের জন্যই কি ভারত সফর বাতিল বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রীর?

হাসিনা সরকারের আমলে হিন্দু-নির্যাতন ঘটেনি, সাফাই রবীশ কুমারের



নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসের পরের দিন নাটকীয়ভাবে ভারত সফর বাতিল করলেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন। ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি আসার সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে তিন দিনের ভারত সফরে নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছনোর কথা ছিল মন্ত্রীর। কিন্তু হঠাৎ করে ‘অভ্যন্তরীণ’ ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে মন্ত্রী এই সফর বাতিল করেছেন একেবারে শেষ মুহূর্তে। বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে– ‘অভ্যন্তরীণ কিছু কাজ ও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদ্যাপনের জন্য বিদেশমন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হয়েছে। বিদেশমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবও বাংলাদেশের বাইরে। তাই কাজের যথেষ্ট চাপ রয়েছে বলে সফরে যেতে পারছেন না ড. মোমেন।’ কূটনৈতিক মহল বিষয়টিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে। তাদের প্রশ্ন– ব্যাপারটি নাগরিকত্ব বিল পাস হওয়ার পরের দিন কেন ঘটল? এদিন সকালেও ঠিক ছিল যে– ‘দিল্লি ডায়ালগ’ ও ‘ইন্ডিয়ান ওসেন ডায়ালগ’-এর বৈঠকে যোগ দিতে আসছেন বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী  ড. আবদুল মোমেন।  ১২-১৪ ডিসেম্বর ভারত সফর ছিল তাঁর। কেন বিদেশমন্ত্রীর সফরটি বাতিল হয়েছে– তার ‘প্রকৃত’ কারণ নিয়ে বাংলাদেশের অফিসাররা কেউ মন্তব্য করেননি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে– ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সংসদের দুই কক্ষে বিলটি পাসের পর এটা নিয়ে এরই মধ্যে উত্তর পূর্বাঞ্চলের অসম-সহ কয়েকটি রাজ্যে হিংসার ঘটনা ঘটা শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত– এই বিলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে--- পাকিস্তান– বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ২০১৪-এর ৩১ ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত আগত হিন্দু– শিখ– বৌদ্ধ– ক্রিস্টান– জৈন ও পার্সীরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবে। বাদ শুধু মুসলিমরা। 

তবে ভারতের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রবীশ কুমার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন,‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসের কারণে এই সফর বাতিল হয়নি। আগেও যেমন ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মধুর সম্পর্ক ছিল, এখনও তেমনি থাকবে।’ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে এখন ‘স্বর্ণযুগ’ চলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সংসদে অমিত শাহ হিন্দু নির্যাতন নিয়ে বাংলাদেশের দিকে আঙুল তুলেছেন। সেটা নিয়েও এদিন রবীশ কুমার সাফাই দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অমিত শাহের বক্তব্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে আক্রমণ করে এই মন্তব্য করা হয়নি। হাসিনা-সরকারের আমলে হিন্দু-নির্যাতন ঘটেনি। সে দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে যারা ভারতের আশ্রয় চেয়েছেন, তাদের নির্যাতন ঘটেছিল সামরিক সরকারের আমলে। বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান জীবিত থাকাকালে এবং শেখ হাসিনার শাসনামলে কোনও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি।’ রবীশ কুমার স্পষ্ট করে দেন, ‘শেখ হাসিনা সরকার সংখ্যালঘুদের নির্যাতন তো করেইনি, বরং তাদের দেখভাল করেছে দায়িত্বসহকারে।’ সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত করতে আওয়ামী লিগ সরকার নানা পদক্ষেপও নিয়েছে বলে ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।  

ভারতের বিদেশমন্ত্রকের এই স্পষ্ট বার্তার পরেও ‘ক্যাব নিয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে সম্পর্ক শীতল হচ্ছে’– এই ধারণা থেকে সরছে না বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ। এই বিল যে দুই মিত্র-প্রতিবেশীর সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছে, বুধবার তার আভাস দেন বিদেশমন্ত্রী আবদুল মোমেন।  লোকসভায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর ধারাবাহিক অত্যাচারের অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার প্রতিবাদে আবদুল মোমেন বুধবার বলেন, ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আনার অন্যতম কারণ বলে ভারতের পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্য সঠিক নয়। বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি অত্যন্ত গভীর। আমাদের দেশে অন্য ধর্মের মানুষ নিপীড়িত নয়। সরকারি অনেক অফিসার অন্য ধর্মের অনুসারী। সব ধর্মের লোক এখানে আছেন।’ ড. আবদুল মোমেন আরও বলেন, ভারত ঐতিহাসিকভাবে একটি সহনশীল দেশ– যারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে। সেখান থেকে পদস্খলন হলে ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থান দুর্বল হবে। এই মন্তব্যের পরেই বিদেশমন্ত্রী সফর বাতিলের ঘটনা ঘটল। তাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ঢাকা-দিল্লির সু-সম্পর্কের মধ্যে দেওয়াল তুলছে বলে বিশেষজ্ঞরা অনেকে মনে করছেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only