রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

‘হিন্দু-মুসলিম ভাইভাই, এনআরসি-ক্যাব বাংলায় নয়’

পুবের কলম প্রতিবেদক: এনআরসি এবং ক্যাবের বিরোধিতায় গোটা পশ্চিমবঙ্গজুড়ে চলছে বিক্ষোভ। শনিবার মালদার কালিয়াচক এবং হরিশ্চন্দ্রপুরে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখালেন হাজার হাজার মানুষ। কালিয়াচকে অবরোধ করা হয় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক। পাশাপাশি হরিশ্চন্দ্রপুর স্টেশনে লাইনের উপর পোড়ানো হয় টায়ার। যাত্রীবাহী ট্রেন থামিয়ে দেখানো হয় বিক্ষোভ। শনিবার দুপুর থেকেই মালদায় ক্যাব এবং এনআরসি-র বিরোধিতায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কালিয়াচক এবং হরিশ্চন্দ্রপুর এলাকা।

এ দিন নাগরিক সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানো হয় কালিয়াচকে। বিক্ষিপ্তভাবে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর পোড়ানো হয় টায়ার। এমনকী বিক্ষোভ সমাবেশ উঠে যাওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা নিজেরাই জ্বালানো টায়ারের অবশিষ্টাংশ তুলে ফেলে রাস্তা পরিষ্কার করে দেন। এই ঘটনা কালিয়াচক থানার পুলিশকেও অবাক করে। রাজ্যের অন্যান্য দিকে যেভাবে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, তা কালিয়াচকেও ঘটতে পারে, সেই আশঙ্কা করে বিশাল পুলিশ বাহিনী নামানো হয়েছিল এ দিন কালিয়াচকের চৌরঙ্গিতে।

ক্যাব-এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এ দিন পথে নামে কালিয়াচকবাসী। সংবিধান বিরোধী ক্যাব-এর প্রত্যাহারের দাবি জানান তাঁরা। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিভাজন নীতির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানানো হয়। আলিপুর-১ ও ২– কালিয়াচক-১ ও ২– সিলামপুর গ্রাম পঞ্চায়েত সহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ এ দিন ভিড় জমান কালিয়াচকের চৌরঙ্গি মোড়ে।

এ দিন দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ সমাবেশ। চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এর ফলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক। মালদা ও মুর্শিদাবাদগামী যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী থেকে সাধারণ মানুষ। বিক্ষোভকারীরা হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে শামিল হন। ক্যাব, এনআরসি-র বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে বিক্ষোভকারীদের বলতে শোনা যায়, ‘হিন্দু-মুসলিম ভাইভাই, এনআরসি-ক্যাব বাংলায় নয়।’

কালিয়াচকের এক সমাজসেবী এনারুল হক বলেন, ‘আমরা ক্যাব কিছুতেই মেনে নেব না। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আমাদের যে সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে চাইছেন, তা কোনও দিন পারবে না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন হবে। সর্বস্তরের মানুষ আমাদের পাশে রয়েছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ এখানে যোগদান করেছেন। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতে চেয়েছি। কালিয়াচকের বুকে তাইই করেছি।’

এ দিন যে হারে জমায়েত হয়, তাতে উত্তেজনা ছাড়ানোর সম্ভাবনা দেখে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে হাজির হন ডিএসপি প্রশান্ত দেবনাথ। ছিলেন কালিয়াচক থানার আইসি আশিস দাস সহ অন্যান্য আধিকারিকরা।

ডিএসপি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন হয়েছে। কিছুক্ষণের জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে বিকেল ৪টার দিকে বিক্ষোভ সমাবেশ উঠে গেলে যানচলাচল আবার স্বাভাবিক করা হয়।’

অন্যদিকে, হরিশ্চন্দ্রপুর স্টেশনে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ট্রেন অবরোধ করে চলে গ্রামবাসীদের বিক্ষোভ। এখানেও রেললাইনের উপর পোড়ানো হয় টায়ার। এনআরসি এবং ক্যাবের বিরুদ্ধে মূলত বিক্ষোভ দেখানো হয়। পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ দিন বিকাল দু’টোর সময় হরিশ্চন্দ্রপুর শহিদ মোড়ে হাজার পাঁচেক মানুষ জড়ো হয়। সেখান থেকে মিছিল করতে করতে বেলা তিনটে নাগাদ তারা হরিশ্চন্দ্রপুর স্টেশনে গিয়ে ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ। হরিশ্চন্দ্রপুর রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টার সহ স্টেশন মাস্টারের ঘরে ভাঙচুর চালিয়ে রেললাইনের মাঝখানে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ক্ষিপ্ত জনতা।
সেই সময় ৫৫৭০২ ডাউন কাটিহার মালদা টাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি এসে দাঁড়ালে উত্তেজিত আন্দোলনকারীরা ট্রেনটি লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে শুরু করেন। পাথর ছোড়ার ঘটনায় বেশ কয়েকজন যাত্রীর জখম হওয়ার খবর মিলেছে। এমনকী খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পাথরের ঘায়ে আক্রান্ত হন তনুজ জৈন নামে এক সাংবাদিক। মারমুখী জনতাকে শান্ত করতে না পেরে রেলওয়ে পুলিশ ও হরিশ্চন্দ্রপুর থানার পুলিশ পিছু হটে।

অশান্তির খবর পেয়ে সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয় বলে জানিয়েছেন চাঁচলের মহকুমা পুলিশ আধিকারিক সজল কান্তি বিশ্বাস।

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের কাটিহারের ডিভিশনাল ম্যানেজার অরুণ কুমার জানান, যাত্রী নিরাপত্তার কথা ভেবে এই রুটের অনেকগুলি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।   

এ দিকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস হয়ে যাবার পরে যে হারে বিক্ষিপ্ত অশান্তি তৈরি হয়েছে, তাতে সাধারণের কাছে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন সকলেই।

হরিশচন্দ্রপুরের প্রাক্তন বিধায়ক স্থানীয় তৃণমূল নেতা তজমুল হোসেন জানান, মানুষের আন্দোলনকে সমর্থন করলেও ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনাকে সমর্থন করা যায় না। হরিশ্চন্দ্রপুরের কংগ্রেস বিধায়ক ও দলের জেলা সভাপতি মোস্তাক আলম জানিয়েছেন, আমাদের লড়াইটা কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে। এনিয়ে রাজ্যজুড়ে কংগ্রেসের কর্মসূচি চলছে। হরিশ্চন্দ্রপুরেও আলাদা করে এ দিন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ২৩৩২৩ জন নাগরিকত্বের আবেদন জানিয়েছিলেন। ২০১৪ সালেই কংগ্রেস সরকার সংসদে বিলও এনেছিল। বিজেপি নাটক করে এই আইন পাস করিয়েছে। তিনি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে সমর্থন করলেও ভাঙচুরের ঘটনার নিন্দা জানান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only