বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

কেন মুসলিমরা দূরবর্তী রাজ্যে ছেলেমেয়েদের পড়তে পাঠায়?

কেরলের এতিমখানায় শিশুপাচার রহস্য

­ এ প্রশ্ন উঠতেই পারে পশ্চিমবাংলা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, অসম, মণিপুর প্রভৃতি পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি থেকে কেন এত বিরাট সংখ্যায় বালক-বালিকাদের সুদূর কেরলের অর্ফানেজে পাঠানো হচ্ছিল? এর সাদাসিধে জবাব হচ্ছে– এই পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে মুসলিমদের মধ্যে রয়েছে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি দারিদ্র্য। তাই যদি কোনও অনাথ বাচ্চার অভিভাবক বা পিতা-মাতার কাছে প্রস্তাব আসে যে কেরল বা মহারাষ্ট্রে কোনও এতিমখানা কিংবা বড় মাদ্রাসায় এই ছেলেমেয়েরা শিক্ষা, মানসম্পন্ন খাবার, বিনামূল্যে পোশাক-আশাক এবং ভালো পড়াশোনার সুযোগ পাবে– তাহলে তাদের দূরবর্তী ওইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এতিমখানায় পাঠাতে অভিভাবক এবং বাবা-মায়েরা সানন্দে রাজি হয়ে যায়। তাঁরা জানেন, অন্যথায় এই ছেলেমেয়েরা বখাটে অথবা চোর-ছ্যাছড়দের হাতে গিয়ে পড়তে পারে এবং তাদের ভবিষ্যৎ বলতে কিছু থাকবে না। তাই তারা পরিচিত স্থানীয় তত্ত্বাবধায়ক ও চলনদারদের হাতে এই ছেলেমেয়েদের তুলে দিতে খুব একটা দ্বিধা করেন না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য মুসলিম পিতা-মাতাদের মধ্যে সন্তানকে দূরবর্তী স্থানে পাঠানোর পরম্পরা ও ঐতিহ্য প্রথম থেকেই রয়েছে। তাই বাংলা থেকে উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দ, লখনউ– শাহারানপুর– আলিগড়– রামপুর কিংবা দিল্লি– ভোপাল বা তামিলনাড়ুর মাদ্রাসায় এই অঞ্চলের প্রচুর ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করতে যায়। এমনকী ‘ল্যান্ডলকড’ মণিপুর থেকেও মুসলিম ছেলেমেয়েরা শিক্ষার্জনের জন্য দূরবর্তী এইসব জায়গায় পাড়ি দেয়। আর এই ব্যবস্থা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। কাজেই এই অঞ্চলের কোনও মুসলিম পরিবারের মধ্যে বালক-বালিকাদের দূরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। আর যেহেতু এই পরম্পরা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে– তাই যখন বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনরা দেখে যে কেরল থেকে ছুটিতে তাদের ছেলেমেয়েরা বাড়িতে ফিরে এসেছে এবং তাদের পোশাক-আশাক– ব্যবহারে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে– দু’ছত্র ইংরেজিও বলছে– তখন তাঁদের খুশি হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আর এই ছেলেমেয়েদের প্রতি বছর ছুটিতে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে ওই এতিমখানাগুলিই। ফলে আশপাশের লোকদের দূরবর্তী মাদ্রাসাগুলোর প্রতি বিশ্বাস আরও মজবুত হয়। মোদ্দা কথা হল– দারিদ্র্য থেকে আপাত মুক্তি এবং শিক্ষার্জনের সুযোগ অভিভাবক কিংবা বাবা-মাকে অনুপ্রেরণা দেয়– যে বাচ্চাদের ওই এতিমখানা কাম স্কুল– এবং মাদ্রাসাগুলিতে পাঠাতে হবে। কোনও বাচ্চা যদি ওই এতিমখানাগুলিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়, তখন বাবা-মা ও অভিভাবকদের খুশির অন্ত থাকে না। যেমনটি উচ্চবর্গের মানুষদের ছেলে বা মেয়েরা যদি দেহরাদুনের দুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য মনোনীত হয়, তখন তাদের গর্ব-আনন্দের শেষ থাকে না। কেউ এই প্রশ্ন তোলে না, কেন শিলিগুড়ি– গুয়াহাটি বা আসানসোলের কোনও বাচ্চা দূরবর্তী দেহরাদুনের স্কুলে পড়তে যাচ্ছে? মিডিয়া ও ভদ্রলোকবাবু শ্রেণির যত রাগ কেবল মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলির বিরুদ্ধে। এই প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেই তাদের যত সংশয় আর সন্দেহ। তারা একবারও ভাবলেন না– কোনও পাচারকারী চক্র তাদের মতো উচ্চবুদ্ধি সম্পন্ন না হলেও ঘটে তাদের এই ক্ষুদ্র বোধবুদ্ধি থাকবেই যে পাচার করতে হলে ২০০ বা ৩০০ বালক বালিকাদের একসঙ্গে ট্রেনের কামরা ভর্তি করে ১৫০০-১৬০০ কিমি দূরবর্তী কোনও এতিমখানায় নিয়ে যাওয়া সহজ নয়। তা লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। তাই গিলোটিনে গলা রেখে কোনও পাচারকারী পাচার করতে যাবে না। পাচারকারীরাও  মিডিয়ার সাংবাদিক এবং পুলিশ প্রশাসনের থেকে এসব বিষয়ে কম বুদ্ধি ধরে না। কিন্তু বললে কী হবে– কিছু মহল সব সময় ভাবে ‘আরে এই তো, দেখেছ ৩০০ বাচ্চাকে ট্রেনে চাপিয়ে এরা পাচার করতে যাচ্ছে! ভাগ্যিস আমার চোখে পড়েছিল!’
আসলে সংখ্যালঘুরা ‘লঘু’ হলেও কোনও কোনও মহলের চোখে প্রায় ‘গুরু’ বা ‘ভারী’ হয়ে যায়। এতে কিন্তু কারও দোষ নেই। এটা হচ্ছে সংখ্যাগুরুদের কপালের লিখন। 
...চোখ রাখুন পরবর্তী কিস্তির ওপর

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only