শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

ক্যাব: মুখ্যমন্ত্রীর শান্তির আহবানে সাড়া দিন

বিশেষ সম্পাদকীয়
হিংসা নয়, হোক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন  

আহমদ হাসান ইমরান    

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে কয়েকদিন ধরিয়া দেশের কয়েকটি প্রদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ হইতেছে। ইহাতে নবতম সংযোজন হইল আন্দোলনের ব্যাপ্তি পশ্চিমবঙ্গেও প্রসারিত হইয়াছে। গত দুইদিন ধরিয়া হাওড়া, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহে সহিংস বিক্ষোভে শামিল হইয়াছে ক্ষুব্ধ জনতা। এই বিক্ষোভে বাংলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরও বড় ধরনের যোগদান লক্ষ করা যাইতেছে।

এই কথা সত্য যে, সদ্য পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ভারতের সংবিধান ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের গণতান্ত্রিক সমানাধিকারের উপর কুঠারাঘাত করিয়াছে। ইহার বিরুদ্ধে নাগরিকদের প্রতিবাদ স্বতঃস্ফূর্ত হইবে– তাহাই স্বাভাবিক। আর বাস্তবেও তাহাই ঘটিয়াছে। কিন্তু অশেষ পরিতাপের বিষয়– বিক্ষুব্ধ নাগরিকদের মধ্যে বেশ কিছু মানুষ প্রতিবাদের জন্য যে সহিংস পদ্ধতি গ্রহণ করিয়াছেন, তাহা শুধু চরম অন্যায় নহে– আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হাসিলের পক্ষেও মারাত্মক ক্ষতিকর। বাসে অগ্নি-সংযোগ, পথ অবরোধ, ভাঙচুর, ট্রেন রুখিয়া তাহাতে ভাঙাভাঙি কিংবা আগুন দিয়া পোড়ানোর চেষ্টা একদিকে জাতীয় ক্ষতি ও অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষের চরম হয়রানির জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। অন্যায় এই সহিংসতা ও ব্যাপক তাণ্ডব সকল সাধারণ মানুষকেই বিক্ষুব্ধ করিয়া তুলিতেছে। 

আর রাজ্যের বিস্তৃত  অঞ্চলে এই তাণ্ডব ও বিশৃঙ্খলার প্রকৃত ফসল এবং ফায়দা ঘরে তুলিবে বিজেপি-সংঘ পরিবার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারংবার ওয়াদা করিয়াছেন যে পশ্চিমবঙ্গে কোনোমতেই তিনি এনআরসি ও বিভাজনমুখী এই নাগরিকত্ব আইনটি কার্যকর করিতে দিবেন না। সংসদে ও সংসদের বাহিরে ক্যাব ও এনআরসি-র বিরুদ্ধে সব চাইতে  অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ এবং সাংসদরা এই নয়া নাগরিকত্ব আইনটি সম্পর্কে যে সকল তথ্য ও অকাট্য যুক্তি তুলিয়া ধরিয়াছেন, তাহার জবাব দিতে গিয়া অমিত শাহ ও তাঁহার সাংসদরা ল্যাজে-গোবরে হইতেছেন। এই আইনটি ভারত রাষ্ট্রের মূল চেতনা--- ঐক্য– সম্প্রীতি ও সমানাধিকারের জন্য যে বিশেষভাবে ক্ষতিকর তাহা এখন দেশের মানুষ সম্যক উপলব্ধি করিতে পারিতেছেন।

আর এই পরিস্থিতিতে এনআরসি ও ক্যাবের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শুধু নেতৃত্ব প্রদানই নহে, মুখ্য ভূমিকা পালন করিতেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশনেত্রীর আহ্বানকে উপেক্ষা করিয়া যাঁহারা অশান্তি ও সহিংসতায় লিপ্ত হইয়াছেন, তাঁহারা যে অমিত শাহ ও বিজেপির হাতকেই মজবুত করিতেছেন, তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গণতান্ত্রিক ভাবে আন্দোলন করিতে নিষেধ করেন নাই। বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং এই ‘বেআইনি’ আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিককে প্রতিবাদে শামিল হইবার আহ্বান জানাইয়াছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং এই সংবিধান বিরোধী ও বিভাজনমুখী আইন বাতিলের দাবিতে ১৬ ডিসেম্বর বাংলার রাজধানী কলকাতায় এক বিশাল পদযাত্রা করিবার ঘোষণা দিয়াছেন। একইসঙ্গে তাঁহার রহিয়াছে এনআরসি ও ক্যাবের কালা কানুনের বিরুদ্ধে আরও নানা কর্মসূচি। 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঠিকভাবেই হুঁশিয়ারি দিয়াছেন--- কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দাঙ্গা লাগাইবার চেষ্টা করিতেছে। তাহাদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ উসকানিতে বিভ্রান্ত হইয়া কিছু মানুষ সহিংসতায় লিপ্ত হইতেছে। যাহারা সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করিবে– তাহাদের কোনোমতেই রেয়াত করা হইবে না। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলিয়াছেন, প্রতিবাদ করিতে হইবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। 
ইতিমধ্যে রাজ্যের বিজেপি নেতারা প্রত্যাশা মতোই সাম্প্রদায়িক বয়ানবাজি শুরু করিয়াছেন। ইহাতে যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হইতেছে, তাহাতে কিন্তু সন্দেহ নাই। 
আমরা প্রত্যাশা করিব, সকল নাগরিকই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শান্তির এই স্পষ্ট আহ্বানে সাড়া দিবেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ইমামদেরও কর্তব্য হইল, ভুল পথে পরিচালিত মানুষজনকে সঠিক পথের দিশা প্রদর্শন। আর সেইসঙ্গে ‘আমাদের মুখ্য হাতিয়ার’ যে শান্তি ও সম্প্রীতিই--- জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষকে সেই বার্তাও জোরালো ভাবে প্রদান করিতে হইবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only