সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

হাঙ্গামাকারীরা সাবধান! পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার কঠোর পদক্ষেপ: মুখ্যমন্ত্রী


আহমদ হাসান ইমরান


মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্পষ্ট নির্দেশ এবং আবেদন সত্ত্বেও রবিবার পশ্চিমবাংলার কিছু জায়গায় হাঙ্গামা এবং সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তিতে হামলা হয়েছে। ক্যাব ও এনআরসি-র কথা তুলে এই উত্তেজনা এখন দক্ষিণবঙ্গেও থাবা বসাতে চাইছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মানুষকে বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছেন যাতে পশ্চিমবাংলায় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং এনআরসি না হয়। জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আশ্বাস সত্ত্বেও কিছু দুষ্কৃতি আইন না মেনে সরকারি ও বেসরকারি বাসে আগুন দিচ্ছে, ট্রেন অবরোধ করছে এবং তাতে অগ্নিসংযোগ করার চেষ্টা করছে। আর এই সবকিছুর দায় পুরোটাই মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা চলছে। আর এর কারণও রয়েছে। কারণ, টেলিভিশনের ক্যামেরায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যারা দুষ্কৃতিমূলক কাজগুলি করছে তাদের অনেকেরই মাথায় টুপি রয়েছে এবং লুঙ্গি পরে তারা পাথর ছুঁড়ছে। পুলিশ-প্রশাসনের সংযমকে এদের অনেকেই দুর্বলতা বলে মনে করছে। 


প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি রবিবার এক জনসভায় এই হাঙ্গামাগুলির জন্য সরাসরি মুসলিমদের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, কারা এই হাঙ্গামা করছে তা তাদের পোশাক দেখেই সকলে চিহ্নিত করতে পারছে। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের টুপি, লুঙ্গি, পায়জামা--- এগুলির দিকেই তিনি ইঙ্গিত করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দুষ্কৃতিকারী কিছু ‘বীর-পুঙ্গবের’ হুঁশ হচ্ছে না। তাদের আস্ফালন কিছুতেই থামছে না। দেখা যাচ্ছে– বহু বোঝানোর পরও এই অপরাধীরা সংযত হচ্ছে না। তারা বুঝতে পারছে না যে জেনেশুনে তারা বিজেপি ও সংঘ পরিবারের ফাঁদে পা দিচ্ছে। আর এর পরিণতি তাদের জন্য তো বটেই, সমগ্র মুসলিম সমাজের জন্যই এক অশুভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।


কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই হাঙ্গামাকারীরা কারা? কারা সম্প্রীতির এই পশ্চিমবাংলার শান্তি বিঘ্নিত করছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন না করে কারা এই কাজ করছে? ক্যাব ও এনআরসি-র বিরুদ্ধে আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিম সকলেই শামিল হতে আগ্রহী। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকারের এই জোড়া ফলার মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা সকলেরই। কিন্তু কিছু নির্বোধ মানুষ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বদলে নিশানার অভিমুখ ঘুরিয়ে দিচ্ছেন শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের দিকে। আর যারা এই আইন তৈরি করেছে এবং এনআরসি করতে চাইছে তাদেরও আসল লক্ষ্য হচ্ছে পশ্চিমবাংলা ও অসমের মুসলমানরা। কিন্তু প্রশংসা করতে হয় অসমের মুসলিমদের। তারা কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলনে অংশ নেননি। সেখানে প্রতিবাদ জানাচ্ছে অসমের গণমানুষ।

আবারও প্রশ্ন, পশ্চিমবাংলার হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, বীরভূমে কে বা কারা প্রতিবাদের নামে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে তাণ্ডব শুরু করেছে? তাদের এই কাজের চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। পথের মাঝখানে ট্রেন অবরোধ করায় হিন্দু-মুসলিম সকল যাত্রী চরম হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। অসুস্থদের চিকিৎসা– চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া মানুষ এবং আরও যারা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ট্রেন-বাসে সফর করছিলেন, তারা যে কী অসহায় অবস্থায় পড়েছেন--- তা বোঝা দুষ্কর নয়। রেল স্টেশনে আগুন, বাস ও ট্রেনে অগ্নিসংযোগ--- এগুলি যে গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিবাদের ভাষা নয়, তা জানা সত্ত্বেও হাঙ্গামাকারীরা তিনদিন ধরে এই দুষ্কর্ম করে চলেছে। আল্লাহ্কে ধন্যবাদ যে, এখনও এই পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের জন্যই পশ্চিমবাংলার মানুষকে এখনও ভুল বোঝানো যায়নি।

কিন্তু আবার বলব--- প্রশ্ন উঠছে, কারা দেশ ও রাজ্যের এই দুঃসময়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে? বিজেপির হাতে তুরুপের তাস তুলে দিতে চাইছে? দায়িত্ব নিয়ে বলা যায়, পশ্চিমবাংলার কোনও আলেম, ধর্মীয় নেতা, মুসলিম সামাজিক কার্যকর্তা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই দুষ্কর্মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনও ইন্ধন দেননি। বরং তারা সবাইকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তবে কাদের নির্দেশে এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে? কাদের হাতে খেলছে কিছু সংখ্যালঘু মানুষ? সমাজের নেতৃবৃন্দের আবেদন সত্ত্বেও কেন তারা কর্ণপাত করছেন না?

মুসলিম নেতৃবৃন্দ আজ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, যারা কুরআনের বাণীকে অগ্রাহ্য করে যারা এই ধরনের ফিতনা-ফ্যাসাদে রত হয়েছেন, তারা আমাদের কেউ নয়, মুসলিম সমাজ তাদের এই কাজের সঙ্গে কোনওভাবেই সম্পৃক্ত নয়। তাদেরকে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়ার কাজে মুসলিম সমাজকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

তবে এই প্রশ্ন থেকেই যায়, হাঙ্গামাকারী জনগণকে কারা পরিচালিত করছে? কাদের ষড়যন্ত্রে বিপথগামী হচ্ছে এই মানুষেরা? পরে যখন পুলিশি তদন্ত হবে তখন নিশ্চয়ই এই ষড়যন্ত্রকারীদের নেপথ্য ভূমিকার কথা পরিস্ফূট হবে।

এবার কিন্তু পুলিশ ও রাজ্যের র‍্যাফ এবং অন্য বাহিনী হাঙ্গামা দমনের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে চলেছে। সোমবারই তা পশ্চিমবাংলা জুড়ে পরিস্ফূট হবে। প্ররোচনা দানকারীদের পুলিশ ও র‍্যাফ যে কোনও মূল্যে গ্রেফতার করার নির্দেশনা পেয়েছে। এতে অবশ্য শান্তিপ্রিয় মানুষদের কোনও ভয় নেই। ইন্টারনেট কয়েকটি জেলায় সরকার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা পোস্ট করে প্ররোচনা দিয়েছেন, তাদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা হবে। তাই বলব, সাধু সাবধান। আর মুসিলমদের দু-একজন নেতা যে এই সময়ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের কথা বলছেন তারাও কিন্তু ভুল করছেন। কারণ, পরিস্থিতি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণেও নেই। তাই সরকার থেকে বলা হয়েছে, কিছু বহিরাগত সাম্প্রদায়িক শক্তির উস্কানিতে বিভিন্ন স্থানে হিংসা ছড়ানোর চক্রান্ত চলছে। এদের সম্পর্কে জনগণ অবশ্যই সতর্ক থাকবেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু তাঁর লক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেননি। তিনি আজ সোমবার ক্যাব, এনআরসি এবং শান্তি-শৃঙ্খলা-সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষে কলকাতাস্থিত আম্বেদকর মূর্তির পাদদেশ থেকে এক বিশাল মহামিছিল করবেন, যাতে বাংলার হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল সচেতন মানুষই অংশ নিচ্ছেন। আমার আবেদন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতকে মজবুত করুন। ফ্যাসিবাদী চক্রান্তকে ব্যর্থ করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only