বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯

রোম পুড়ছে, সম্রাট নিরো বাঁশি বাজাচ্ছেন!


দেশ জ্বলছে। নাগরিকদের মতামতকে অগ্রাহ্য করেই ক্যাব, এনআরসি। তবে কি জনগণের সুবিধা নয়, শুধু বহু-সংখ্যক মানুষকে ‘রাষ্ট্রহীন’ করার জন্যই এই চক্রান্ত? কাদের ধ্বংসস্তূপের উপর শাসকের প্রাসাদ গড়ে উঠবে? 

গোলাম রাশিদ   


রোম যখন পুড়ছিল...

কিংবদন্তি কিংবা ইতিহাস বলে, রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। এ প্রায় ২০০০ বছর আগের কথা। সে তো প্রাচীন যুগ। আমরা সেসব আদিমতা কবেই অতিক্রম করে এসেছি। এখন ডট কম টেকনোলজি আর ইভিএম-গণতন্ত্রের আধুনিক যুগ। তবুও কেন জানি কোথাও নিরোকে দেখা যায়। তিনি বাঁশি বাজাচ্ছেন। আর পুড়ছে ভারতবর্ষ। জ্বলছে দেশ। গান্ধিজি থাকলে আইন অমান্য আন্দোলন হত, অসহযোগ–সত্যাগ্রহ হত। জনগণ ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন। সেই প্রতিনিধিরা পথ দেখাতে পারছেন না। দেশকে পথ দেখানোর কোনও গান্ধি, আজাদ, নেহরু, সুভাষ নেই। জনতার ক্ষোভ বড় বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। কিন্তু সম্রাট নিরো নীরব। কারও দিকে কোনও ভ্র*ক্ষেপ নেই। তিনি একমনে বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছেন। আর এক এক করে জ্বলে যাচ্ছে নগরগুলো। 

ক্যাব বলতে দেশের মানুষ বুঝত ওলা কিংবা উবার অ্যাপ কার, ট্যাক্সি। এখন ক্যাব মানে সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল বা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। লোকসভার পর রাজ্যসভাতেও গতকাল পাস হয়ে গেল বিলটি । এই বিলে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে--- পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ২০১৪-এর ৩১ ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন ও পার্সিরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবে। বাদ শুধু মুসলিমরা। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানকে মান্যতা দেয় না দেশের সংবিধান। ফলত সংবিধান-বিরোধী এই বিলের বিরুদ্ধে উত্তাল দেশ, বিবেকবান জনতা। পুড়ছে দেশ। নিরো স্পিকটি নট। 

ক্যাবের উদ্দেশ্য সঠিক ভাবে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা। শরণার্থী আর অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা। বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের মানুষ শুধু অনুপ্রবেশকারী। ক্যাবের পর এনআরসি হলে শুধু মুসলিমরাই ভুগবে? পার্শ্ববর্তী দেশগুলি থেকে অমুসলিমরা এসে নাগরিকত্ব নিলে দেশের অর্থনীতির উপর তারা বোঝা হয়ে পড়বে না? আর এর প্রক্রিয়া নিয়েই তো রয়েছে বড় একটা অনিশ্চয়তা। অসমে এনআরসির সময়ে দেখা গেছে– বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এর জাঁতাকলে, পরবর্তীতে কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গেও এই পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে। ডিজিটাল রেশন কার্ড আর ইভিপি-তে আশঙ্কিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন বাংলার বেশ কিছু মানুষ। চারিদিকে এত বিরোধিতা। তবু কানে যাচ্ছে না সম্রাটের। তিনি বাঁশি বাজাতেই ব্যস্ত। 

ক্যাবের পর দেশজুড়ে এনআরসি হবে। সেই এনআরসি এখন বিজেপির প্রধান অস্ত্র। নোটবন্দি, জিএসটি, দলিত ও সংখ্যালঘু মব লিঞ্চিং নিয়ে ব্যাকফুটে চলে যাওয়ার পর (রামন্দিরও হয়ে গেল) এটাই এখন তাদের তুরুপের তাস। দেশের মানুষকে ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি দিয়ে ভাগ করার যে নীতি একসময় বেনিয়া ব্রিটিশরা নিয়েছিল, সেটাই এখন নব্য বেনিয়াদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে বেকারত্বের এমন বৃদ্ধি দেশ দেখেনি। অর্থনীতির গ্রাফ, জিডিপির কচকচানিতে না গিয়েই বলা যায়, ভারত কত ট্রিলিয়নের অর্থনীতির দেশ হতে চলেছে! 

দেশজুড়ে যারা এনআরসির কথা বলে তারা অর্থনীতির কথা না ভেবেই বলে। কারণ, অর্থনীতি বা দেশের মানুষ তাদের কাছে প্রধান নয়। ভাগ করে দেশটাকে সেকুলার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করাই প্রধান লক্ষ্য। পুরনো নথি খুঁজতে গিয়ে কাজ করতে পারবে না মানুষ। পরিযায়ী শ্রমিকরা বাইরের রাজ্য বা দেশ থেকে কাজ ছেড়ে ফিরে এসে বাপ-দাদার আমলের পুরনো দলিল ঢুঁড়তে থাকবে। ক্ষতি কার? এমনকি দেশের সত্যিকারের নাগরিক হলেও অনেকেই এনআরসিতে নাম তুলতে পারবে না প্রয়োজনীয় নথিপত্র– প্রমাণাদির অভাবে। কারণ, এই দেশে সেই জিনিসটার জরুরত তেমন ভাবে পড়েনি। পেটের ভাত জোটাতে সবাই ব্যস্ত থাকে। এ দেশের চর্ম শিল্প, নির্মাণ শিল্প, পোশাক শিল্প ছাড়াও বহু শিল্প-ব্যবসা মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সে ক্ষেত্রেও একটা সমস্যার সৃষ্টি হবে। অসমের তিন কোটি মানুষের এনআরসি করতে প্রায় ৫২,০০০ সরকারি কর্মচারী, ১৬০০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। তাহলে প্যান-ইন্ডিয়া এনআরসির হিসেব করতে ঐকিক নিয়মকে কাজে লাগান, খরচের বহর দেখে চোখ কপালে উঠবে। সে ক্ষেত্রে ভারতের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল সরকারি কাজ হবে। অথচ এই ব্যয়বহুল কাজ শুরুর জন্য কোনও প্রামাণ্য নথি নেই। কোনও সার্ভেও হয়নি কতজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এ দেশে আছেন তা নিয়ে। আর কতজন হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখই বা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে– তার কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এর নাম মশা মারতে কামান দাগা। কোটি কোটি টাকা খরচ আর সাধারণ দরিদ্র মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা ছাড়া আর কিছু নয়। নিরো রোম নগরীতে আগুন লাগানোর দায়ে খ্রিস্টানদের দায়ী করে তাদের হত্যা করেছিলেন অহেতুক (ধারণা করা হয়, আগুন তিনিই লাগিয়েছিলেন)। এখানে টার্গেট কে?

    
নিরোর প্রাসাদ নির্মাণ

রোম নগরী পুড়ে যাওয়ার পর সম্রাট নিরো বিশাল এক প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন দুই পাহাড়ের মাঝখানে। সেখানে নাকি সোনার তৈরি একটি ঘরও ছিল। রোম নগরী যখন ধ্বংসস্তূপ, তখন নিরো নিজের প্রাসাদ গড়তে মত্ত। 

সব ‘ঘুসপেটিয়া’কে বহিষ্কার করা হবে। কোথায় পাঠানো হবে? মঙ্গলে না চাঁদে? বাংলাদেশের সঙ্গে এমন কোনও চুক্তি হয়নি যে, এনআরসিতে যারা বাদ পড়বে তারা বাংলাদেশি হলে সেখানে ফেরত পাঠানো হবে। শেখ হাসিনা বেশ কিছুদিন আগে নতুন দিল্লি ঘুরে গিয়েছেন। তখনও তিনি ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ’ বিষয়ে নাক গলাতে চাননি। তাহলে কোটি কোটি অনাগরিক কোথায় যাবে? রোহিঙ্গাদের মতো সীমান্ত ডিঙিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই। তাহলে তারা কি দেশেই থাকবে, বন্দিশালায়? গেরুয়া বাহিনীর আন্দাজ মতো (বাংলা থেকেই দু’কোটি!) সেই সংখ্যক ‘উইপোকা’দের রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাম্প বানাতে গেলে ভারতের আর্থিক হাল কী হবে বলুন। সুতরাং, এদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হবে। আর্থিক, উন্নয়নমূলক পরিসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন তারা। সম্পত্তিও নিশ্চয় কেড়ে নেওয়া হবে। সামাজিক অবনমন, আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে দেশের একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে জব্দ করতে গিয়ে! আর এভাবেই ভারত হয়তো দ্বিতীয় ফিলিস্তিনে পরিণতে হতে যাচ্ছে। কিংবা, মরিস্কোদের মতো অবস্থাও হতে পারে তাদের। স্পেনের শাসন ক্ষমতা (১৪৯২-এ গ্রানাডার পতনের পর) হারানোর পর সেখানকার মুসলিমদের অবস্থা করুণ হয়ে পড়ে। বহু মানুষ হিজরত করে চলে যান আফ্রিকায়। কিন্তু যারা জন্মভূমির মায়া ছেড়ে যাননি, তারা পরিণত হন সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেনে। খ্রিস্টান হতে হবে স্পেনে থাকতে হলে। রোমে থাকতে হলে রোমান হতে হবে। নতুন পরিচয় পেল তারা---মরিস্কো। আজ স্পেনে মুসলিম খুঁজতে গেলে আতস কাচের দরকার পড়ে। কর্ডোভা, গ্রানাডা, টলেডো একটি ইতিহাসের ধংসস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গোয়াদেল কুইভারের স্রোত তার সাক্ষী। 

বসুধৈব কুটুম্বকম

মহাউপনিষদের এই শ্লোকটি দিল্লিতে সংসদের এন্ট্রান্স হলেও লেখা আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানেই এর বিরুদ্ধাচরণ করা হচ্ছে। বিশ্ব একটি পরিবার--- এই গ্লোবাল ব্রাদারহুডের আদর্শে বিশ্বাস করে এমন একটি দেশ কীভাবে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের কথা বলে? শুধু মুসলিমরাই কেন বাদ ক্যাব থেকে? সংখ্যালঘুদের অত্যাচারের প্রসঙ্গ যদি বা আসে, তবে শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, নেপালের সংখ্যালঘুদের উপর এত অত্যাচার হওয়ার পরও কেন তাদের আশ্রয় দিয়ে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না? তারা ক্যাবে নেই কেন? ক্যাব সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে যেমন ভেঙে দিচ্ছে, তেমনি এই দেশের চিরায়ত ঐতিহ্য ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’কেও হেঁট করছে। বিশ্বের কাছে একটি সংকীর্ণ মানসিকতার দেশের শাসক হিসেবে পরিচিত হতে চান, সম্রাট নিরো? 


নিরোর আত্মহত্যা

নিরো স্ত্রী, মা, সৎভাইদের হত্যা করেছিলেন। সেই স্বৈরাচারী নিরোই অবশেষে আত্মহত্যা করেছিলেন জনগণের ভয়ে। স্বৈরশাসকদের ইতিহাস ক্ষমা করে না। জনগণ ক্ষমা করে না। জনতা ঠিক একদিন ঘুরে দাঁড়ায়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only