মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২০

বাড়ছে ‘মমতা ম্যাজিক’ বনাম প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতি

ধর্মতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের ধরনা মঞ্চে বিক্ষোভকারী ছাত্রছাত্রীদের কথা শুনছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আহমদ হাসান ইমরান
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসেছিলেন বাংলার রাজধানী কলকাতায়। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই তিনি বিখ্যাত গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী  হিসেবে। কারণ গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি একবারই মাত্র এসেছিলেন কলকাতায়। তখনও তাঁর কলকাতায় আগমন নিয়ে প্রবল বিক্ষোভ হয়েছিল সংস্কৃতির শহর কলকাতায় ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার একটি বিতর্ক অনুষ্ঠানে। বাংলার ছাত্রছাত্রী ও তরুণরা বিমানবন্দর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রবলভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। বিতর্কের অনুষ্ঠানস্থল ক্যালকাটা ক্লাবেও প্রবেশের সময় তাঁকে অভূতপূর্ব বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। জেড ক্যাটেগরির নিরাপত্তা না থাকলে মোদির পক্ষে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করাই সেদিন সম্ভব হত না। 
এবার তিনি কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য দু’দিনের সফরে ‘সিটি অফ জয়’-এ  এসেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সিএএ, এনআরসি, এনপিআর, অর্থনৈতিক মন্দা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের চরিত্র পাল্টানোর চেষ্টা, নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি এবং বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে গণআন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি বর্বরতা, ছাত্রছাত্রীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় নৃশংস হামলা প্রভৃতি কারণে দেশ এখন উত্তাল। আর এ জন্যই সকলে দায়ী করছে মোদি সরকারকে।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পদটি হচ্ছে সাংবিধানিক। ব্যক্তি নয়, এই সাংবিধানিক পদকে অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার দমদম বিমানবন্দরে একজন মন্ত্রী পাঠিয়ে নিয়ম রক্ষা করেছে। এই রাজ্যের প্রাপ্য হাজার হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবাংলাকে দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। সেজন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং রাজ্যের যুক্তিসঙ্গত দাবিকে ফের একবার তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন। রাজ্যের স্বার্থে মু্খ্যমন্ত্রী সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন জেনেও নিজ কর্তব্য পালন করেছেন। এছাড়া কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের অনুষ্ঠানে বাংলার মু্খ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগ দিয়েছেন। 
কিন্তু বিষয়টি বামপন্থী ও বিরোধী দলের কিছু ছাত্র সংগঠনের পছন্দ হয়নি। তাঁরা ধর্মতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের ধরনা মঞ্চের অনুষ্ঠানে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে হাজির হন। এ সময় মু্খ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ওই ধরনা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মমতা কিন্তু বিরোধী ছাত্রদের এই অশোভন ও মারমুূী আচরণের সম্মুখীন হয়েও পুলিশি নিরাপত্তার ঘেরাটোপে সেখান থেকে সরে যাননি। বরং অদম্য সাহস নিয়ে তিনি মোটামুটি হয়েছেন ওই ছাত্রদের। কেন তিনি মোদিকে রাজ্যে ঢুকতে দিলেন, কেন তিনি মু্খ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন---এইসব প্রশ্নবাণের মুখে বিচলিত না হয়ে কথা বলেন প্রতিবাদী ওইসব ছাত্রদের সঙ্গে। ধীরে ধীরে মমতার বক্তব্য ও আচরণে সেখানে উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা শান্ত হয়ে পড়েন। যে ঘটনা এক রক্তাক্ত পরিণতির দিকে যেতে পারত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহস, প্রজ্ঞা ও পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতায় তা বরং গণতন্ত্ররই এক উজ্জ্বল দিক হিসেবে প্রতিভাত হয়। কাঁদানে গ্যাস, বুলেট দূরে থাকুক---পুলিশকে লাঠিচার্জও করতে হয়নি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর জন্যও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে।
অথচ মোদির দল বিজেপি শাসিত রাজ্য অসমে অশান্তি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির ভয়ে প্রধানমন্ত্রী গুয়াহাটি সফর বাতিল করতে বাধ্য হন। ‘খেলো ইন্ডিয়া খেলো’-র খেলোয়াড়দের ‘হ্যালো’ বলারও তাঁর সুযোগ হয়নি। 
তবে এই সম্বন্ধে একটি কথা বলা প্রয়োজন। মাঝে মধ্যেই মোদির দলের নেতা-মন্ত্রী-কর্মী ও বিচ্ছুরা অমৃতবাণী বিতরণ করেন, পশ্চিমবাংলায় নাকি আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। পরিস্থিতি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।
পশ্চিমবাংলায় মোদি নির্বিঘ্নে হাজির হন বেলুড় মঠে। সবাই ভেবেছিল, এটি হয়তো হবে মোদির এক আধ্যাত্মিক সফর। কিন্তু হা-হতোস্মি! আধ্যাত্মিক নয়, নিজের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রচার-প্রসারের কাজেই মোদি বেলুড় মঠের পবিত্র অঙ্গনকে ব্যবহার করে গেলেন।
যেভাবে পশ্চিমবাংলার মু্খ্যমন্ত্রী  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের নিরাপত্তার বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে বিক্ষোভকারী ছাত্রদের স্বয়ং শান্ত করলেন, তাতে আরও একবার প্রমাণ হয়, ‘মমতা ম্যাজিক’ কিন্তু শেষ হয়নি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only