শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২০

সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে দুই শহিদের জানাযাতে মানুষের ঢল

বিচারের দাবিতে সরব হচ্ছেন জেলার মানুষ

দেশজুড়ে চলছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং প্রস্তাবিত এনআরসির বিরুদ্ধে আন্দোলন। তারই সুরে সুর মিলিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের জলঙ্গির বেশ কিছু নাগরিক। অরাজনৈতিক একটি মঞ্চ তৈরি করে বুধবার বন্ধ পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা। সেই অনুযায়ী বনধ ও অবরোধ চলছিল জলঙ্গির সাহেবনগরে। কিন্তু নেতৃগোছের কিছু মানুষের মনে হয়– তাদের ‘লিডারশিপ’ না দিয়ে এই ধরণের বনধ ও অবরোধ করা চলবে না। হয়তো তাদের মনে হয়েছিল– স্বতস্ফূর্ত বনধ হলে তাদের নেতৃত্ব ও আধিপত্য ক্ষুন্ন হবে। এই নিয়েই শুরু হয় বিতর্ক-বচসা। 

সেখানে হঠাৎ সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালায় দুষ্কৃতীরা। মৃত্যু হয় স্থানীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন আনারুল বিশ্বাস(৬১) ও কিশোর সালাউদ্দিন সেখের(১৯)। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি– দু’জনই বনধ বা অবরোধের সঙ্গে কোনও ভাবে জড়িত ছিলেন না।  তবুও তাঁদেরকেই প্রাণ হারাতে হল। অথচ এখনও প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে পারেনি পুলিশ। আর এই ক্ষোভ নিয়েই এখনও উত্তপ্ত অবস্থা জলঙ্গির সাগরপাড়া-সাহেবনগর এলাকায়। জলঙ্গি জুড়ে থমথমে পরিস্থিতি। 

বৃহস্পতিবার অবশ্য পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। এ দিন সকালে কয়েক হাজার মানুষ জলঙ্গি থানার ওসি উৎপল দাসকে বরখাস্তের দাবিতে ৬ ঘণ্টা ধরে বহরমপুর-সাগরপাড়া রাজ্যসড়ক অবরোধ করে রাখেন।
 অবরোধকারীদের বক্তব্য ওসি উৎপল দাসের নিষ্ক্রিয়তা এবং একপেশে কার্যকলাপের জন্যই ঘটনা এতোদূর গড়াতে পেরেছে। মুয়াজ্জিন আনারুল বিশ্বাস ও কিশোর সালাউদ্দিন সেখের লাশ নিয়েই ক্ষুব্ধ ও শোকার্ত জনতা রাস্তা অবরোধ করে। এই সময় সিএএ-এনআরসির বিরুদ্ধে স্লোগান উঠতে থাকে। ওসি উৎপল দাসের অপসারণ ও সাসপেনশন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তহিরুদ্দিন মণ্ডলকে গ্রেফতারের দাবিতে বিক্ষোভ-স্লোগানে ফেটে পড়েন সাগরপাড়াবাসী। পরে উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকদের আশ্বাসের পর অবরোধ উঠে যায়। সাহেবনগরে দুপুরের পর মুয়াজ্জিন আনারুল বিশ্বাস ও কিশোর সালাউদ্দিনের নামায-এ-জানাযা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। সাগরপাড়া-সাহেবনগর ও আশেপাশের এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ জানাযায় সমবেত হন। মোদি-শাহ তথা বিজেপি সরকারের কালাকানুন সিএএ-এনআরসির বিরুদ্ধে সংগ্রামে এই দু’জন ‘শহিদ’ হয়েছেন বলে জানাযা ও দাফনে অংশ নিতে আসা স্থানীয় মানুষজন মন্তব্য করেন। 

স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন তারা নিহত কিশোরের বাড়িতে গিয়েছিলেন। ওই পরিবারের সদস্যদের কান্না ও আহাজারিতে তাদের মতো শক্ত হ*দয়ের সাংবাদিকদেরও মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। 

বুধবারের ঘটনায় মৃত্যুর জন্য অনেকেই দায়ী করছেন পুলিশকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান– পুলিশ হাজির থেকেও উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। তারা উদ্যোগী হলে হয়তো ২ জন নিরীহকে অসহায়ের মতো প্রাণ হারাতে হতো না। 
গুলি চালনার ঘটনার পরেই সেখানে উপস্থিত আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন– জলঙ্গি (উ.) ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি তহিরুদ্দিন মণ্ডল এবং স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামী মিলটন সেখের নেতৃত্বে এই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পুলিশ যে তিনজনকে (রফিকুল ইসলাম– আবুল কালাম– কুড়ান সেখ) গ্রেফতার করেছে– তারা নিরপরাধ বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ছেড়ে দিয়ে মূল অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে পথ অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিলে বৃহস্পতিবার শামিল হন এলাকার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। ইতিমধ্যে তহিরুদ্দিন মণ্ডল– মিলটন সেখ সহ দশজনের নামে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে ২ নিহতের পরিবার। পুলিশ সূত্রে খবর– তহিরুদ্দিন মণ্ডল পলাতক। তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার অজিত সিং যাদব বলেন যে– দু’টি এফআইআর দায়ের হয়েছে। আমরা তিনজনকে গ্রেফতার করেছি। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়েছে। এলাকায় যথেষ্ট পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলেও জানান তিনি। 

অন্যদিকে– তহিরুদ্দিন মণ্ডল বুধবার সন্ধ্যায় একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন– এই ঘটনায় আমার ভাইও আহত হয়েছে। আমি কিভাবে এটা করতে পারি? তার দাবি– সিপিএম ও কংগ্রেস-সমর্থিত কয়েকজন দুষ্কৃতী রাস্তা অবরোধ করেছিল। অবশ্য স্থানীয় মানুষজন তার এই দাবিকে উড়িয়ে দিচ্ছেন।

 তৃণমূল কংগ্রেসের মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি ও সাংসদ আবু তাহের খান বলেন– ঘটনাটির কথা জেনেছি। তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনায় যুক্ত নয়। তহিরুদ্দিন মণ্ডলের বিরুদ্ধে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত আমরা নিইনি। তবে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য আমরা পুলিশের কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। তদন্তে যদি তহিরুদ্দিন দোষী প্রমাণিত হয়– তবে তৃণমূল কংগ্রেস তার পক্ষে  ঢাল হয়ে দাঁড়াবে না। তৃণমূল জেলা সভাপতি আবু তাহের খানের বক্তব্য– সিএএ– এনআরসি– এনপিআর-এর বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের যে কোনও নাগরিকেরই শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only