সোমবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২০

রক্তাক্ত জেএনইউ, মুখোশ পরে তাণ্ডব এবিভিপির গুন্ডাবাহিনীর, দেশজুড়ে প্রতিবাদ

আক্রমণ বাঙালি ছাত্রী ঐশীকে


দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) দুষ্কৃতীদের হামলার প্রতিবাদে সরব হল দেশের পড়ুয়া ও শিক্ষক মহল। মুম্বই, কলকাতা, দিল্লি, আলিগড়, পুনের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন।

সন্ধ্যায় জেএনইউতে তাণ্ডবের পরে গতরাত ১০টা নাগাদ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট থেকে মিছিল শুরু করেন পড়ুয়ারা। মিছিলে পা মেলান বহু প্রাক্তনী-সহ অধ্যাপকরাও। মিছিল থেকে বিজেপি ও এবিভিপি বিরোধী স্লোগান ওঠে। পোড়ানো হয় বিজেপির পতাকা। জেএনইউয়ে হামলার নিন্দা করে যাদবপুরের শিক্ষক সংগঠন জুটা। সংগঠনের সম্পাদক পার্থপ্রতিম রায় বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই যদি পড়ুয়ারা সুরক্ষিত না থাকেন, তাহলে সভ্য সমাজে বাস করছি বলে আমরা কীভাবে দাবি করতে পারি? এরকম ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত ও হতবাক।

রবিবারের সন্ধ্যায় রক্তে ভাসল জেএনইউ। জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এবার জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা আক্রান্ত হলেন। অভিযোগের তির বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপির দিকে। রবিবার সন্ধ্যার পর জেএনএউ-এর ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের উপর চড়াও হয় একদল মুখোশ ঢাকা গুন্ডা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি ঐশী ঘোষের মারাত্মক আঘাত লাগে। তার মাথা ফেটে যায়। ‘নিষ্ঠুর ভাবে আমাকে মেরেছে মুখঢাকা গুন্ডারা–’ কাঁদতে কাঁদতে বলেন ঐশী। মারাত্মক আহত অবস্থায় তাকে এইমস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ঐশী ছাড়াও বহু ছাত্রছাত্রী আহত হয়েছে এই ঘটনায়। জেএনইউ-এর গার্লস হস্টেলের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর করে বিজেপি-আরএসএস বাহিনী। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে– মুখ ঢেকে হাতে লোহার রড, লাঠি, ব্যাট নিয়ে ভেতরে ঢুকছে এবিভিপির সদস্যরা। আরেকটি ভিডিয়োয় রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঐশী ঘোষের মুখ, মাথা। উল্লেখ্য, ঐশী এসএফআইয়ের নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরের বাসিন্দা। বিশ্ববিদ্যালয়কে নিরাপদ ভেবে সেখানে ছেলেমেয়েদের পড়তে পাঠায় বাবা-মারা। বর্তমান কেন্দ্র সরকারের আমলে যেভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা বাড়ছে তাতে– সেই বিশ্বাস উঠে যেতে বসেছে বলে মত অনেকের। 

রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার দিকে প্রায় ৫০ জনের গুন্ডাবাহিনী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। অধ্যাপক– ছাত্রছাত্রীদের দাবি– তারা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্য। জেএনইউতে ঢুকেই তারা এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করে। বহু পড়ুয়া ভয়ে সাহায্য চেয়ে অধ্যাপকদের ফোন করে। েযসব অধ্যাপক ছাত্রছাত্রীদের বাঁচাতে যায়– তাদেরও এলোপাথাড়ি ভাবে মারে এবিভিপি ও তাদের ভাড়াটে গুন্ডা বাহিনী। ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি সাকেত মুন জানান– বিজেপির ছাত্র সংগঠনের গুন্ডা বাহিনী ঘরে ঘরে গিয়ে পড়ুয়াদের মারধর করে। এইসময় নিরাপত্তা-রক্ষীরা নীরব দর্শকের ভূমিকা নেয় বলে তার অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অতুল সুদ জানিয়েছেন– রডের সঙ্গে ওদের কাছে বড় বড় সাইজের পাথরও ছিল। সেগুলি ছুড়তে ছুড়তে ওরা হস্টেল-ক্যাম্পাসে ঢোকে। এই মাপের পাথর একটা মাথায় পড়লে মাথা ফেটে যেত। আমি একধারে চুপচাপ পড়ে ছিলাম। পরে দেখি ওরা প্রচুর গাড়ি ভাঙচুর করেছে– সঙ্গে আমারটাও। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর সম্পত্তি ভাঙচুর করেছে এবিভিপির ছেলেরা– অভিযোগ তাঁর। 

জেএনইউ-এ বিজেপির ছাত্র সংগঠনের এই হামলার পরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে দেশের সচেতন মানুষজন। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মোমবাতি মিছিল করে এই জঘন্য হামলার প্রতিবাদে। জামিয়া মিল্লিয়ার পড়ুয়ারা রাত ন’টার সময় আইটিও-তে জমায়েত হয়। এবিভিপির গুন্ডাবাহিনীকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে স্লোগান দেয় তারা। জেএনইউ ক্যাম্পাসে ‘এবিভিপি গো ব্যাক’ স্লোগান ওঠে। সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন– এই আক্রমণ হয়েছে দিল্লি পুলিশের একেবারে নাকের ডগায়। তারপরও তারা কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। এই আক্রমণ শুধু ছাত্রদের উপর নয়– বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর। সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি বলেন– ওরা সফল হবে না। প্রাক্তন ছাত্রনেত্রী শেহলা রশিদ একটি টুইটে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ট্যাগ করে বলেন– আপনার দলের আর একটুও লজ্জা কি বাকি আছে? দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। 

হস্টেল ফি বৃদ্ধি-সহ নানা ছাত্রবিরোধী ইস্যু নিয়ে গত ৭০ দিন ধরে পড়ুয়া ও প্রশাসনের মধ্যে সংঘাত চলছে। লাগাতার আন্দোলন চলছে জেএনইউ-এর ছাত্রদের। সিএএ-এনআরসির বিরুদ্ধেও তারা সরব হয়েছে। সেই আন্দোলনকে ভেস্তে দিতেই এমন হামলা বলে মত ছাত্র সংসদের। এর আগেও কর্তৃপক্ষ তাদের আন্দোলন দমাতে হামলা চালিয়েছে। এবার সেটা এবিভিপির মাধ্যমে করল– দাবি তাদের। 

  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only