শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

অসমে মাদ্রাসা বন্ধের ঘোষণা বিজেপি সরকারের


অসমের বিজেপি সরকার রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলিকে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলি শুধু ধর্মীয় উত্তরাধিকার বহন করে তা নয়, বরং আধুনিক বিষয়গুলিতে পঠন-পাঠনের পুরো ব্যবস্থা রয়েছে। অসমে শিক্ষার প্রসার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে মাদ্রাসাগুলি যে বড় ভূমিকা রেখেছে, তা সকলেই স্বীকার করেন। 

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্ভবত ভারসাম্য রক্ষার জন্যই এ কথাও বলেছেন যে, রাজ্যে যে সমস্ত সরকারি টোল রয়েছে, সেগুলিকেও বন্ধ করে দেওয়া হবে আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যেই। অসমে সরকারি-বেসরকারি মিলে বেশ কিছু টোল রয়েছে। তার মধ্যে মাত্র ৯৭টি টোলে অনুদান প্রদান ও শিক্ষকদের বেতন অসম সরকার বহন করে থাকে। 

মাদ্রাসা বন্ধ করার অজুহাত হিসাবে হিমন্ত বিশ্বশর্মা যে যুক্তি দেখিয়েছেন তা হল, অসমের বিজেপি সরকার নাকি খুবই ‘সেকুলার’। বিশ্বশর্মা আরও বলেন, ধম, ধর্মশাস্ত্র এবং ‘ধর্মীয় ভাষা’ যেমন--- আরবি শেখানো কোনও সেকুলার সরকারের কাজ হতে পারে না। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে অসম সরকার মাদ্রাসা বোর্ড তুলে দিয়ে হাই মাদ্রাসাগুলিকে ‘সেকেন্ডারি বোর্ড অফ এডুকেশন অফ অসম’-এর সঙ্গে শুধু জুড়ে দেয়। মাদ্রাসাগুলিকে এই বোর্ডের অধীনে এনে বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী শিক্ষাপ্রদান বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছিল। এখন মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, অসমে ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা মাদ্রাসা সিস্টেম এবং মাদ্রাসাগুলিকে সরকার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই ঘোষণা ওই পরিকল্পনাকে মানুষের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে। 
হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, তাঁর হিসেব মতো অসমে ১২০০ মাদ্রাসা এবং ২০০টি  টোল রয়েছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে পরিচালনা করার জন্য কোনও স্বাধীন বোর্ড বা পর্ষদ নেই। হিমন্ত আরও বলেন, আসলে সমস্যা হচ্ছে মাদ্রাসা থেকে পাশ করলে এই ছাত্রছাত্রীরা যে সার্টিফিকেট পান, তা ম্যাট্রিকুলেশন অথবা উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেটের সমতুল্য। আর তা দিয়ে মাদ্রাসা সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত মুসলিমরা কলেজ বা উচ্চশিক্ষার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে অবলীলায় ভর্তি হতে পারছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মা আরও বলেছেন, তবে বেসরকারি মাদ্রাসা এবং স্কুলগুলি চলতে পারে। কিন্তু আমরা শীঘ্রই এক নতুন আইন আনব, যার দ্বারা এই সমস্ত বেসরকারি মাদ্রাসার কর্মকাণ্ডকেও একটি নিয়ন্ত্রণমূলক বোর্ডের অধীনে আনা যায়। 

জানা গেছে, এই জন্যই অসম সরকার মাদ্রাসা এবং সংস্কৃত টোলগুলির চরিত্র পালটে তাদের ‘সাধারণ স্কুলে’ পরিণত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মা আরও বলেছেন, অসমে ২০০০-এরও বেশি বেসরকারি খারেজি মাদ্রাসা রয়েছে। সেগুলির খরচ বহন করে মুসলিম সম্প্রদায়। তাদের ওপরও নজরদারি এবং কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। তিনি আরও বলেন, বিজেপি নিয়ন্ত্রিত অসমের রাজ্য সরকার খুবই ‘সেকুলার’। হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতে, এই উদ্যোগ এজন্য নেওয়া হয়েছে, যাতে ছেলেমেয়েরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। ছেলে বা মেয়ে কোন স্কুলে যাবে, কোন ব্যবস্থার অধীনে পড়াশোনা করবে, তা তাদের বাবা-মায়েরাই স্থির করে দেন। বিশ্বশর্মার মতে, ১৪ বছরের নীচে ছেলেমেয়েরা এইসব প্রতিষ্ঠানে যায় এবং তাদের বাবা-মায়েরাই সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা কোথায় ভর্তি হবে। কিন্তু আমি চাই না যে, একজনও ছাত্র সাধারণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হোক। ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিলে এটা হতে বাধ্য। হিমন্ত বিশ্বশর্মা আরও বলেন– আমরা এই খারেজি মাদ্রাসাগুলিকেও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসব। এই মাদ্রাসাগুলিকে বিভিন্ন তথ্য প্রদানের জন্য বাধ্য করা হবে এবং সাধারণ শিক্ষা আবশ্যিক করা হবে। তবে একইসঙ্গে তারা ধর্মীয় শিক্ষার পঠন-পাঠনও জারি রাখতে পারবে। 

হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই ঘোষণা বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যেমন---

ভারতীয় সংবিধানে রয়েছে, সংখ্যালঘুরা তাদের পছন্দমতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে চালাতে পারবে। আর সরকার এক্ষেত্রে আর্থিক অনুদান বন্ধ করতে পারবে না। 
হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন যে– ধর্মীয় শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয় করা যাবে না। যদি আমরা আরবি শিক্ষাকে সহায়তা করি– তবে আমাদের গীতা এবং বাইবেল শেখার ক্ষেত্রেও অনুদান ও অনুমতি দিতে হবে। 
হিমন্ত বিশ্বশর্মা সাফাই দেন, এই পদক্ষেপের দ্বারা কোনও বিশেষ ধর্মের বিরুদ্ধে নিশানা করা হচ্ছে বলে মনে করা উচিত নয়। কারণ আমরা একইসঙ্গে সংস্কৃত টোলও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর জবাবে অল অসম মাইনরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আমসু) বলেছে– মাদ্রাসাগুলি বন্ধ করে দেওয়ার এই ঘোষণা অন্য কিছু নয়। বরং বিজেপি সরকার মুসলিমদের হয়রান করার যে পরিকল্পনা নিয়েছে এবং সংবিধানে সংখ্যালঘুদের শিক্ষাসহ যেসব অধিকারের গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে, তা কেড়ে নেওয়ার জন্যই এই ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। 

আমসুর সভাপতি রেজাউল করিম সরকার আরও বলেছেন– ‘হিমন্ত বিশ্বশর্মা সংখ্যালঘুদের ওপর অন্যায় জুলুম ও হয়রানি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বারবার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এগুলির মধ্যে রয়েছে– এনআরসি সহ সংখ্যালঘুদের শিক্ষা– চাকরি এবং কর্মসংস্থানে বঞ্চিত করার জন্য পরিকল্পনামাফিক বেশকিছু প্রচেষ্টা। রেজাউল করিম আরও বলেন– এটা মুসলিমদের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র। মাদ্রাসাগুলি শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করে না। অন্যান্য বিষয়গুলিও মাদ্রাসাসমূহে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মতোই পড়ানো হয়। আরবি কেবলমাত্র একটি বিষয় হিসাবে হাই মাদ্রাসাগুলিতে রয়েছে। 
বর্তমানে অসমে ৭০৭টি মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে ৪২৩টি মাদ্রাসায় সরকার শিক্ষকদের বেতন প্রদান করে থাকে। বাকি ২৮৪টি মাদ্রাসা মাঝেমধ্যে সরকারি অনুদান এবং মিড-ডে মিল পেয়ে থাকে। এই মাদ্রাসাগুলিতে ইংরেজি– অহমিয়া ও আরবি ভাষা পড়ানো হয়। পড়ানো হয় গণিত– বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়। ভূগোল পড়ানো হয় না। তার কারণ সরকার ভূগোল পড়ানো বন্ধ করে সোশ্যাল সার্ভিস পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। 

উল্লেখ্য– এই মাদ্রাসাগুলির জন্য মুসলমানরাই জমি দিয়েছে এবং বিল্ডিং তৈরির খরচ বহন করেছে। সরকার এসব মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি। সেই ১৭৮০ সালে ব্রিটিশদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই মাদ্রাসাগুলি প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে ব্রিটিশ সরকার এই মাদ্রাসাগুলি ও টোলে অনুদানও প্রদান করত। একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাওলানা আবু নাসের মুহাম্মদ ওয়াহিদ ১৯১৫ সালে মাদ্রাসাগুলির শিক্ষার বিষয় ও পঠন-পাঠনের ব্যাপক সংস্কার করেন। আর সেজন্যই রেজাউল করিম সরকার প্রশ্ন তুলেছেন– যদি মাদ্রাসাগুলি কেবল ধর্ম ও আরবি শিক্ষাই দেবে– তা হলে কী করে এখানকার ছাত্রছাত্রীরা ডাক্তার– উকিল– ইঞ্জিনিয়ার ও সিভিল সার্ভিসে পাশ করছে? 

তবে অনেকে বলছেন– মাদ্রাসাগুলির বিলোপ সাধনের সিদ্ধান্তে মুসলিমদের এত শোরগোল করার প্রয়োজন নেই। কারণ একইসঙ্গে হিন্দুদের সংস্কৃত টোলও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এই ইস্যুতে নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদ ও মুসলিমরা বলছেন– টোল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি অজুহাত মাত্র। কারণ ধর্ম ও সংস্কৃত শিক্ষার পীঠস্থান হিসাবে এই টোলগুলি একসময় বড় ভূমিকা পালন করত। কিন্তু সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে টোল ও এই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পর্কে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের আগ্রহ কমে আসে। বর্তমানে এই টোলগুলিতে শিক্ষক থাকলেও ছাত্রের নিতান্তই অভাব। আর সরকার মাত্র ৯৭টি টোলের শিক্ষকদের বেতন প্রদান করে থাকে। এই টোলগুলিতেও ছাত্রের সংখ্যা আঙুলে গোনা যায়। অথচ মাদ্রাসাগুলিতে তা সে খারেজি হোক কিংবা হাই মাদ্রাসা– শত-শত ছাত্র পড়ার জন্য আবেদন করে থাকে। আর সংখ্যালঘুদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে মাদ্রাসাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। চর এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই মাদ্রাসাগুলিই শিক্ষা ও স্বাক্ষরতার পতাকাকে উড্ডীন রেখেছে। তাই হিমন্ত বিশ্বশর্মা মাদ্রাসাগুলি বন্ধের যে ঘোষণা দিয়েছেন তা হচ্ছে– বিজেপির হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডারই বহির্প্রকাশ। আর এই চক্রান্তের আরও একটি লক্ষ্য হচ্ছে– অসমের মুসলিম সমাজকে শিক্ষা ও চাকরিতে আরও পিছিয়ে দেওয়া। 

অসমের মুসলিম নেতারা বলেছেন, হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরকার যদি সরে না আসে, তবে তার সুবিচার চেয়ে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে যাবেন। আর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাঁরা আন্দোলন ও জনমত তৈরির কাজ করবেন। কিছুতেই হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিদ্বেষমূলক চক্রান্তকে তাঁরা সফল হতে দেবেন না। 






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only