মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২০

আল্লাহ্ নয়, কাবা শরীফে তাওয়াফ বন্ধ করে দিল সৌদি যুবরাজ


এ এইচ ইমরান

চিনের উহান থেকে প্রায় সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সবথেকে আতঙ্কের কারণ হচ্ছে– এর ভয়ংকর সংক্রমক শক্তি। চিন অবশ্য বলছে তাদের দেশ নয়। বরং আমেরিকাই হল এই ভাইরাসের জন্মক্ষেত্র। 

তবে সেই বিতর্ক দূরে থাক। করোনা নিয়ে সারাবিশ্বের মানুষই ভয়ের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু প্রাণভীতিতে সবথেকে আতঙ্কে রয়েছে মুসলিম রাষ্ট্রগুলির রাজা-বাদশাহরা। এদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে একমাত্র বোধহয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর আতঙ্কিত যে মুখের ছবি সারাবিশ্বে সম্প্রচারিত হয়েছে, তা দেখে দর্শকরা যদি কাঁদতে শুরু করে তবে তাদের খুব একটা দোষ দেওয়া যাবে না।

সকলেই জানেন, পবিত্র শহর মক্কার কাবা শরীফ হচ্ছে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র। মসজিদুল হারামাইন বা মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদ এখন সৌদি রাজবংশের কবলে রয়েছে। তাঁরা ইংরেজদের সহযোগিতায় ইসলামি দুনিয়ার উসমানীয় বা অটোমান খলিফাকে পরাজিত করে এই পবিত্র দুই শহরের উপর নিজেদের কবজা কায়েম করে। প্রথমে কিছু বছর তাঁরা মক্কা ও মদিনার প্রতি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শ্রদ্ধা পোষণ করলেও বর্তমানে তাঁরা মক্কা ও মদিনাকেও বাণিজ্যিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রবল উদ্যোগ নিয়েছে। আর এখন তা চরমে উঠেছে মুহাম্মদ বিন সালমান আল সাউদ-এর সময়। বৃদ্ধ পিতা সালমান বেঁচে থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা কিন্তু রয়েছে সিআইএ ও মোসাদ অনুগত যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের হাতে। তিনি ইসলামের সংস্কারের নামে সৌদি আরবে ডান্সবার, হালাল-বার, মেয়েদের হিজাবমুক্ত করা সহ বিনোদনের নামে যুবসমাজকে মার্কিন কালচার ও জীবনাচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সউদি আরবের সব শহরে আয়োজন করা হচ্ছে পশ্চিমা রক-গায়কদের কনসার্ট ইত্যাদি। প্রখ্যাত সউদি আলেমদের হয় কারাগারে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে নতুবা খাসোগির কায়দায় হত্যা করা হয়েছে, যাতে সউদি শাসকদের বিরুদ্ধে কেউ প্রশ্ন না তুলতে পারে।সেই সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের অশুভ নজর থেকে পবিত্র কাবা শরীফ-ও মুক্ত নয়।কারণ, করোনা ভাইরাসের খবর ছড়ানো মাত্র সউদির শাসকরা প্রথমেই আল্লাহর ঘর কাবার মসজিদে দু’দিনের জন্য নামায সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। একইসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় পবিত্র কাবার তাওয়াফ। কাবা শরীফের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। কাবা শরীফে এখন নামায হচ্ছে কিন্তু তা আদায় করছে ইমাম সহ ২০-২৫ জন নামাযী মাত্র। সালমান-ভীতি উপেক্ষা করে মাত্র দিনকয়েক আগে কাবা শরীফের বয়স্ক ইমাম হাতেগোনা কয়েকজন নামাযীকে নিয়ে সালাত আদায় করতে গিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। তখন তিনি তিলাওয়াত করছিলেন সূরা রহমান। কাবা শরীফে নামাযীদের এত আকাল হবে, ওই বয়স্ক ইমামের হয়তো তা কল্পনাতেও ছিল না। আর কাবার মূল চত্বর তাওয়াফকারী শূন্য দেখে সারা বিশ্ব-মুসলিমের প্রাণ কেঁদে উঠেছে।

মনে রাখতে হবে, যখন তাওয়াফ বন্ধ করা হয়, তখন ভ্যাটিকানেও গণপ্রার্থনা বন্ধ হয়নি। ঈমানদার মুসলিমরা বলছেন, করোনার সংক্রমণের সম্ভাবনা বন্ধ করা কোনও গুনাহ্ নয়। কিন্তু যদি কাবা শরীফে নামায ও তাওয়াফের মর্যাদা সউদি বাদশাহরা স্মরণে রাখতেন, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা করা যেত। যেমন, মক্কার নির্বাচিত হাজারখানেক অধিবাসীকে প্রতিদিন আধুনিক পরীক্ষার দ্বারা স্ক্রিন করা যেত। আর তারপরই তাঁদেরকে পালাক্রমে তাওয়াফের অনুমতি দেওয়া যেত। নামাযের ক্ষেত্রেও ওই একই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল।
এর মধ্যে আরেকটি চরম কাজ করেছে কুয়েতের বাদশাহ ও অন্য শাসকরা। তাঁরা সমস্ত মসজিদে নামায পড়া তো বন্ধ করেই দিয়েছে, আল্লাহর নবী সা.-এর সময় থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পর্যন্ত চলে আসা আযানেরও শব্দাবলি পরিবর্তন করে ফেলেছে। হযরত বেলাল রহ. নবী সা.-এর অনুমতি নিয়ে এই আযানের সূচনা করেছিলেন। একমাত্র কামাল আতাতুর্ক আযানকে আরবির পরিবর্তে তুর্কি ভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন। কিন্তু তিনিও আযানের অর্থের কোনও পরিবর্তন করতে সাহস করেননি। এখন কুয়েতের সব মসজিদে আযান হচ্ছে, কিন্তু যেখানে আযানে ছিল ‘নামাযের দিকে আসো’, সেখানে পরিবর্তন করে বলা হচ্ছে ‘আস-সালাতু-ফি-বুইউতিকুম’ অর্থাৎ ‘ঘরে বসেই নামায পড়ো’।

বড় বড় মুফতিরা বলছেন, আযানে এই ধরনের পরিবর্তন করার কোনও অধিকার শাসকদের নেই। তাঁরা ঘরে বসে নামায পড়ার ঘোষণার জন্য অনায়াসে অন্য কোনও ব্যবস্থা করতে পারতেন। কিন্তু এখন আরব-শাসকরাই ধর্মের নামে নিজেদের হুকুম জারি করার সাহস প্রদর্শন করছেন। তাঁদের আল্লাহর কোনও ভীতিই নেই। উল্লেখযোগ্য, ইসলাম বংশানুক্রমিক বাদশাহীকে সমর্থন করে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only