মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

আমেরিকা ভারতের পাশে দাঁড়ালে চাপে পড়বে চিন, চিনা মুখপত্রের ‘পরামর্শে’ই লুকিয়ে উদ্বেগ

নয়াদিল্লি,২৯ জুনঃ সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে ভারত-চিন দু’দেশের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে চিনের তরফে সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনে সম্মত হওয়ার কথা জনানো হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে কথায় আর কাজে কোনও মিলই নেই ড্রাগনের দেশের। বরং সীমান্তে আরও সেনা মোতায়েন করে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে তারা। চিনের এই দ্বিচারিতায় যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ভারত। একাধিক উপগ্রহ চিত্র থেকে যখন এটা স্পষ্ট, গালওয়ানে সংঘর্ষের ঘটনা চিনের পূর্বপরিকল্পিত, তারপরও এই ঘটনা নিয়ে নাগাড়ে ভারতকে নিশানা করে গিয়েছে চিন। সংঘর্ষের দায় জোর করে ভারতের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সোমবার আরও কয়েক কদম এগিয়ে সরাসরি ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে নাক গলাল তারা। বলা ভালো উপযাজক হয়েই ভারতকে ‘পরামর্শ’ দিল ড্রাগন বাহিনী। কি সেই পরামর্শ? 

এ দিন চিন সরকারের মুখপত্র ‘গ্লোবাল টাইমস’ লিখেছে, ভারত-চিন যুদ্ধ হলে আমেরিকা ভারতকে সাহায্য করবে বলে ভারত যেভাবে ‘নিজের মতো করে ভেবে নিচ্ছে’ তা নিরর্থক হবে। আসলে চিন ভারতকে এই ‘পরামর্শ’ই দিতে চাইছে যে, যুদ্ধ বাধলে আমেরিকার থেকে সাহায্য পাবে বলে ভারত যে আকাঙ্ক্ষা করছে, তা নিষ্ফল হবে। ভারতের এই আশা পূরণ হবে না। বলা বাহুল্য, চিনের এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হল--- আমেরিকা ভারতের পাশে দাঁড়ালে রক্তচাপ বাড়বে বেজিংয়ের। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, ভারত-চিন দ্বন্দ্ব নিয়ে আমেরিকা আগেই জানিয়ে ছিল, তারা মধ্যস্থতা করতে রাজি। তখন চিন পালটা বলেছিল, দু’দেশের (ভারত-চিন) দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষের নাক গলানোর প্রয়োজন নেই। আসলে চিন চায় না বিষয়টিতে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করুক। আসলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চিন-মার্কিন সম্পর্ক যে মধুর নয় তা সর্বজনবিদিত। 

সম্প্রতি পণ্য আমদানি-রফতানি নিয়ে এই দুই দেশের শুল্ক যুদ্ধ দেখেছে গোটা বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা আসরে নামলে ভারতেরই মাইলেজ পাওয়ার সম্ভাবনা। সেটা উপলব্ধি করেই চিন এই ধরনের মন্তব্য করে চলেছে। আসলে চিন চায় না ভারতের সঙ্গে তাদের সংঘাতে হস্তক্ষেপ করুক আমেরিকা। বেজিংয়ের এক সেনা বিশেষজ্ঞর উক্তি উল্লেখ তুলে ধরে একটি রিপোর্ট ছেপেছে ‘গ্লোবাল টাইমস’। সেখানে বলা হয়েছে, আমেরিকা বারবার ভারতকে সাহায্য করার কথা বলছে বলে এই ভেবে ভারতীয় মিলিটারি অফিসাররা ভারত-চিন সীমান্তে একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্মুখ সমরের প্রত্যাশা করছে। চিনা সেনাবাহিনীও সমস্ত প্রান্তে উচ্চ সামরিক প্রস্তুতি প্রদর্শন করছে। দক্ষিণ চিন সাগর– তাইওয়ান উপত্যকার নিকটবর্তী অঞ্চল ও ভারত-চিন সীমান্তে একযোগে যে নিবিড় সামরিক মহড়া চলছে তা থেকে স্পষ্ট ভারত মার্কিন সমর্থনের সুযোগ নিয়ে লাভবান হওয়ার যে ইচ্ছেমতো চিন্তাভাবনা করছে তা নিছকই একটি ভ্রম। ওই চিনা সেনা বিশেষজ্ঞর কথায়, ‘ভারত ইচ্ছামতো ভেবে নিয়েছে যে আমেরিকা তাদের সাহায্য করতে আসছে এবং সীমান্ত বিবাদে ভারতের পক্ষ নিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ চিন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীতে চিনা বাহিনীকে পরাস্ত করতে সাহায্য করবে। 

বেশিরভাগ ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় সেনা খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গত শুক্রবার গ্রাউন্ড জিরো (সীমান্ত সংঘাত স্থল) পরিদর্শন করার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে বর্ণনা দেওয়ার সময় এই দুই শীর্ষ নেতাকে সেনা প্রধান এম এম নারাভানে বলেন, ভারতীয় সেনা মনে করে চিনের সঙ্গে এই সীমান্ত দ্বন্দ্বপর্ব দীর্ঘমেয়াদি হবে। চিনা সেনাও সমস্ত দিক থেকে যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুতির তুঙ্গে রয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা সত্ত্বেও চিনা সেনা অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় ও প্রতিরোধ কৌশল জোরদার হওয়ায় বড় আকারের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমই রয়েছে।’ চিনা সেনা বিশেষজ্ঞর এই ধরনের মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, চিন কি এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে রয়েছে যে, তারা শক্তিশালী বলে যতই অনিয়ম চালিয়ে যাক না কেন কেউ তাদের উপর হামলা করার সাহস দেখাবে না। তবে আমেরিকা ভারতকে সমর্থন করলে চিন যে পুরোপুরি চাপে পড়ে যাবে তা স্পষ্ট হয়েছে। 

এ দিনই আবার ভারত মহাসাগরে ভারতীয় নৌসেনা ও জাপানের নৌসেনা ‘জাপানিজ মেরিটাইম সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্স’ (জেএমএসডিএফ) যৌথ মহড়া দিয়েছে। লাদাখে সীমান্ত নিয়ে ভারত-চিন বিবাদের মধ্যে এদিন এভাবে ভারত-জাপান যৌথ নৌসেনার মহড়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তাহলে চিনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ভারত কি জাপানকে পাশে পাচ্ছে? এই জল্পনাই শুরু হয়ে রাজনৈতিক মহলে।  

এ দিকে, সোমবারই আবার এক সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেল তাদের হাতে আসা নয়া একটি উপগ্রহ চিত্রের ভিত্তিতে দাবি করেছে, গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় ভূখণ্ডের ৪২৩ মিটার দখল করেছে চিন। ২৫ জুনের এই ছবিতে একটি বড় ছাউনি, ১৬টি তাঁবু, ত্রিপল ও ১৪টি সাঁজোয়া গাড়ি দেখা গিয়েছে। উল্লেখ্য, সোমবারই আবার কেন্দ্রীয় সরকার চিনা বিনিয়োগে বিহারে ২,৯০০ কোটি টাকার যে ব্রিজ প্রজেক্ট হওয়ার কথা ছিল তা বাতিল করেছে।  



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only