রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

ভারতের বৈদেশিক নীতি নিয়ে কথা

আহমদ হাসান ইমরান
চিন ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের বিষয়ে বিরোধী দলগুলির সঙ্গে ভিডিয়ো বৈঠকে সরকারের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক বিবৃতি দিয়েছেন। তবে বৈঠকের মধ্যেই সোনিয়া গান্ধি এবং পরবর্তীতে অন্যান্য দলগুলির নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট জানিয়েছেন, মোদির বক্তব্যে তাঁরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হননি। কিন্তু বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে এই সংঘাতে তাঁরা পুরোপুরি সরকারের পাশে আছেন।

বরাবরই দেখা গেছে পাকিস্তান অথবা চিন, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে লড়াই অথবা সংঘর্ষে বিরোধী দলগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষেত্রেও কংগ্রেস, তৃণমূলসহ বিরোধী দলগুলি একজোট হয়ে সরকারের সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে শুধু সংবাদপত্র নয়, বিরোধী দলগুলির নেতারাও প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারকে এক বিবৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্যের স্পষ্টিকরণও দিতে হয়েছে। 

বর্তমানে সার্কভুক্ত প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে ভারত খুব একটা সু-সম্পর্কের মধ্যে নেই। আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানের শত্রুতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। প্রতিবেশী দেশ নেপালের সঙ্গেও সীমান্ত নিয়ে বিরোধ এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। নেপাল তিনটি ভারতীয় এলাকাকে নিজের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মানচিত্রের নমুনা প্রকাশ্যে এনেছে। নেপালের পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে ওই দেশটির নতুন মানচিত্র অনুমোদন পেয়েছে। নেপালি সেনাদের গুলিতে একজন ভারতীয় নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। যে ভারতীয় নাগরিককে নেপাল আটক করেছিল পরে কথাবার্তার পর তাঁকে অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতকে উপেক্ষা করে নেপাল সরকার চিনের সঙ্গে বাণিজ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক  যোগাযোগ বৃদ্ধি করে চলেছে। সম্প্রতি নেপালের শিক্ষা দফতর ঘোষণা করেছে, নেপালি ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে চিনা ভাষা শিখতে হবে। 

এ দিকে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীও মাঝেমধ্যেই আমাদের মৎস্যজীবীদের ট্রলারসহ বন্দি করছে। এ ছাড়া আর্থিক ক্ষেত্রেও শ্রীলঙ্কায় চিন ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা রয়েছে। রয়েছে অন্যান্য সমস্যাও।

আর সম্প্রতি পাকিস্তানের সাহস এতটাই বেড়েছে সীমান্তের ওপার থেকে তাদের গুলিতে ভারতীয় নাগরিক ও সেনারা হতাহত হচ্ছেন। অন্যদিকে, জঙ্গি দলগুলি কাশ্মীরে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। এখন আর আমাদের অন্য কারও দিকে আঙুল তোলার সুযোগ নেই। কারণ, কাশ্মীর এূন পুরোপুরি একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ফলে কাশ্মীরের সীমান্ত কিংবা অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে শান্তি বজায় রাূার দায়িত্ব এককভাবেই পুরোপুরি মোদি সরকারের। 

এ ছাড়া আফগানিস্তানের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক এখনও যে সুস্থির তা বলা যাবে না। কারণ শীঘ্রই আফগানিস্তানের শাসনভার তালিবানদের উপরই বর্তাবে। আফগান মুজাহিদদা প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরে আমেরিকাকে পরাস্ত করেছে। যার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিও দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে তালিবানদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। অথচ ভারতের সঙ্গে এখনও তালিবানদের সু-সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। আফগানিস্তান সম্পর্কেও ভারতের বিদেশনীতি কঠিন বাস্তবকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না। ট্রাম্প প্রশাসনও ভারতকে তালিবানদের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছে।

শুধুমাত্র পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারত পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খানিকটা সফল। কাশ্মীর থেকে ৩৭০ বিলোপ এবং তাকে ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে পাকিস্তানের বিদেশনীতিকে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়া গেছে। এ ছাড়া পুলওয়ামায় বিস্ফোরণের ফলে ভারতের যে সৈন্যরা নিহত ও আহত হয়েছিল, সার্জিকাল স্ট্রাইকের মাধ্যমে ভারত সে বিষয়ে প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে গেছে। তাছাড়া ভারতের একজন বন্দি পাইলটকেও দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সবমিলিয়ে ভারতের বিদেশনীতি যে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে খুব একটা উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করছে এ কথা বলা যাবে না।

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, চিনকে সমঝে দেওয়ার জন্য সে দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যনীতিকে নতুন করে ঢেলে সাজানো উচিত। কিন্তু কিছু অর্থনীতিবিদ পরামর্শ দিচ্ছেন, এক্ষেত্রেও ভারতের লাভ-লোকসানের মূল্যায়ন করতে হবে বাস্তবের ভিত্তিতে।

তবে সবমিলিয়ে বলা যায়, সামরিক শক্তি জোরদার করার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ সংহতি, বৈদেশিক ও বাণিজ্য নীতিকেও নতুন করে বিচার করতে হবে। এইসব মিলিয়েই কিন্তু একটি দেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর সার্বিকভাবে শক্তিশালী কোনও দেশকে কেউই ঘাঁটাতে চায় না। ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কথাটি সম্পূর্ণভাবে প্রযোজ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only