রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

চিনের মোকাবিলায় সীমান্তে ‘আকাশ’ নিয়ে গেল বায়ুসেনা

ইকবাল আলম
কথা দিয়েও কথা রাখেনি চিন। সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে সম্মতির কথা জানিয়েছিল ড্রাগনের দেশ। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা দেখা যায়নি। বরং একাধিক হাই রেজ্যুলিউশন উপগ্রহ চিত্রে চিনের কথা খিলাফের কার্যকলাপই প্রমাণিত হয়েছে। পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে সংঘর্ষস্থল থেকে চিনা সেনা কিছুটা পিছিয়ে গেলেও দৌলাত বেগ ওল্ডি, ডেপসাং প্রভৃতি অঞ্চলে সেনা মোতায়েন রেখেছে চিন। এর মধ্যেই আবার শনিবার খবর আসে গালওয়ান উপত্যকার পেট্রোলিং পয়েন্ট ১৪ (পিপি-১৪) ফের দখল করেছে চিনা সেনা। এভাবে ভারতীয় এলাকা দখল করায় চিনের উপর বেজায় চটেছে নয়াদিল্লি।

 সূত্রের খবর, চিনা সেনা এভাবে পিপি-১৪ দখল করে রাখায় অন্যান্য পেট্রোলিং পয়েন্টে টহলদারিতে সমস্যা হচ্ছে ভারতীয় সেনার। একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী, পিপি-১৪ এলাকায় চিনা ছাউনির অস্তিত্ব উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়েছে। এমনকী এই সম্পর্কে রিপোর্টও করে ভারতীয় সেনা। অভিযোগ, পিপি-১৪’তে চিনা উপস্থিতির কারণে পিপি-১০, পিপি-১১, পিপি-১২ ও পিপি ১৩’য় টহলদারিতে বাধা পাচ্ছে ভারতীয় সামরিক বাহিনী। একটি সূত্র উল্লেখ করে ওই ইংরেজি দৈনিকটি দাবি করেছে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র সহ চিনা সেনাকে সক্রিয় অবস্থায় দেখা গিয়েছে। আর তার পিছনে আরও বড় চিনা সেনা সম্ভার নজরে এসেছে। ফলে তলে তলে চিনও যে প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে তা স্পষ্ট। 

পাশাপশি, গালওয়ান, প্যাংগং, ডেপসাং নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ভারতের তরফে। ডেপসাং এলাকার একটি অংশে চিনা অনুপ্রবেশ হয়েছে বলে দাবি করতে শুরু করেছে বিরোধীরা। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার চিনকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ভারত। চিনে অবস্থিত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিক্রম মিসরি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে জানান, লাদাখে স্থিতাবস্থা নষ্টের চেষ্টা হলে তার ফল ভুগতে হবে চিনকে। ভারতীয় বাহিনীর স্বাভাবিক টহলদারিতে বাধা দেওয়া বন্ধ হলে তবেই সীমান্ত সংঘাত বন্ধ হবে।  

উল্লেখ্য, ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় চিনা সেনা কাঠামো তৈরির চেষ্টা করলে তাতে বাধা দেয় ভারতীয় জওয়ানরা। দু’পক্ষের মধ্যে রক্তাক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। তখনকার মতো চিনা সেনা পিছু হটলেও ১০ দিন পর ফের একই এলাকায় হাজির ড্রাগন বাহিনী। শুধু তাই নয়, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর চিনের যুদ্ধ বিমান, কপ্টারকে চক্কর কাটতে দেখা গিয়েছে। চিনের এই কার্যকলাপের পালটা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে কেন্দ্রও। রীতিমতো যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ভারতীয় সেনা। চিনকে রুখতে ইতিমধ্যে সীমান্তে হাজির স্থল ও বায়ুসেনা। ১২ হাজার ভারতীয় সেনা ডিপিও ও ডেপসাং অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। শত্রুশিবিরে নিখুঁত আঘাত হানতে পারদর্শী ক্ষেপণাস্ত্র ‘আকাশ’ নিয়ে সীমান্তে চলে গিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। ফলে সীমান্তে এখন থেকেই যেন কার্যত রণডঙ্কা বেজে গিয়েছে। 

গত কয়েকদিন ধরে চিন যুদ্ধ বিমান সুখোই-৩০ সহ অন্যান্য বোমারু বিমান নিয়ে সীমান্তে চক্কর কেটেছে। ভারতীয় সীমান্তের কাছে এই চিনা কার্যকলাপ নজরে এসেছে। ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে চিনকে আকাশে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা গিয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন এলাকায় ভারতীয় সীমান্তের খুব কাছে উড়তে দেখা গিয়েছে চিনা চপারকে। দৌলাত বাগ ওল্ডি, গালওয়ান উপত্যকার পিপি-১৪, পিপি-১৫, পিপি-১৭ ও পিপি ১৭-এ এলাকায় নিয়মিত উড়তে দেখা গিয়েছে এইসব চিনা চপারকে। হাতগুটিয়ে বসে নেই ভারতও। চিনকে যোগ্য জবাব দিতে শনিবার ক্ষেপণাস্ত্র ‘আকাশ’ নিয়ে সীমান্তে পাড়ি দিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শত্রু যুদ্ধ বিমান, ড্রোন ধ্বংস করতে পারে এই ‘আকাশ’। এ ছাড়াও সীমান্তে আগে থেকেই সুখোই-৩০ এমকেআই, মিরাজ ২০০০ ও জায়গুয়ার যুদ্ধ বিমান হাজির করে রেখেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। লাদাখের কাছে রাখা হয়েছে একাধিক আমেরিকান অ্যাপাচে অ্যাটাক কপ্টার। লেহ এয়ারবেসে প্রস্তুত রাখা হয়েছে চিনুক কপ্টার। লাদাখে বাহিনী ও যুদ্ধ সরঞ্জাম বহনের জন্য কাজে লাগানো হচ্ছে এমআই-১৭৪৫ মিডিয়াম লিফ্ট চপার। 

সীমান্তে এই যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে জারি রয়েছে রাজনৈতিক তরজাও। এ দিন এনসিপি সুপ্রিমো শরদ পাওয়ার কংগ্রেস সহ বিরোধীদের সমালোচনা করে বলেন, সেই ১৯৬২ সালের যুদ্ধ পরবর্তী ক্ষেত্রে চিন ভারতের ৪৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছিল। বর্তমানে লাদাখ পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। এটা কখনও কেন্দ্রের মোদি সরকারের ব্যর্থতা নয়। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়। যদিও কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা কপিল সিব্বাল এ দিন প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেছেন, এভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করার জন্য কেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রকাশ্যে চিনের সমালোচনা করছেন না? আমি চাই, প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে চিনের নিন্দা করুন। সেক্ষেত্রে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করব। অথচ এখন এমনই পরিস্থিতি যে, ‘চিন ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেনি’ বলে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটাকেই এখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছে চিন।’ 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only