শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

মুসলিম বিদ্বেষে ভরা ইতিহাস! ১৮ দেশের ৩২৯ ইসলামি স্থাপনাই চার্চে রূপান্তরিত


স্পেনের কর্ডোভা মসজিদ। এখন ক্যাথেড্রাল

স্পেনের কর্ডোভায় শিল্প ও নির্মাণ কৌশলে মুসলিমদের গর্ব হিসাবে পরিচিত একটি মসজিদকে চার্চে পরিণত করা হয়। তবে চার্চটিকে এখনও ‘গ্রেট মস্ক চার্চ’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়। অথচ এটিই ছিল কর্ডোভার জামে মসজিদ। খ্রিষ্টানরা স্পেন দখল করলে লক্ষ লক্ষ মুসলিমকে হত্যা এবং বিতাড়িত করা হয়। 

বিশেষ প্রতিবেদনঃ তুরস্কের ইস্তান্বুুলে অবস্থিত শতাধী প্রাচীন এই স্থাপনা নিয়ে সমালোচনার সব ঝড় যেন একটি দেশের দিকেই বয়ে চলেছে। অথচ সমালোচক ও নিন্দুকরা তাদের নিজ নিজ দেশের ইতিহাসটাই জানেন না। পশ্চিমা বিশ্বের উগ্র মুসলিম বিদ্বেষীরা আসলে এদের মগজে এতটাই বিষ ঢেলে দিয়েছে যে, তারা কিছু ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে উগ্রতা বুলি আওড়ে চলেছে দশকের পর দশক।

গ্রিসের ইব্রাহিম পাশা মসজিদ। এখন চার্চ।
আসলে সব খানেই শিক্ষার অন্ধকার কথাটা বলা যায় না, শিক্ষিত হয়েও কেউ যদি কট্টরপন্থী ও বর্ণবিদ্বেষী তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তখন মানবিকতার মানদণ্ড লঙ্ঘিত হয়। গোটা বিশ্বে আজ একই অবস্থা। কোথাও না কোথাও কোনও না কোনওভাবে এক দেশ প্রতিবেশী দেশকে হয়রানি করছে। এর মধ্যে অবশ্যই ধর্মের বিষয়টি উঠে আসে। কোভিড-১৯ ঠেকানো নিয়ে সেদেশের সরকারের যত না উদ্যোগ তার চেয়ে বেশি মাথাব্যথ্যা আয়া সোফিয়া নিয়ে! একদা চার্চ, মসজিদ ও মিউজিয়াম হাজিয়া সোফিয়া বা আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদ বানিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। এতে ভুল কোথায়? ইসলামি দেশ চলবে ইসলামের পথেই। তুর্কি প্রেসিডেন্ট তো ভিন ধর্মকে অবমাননা করেননি। 

স্পেনের টলেডো উমাইয়াদ মসজিদ, এখন চার্চ 
তিনি আয়া সোফিয়া মসজিদে থাকা খ্রিস্টধর্মের প্রতীকগুলিও ধ্বংস করেননি, বরং ঢেকে রেখেছেন সম্মানের সঙ্গেই। কিন্তু ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইটকে কেন মসিজদ বানাবেন এরদোগান? এরদোগান যদিও এর জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করছেন না। কারণ তাঁর মধ্যে মানবতাবোধ যথেষ্টই রয়েছে। তিনি জানেন অটোমান সাম্রাজ্যের গৌরবময় ইতিহাস। উসমানীয় শাসকদের কীর্তিকলা ও শৈল্পিক মননের ছাপ আজও ছড়িয়ে রয়েছে প্রতিবেশি দেশগুলোতে। দুঃখের বিষয় হল, ১৮ দেশের ৩২৯টি স্থাপনাই আজ চার্চ বা বেল টাওয়ারে পরিণত। এবার কোথায় যাবে পশ্চিমা মিডিয়া? কী বলবেন, এরদোগান বিদ্বেষী রাজনীতিবিদরা? কী বলবে ইউনেস্কো, রাষ্ট্রসংঘ ও ইউরোপ? এবার নিশ্চই এরা মুসলিম সাম্রাজ্য পক্ষে কথা বলবেন? আর তা যদি না বলেন, তাহলে তো তাদের বর্ণবিদ্বেষী বলতেই হয়। 

স্পেনের জাইন মসজিদ , এখন ক্যাথেড্রাল
অটোমান স্থাপনা নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করেন মেহমেত এমিন ইলমাজ। বিগত ১০ বছর ধরেই বিভিন্ন অটোমান মসজিদ ও ইসলামি স্থাপনার শিকড় সন্ধান করতে গিয়ে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, যেগুলো একদা মুসলিমদের ইবাদাতগাহ ছিল সেগুলো এখন বেল টাওয়ার বা চার্চ। বলকান দেশগুলোতেই প্রথমত নিজের গবেষণা ও খোঁজখবর শুরু করেন ইলমাজ। বলেন, হাঙ্গেরি– বুলগেরিয়া ও গ্রিসেই সবচেয়ে বেশি মসজিদকে চার্চ বানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে অন্তত ৩২৯টি অটোমান স্থাপনা চার্চে রূপান্তরিত হয়েছে।

এগুলো হয়েছে আলজেরিয়া, ইউক্রেন, ক্রিমিয়া, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, সাইপ্রাস,ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, ম্যাসিডোনিয়া, মলডোভা,রোমানিয়া, সার্বিয়া ও তুরস্কের মতো ১৮টি দেশে। তাঁর দাবি, বুলগেরিয়ায় ১১৭টি মসজিদ,একটি মাদ্রাসা ও সাতটি ইসলামি স্থাপনাকে চার্চ বানানো হয়েছে। 

স্পেনের মুর্শিয়া মসজিদ। এখন ক্যাথেড্রাল
ক্রোয়েশিয়ায় আটটি মসজিদ, ক্রিমিয়ায় ৬টি মসজিদ, কসোভাতে একটি মসজিদ ও ক্লক টাওয়ারকে চার্চের রূপ দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনেও দু’টি মসজিদকে চার্চ ও একটি মিনারকে বেল টাওয়ার করা হয়েছে। সার্বিয়ার ১৫টি মসজিদ ও দু’টি মাজারকে চার্চে রূপান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিদেশি শক্তির হামলায় নানান সময়ে ইসলামি পুরাকীর্তির ওপর কোপ পড়েছে। তাহলে প্রশ্ন তো উঠতেই পারে,আয়া সোফিয়ার সঙ্গে যা হল তাতে ভুল কোথায়? তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান তো ভুল কিছু করেননি। 

তিনি দেশের নয়া প্রজন্মকে ইসলমি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছেন। ইহুদি ও পশ্চিমাবান্ধব সাবেক তুর্কি প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্কের অপরাধ ও ইসলাম অবমাননার প্রায়শ্চিত্য করে মুসলিমদেরকে ইনসাফ পাইয়ে দিয়েছেন এরদোগান। তুরস্কের ইতিহাস-ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখতে আয়া সোফিয়াকে মসজিদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াটা যে আবশ্যক তা উপলব্ধি করেছেন বর্তমান তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তবুও পশ্চিমা ও মুসলিম বিদ্বেষীদের গাত্রদাহ হচ্ছে। অথচ সমালোচকরা বলকান অঞ্চলের দিকে নজর ঘোরাতে নারাজ। 

কারণ, বলকানে মুসলিম বিদ্বেষের এমন এক নির্মম বাস্তবতা ধরা পড়বে, যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না। অতীতে সেসব দেশে চলেছে মুসলিম নিধন– অসংখ্য মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে,অটোমান পতাকা পুড়িয়ে দিয়ে ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো তাদের শক্তি জাহির করেছে। ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির যাবতীয় নিদর্শন তারা মুছে দিতে চেয়েছিল। তাই শয়ে শয়ে মসজিদের ভোল বদলে চার্চ বানানো হয়েছিল সেসময়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only