শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

৮৬ বছর পর ফের আয়া সোফিয়ায় আযান-সহ জুম্মার নামায অনুষ্ঠিত হল

আহমদ হাসান ইমরান
শুক্রবার শুধু তুরস্ক নয়, বিশ্ব মুসলিমের কাছে ছিল একটি ঐতিহাসিক দিন। ৮৬ বছর পর ঐতিহ্যবাহী আয়া সোফিয়ার ৪টি মিনার থেকে একই সঙ্গে শোনা গেল আযানের ধ্বনি। ৩ লক্ষ ৫০ হাজার মুসল্লিকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোগান জুম্মার নামায আদায় করলেন আয়া সোফিয়া মসজিদে। এই বিখ্যাত মসজিদে জুম্মার নামাযের আগে সূরা ফাতেহা এবং সূরা বাকারার কিছু অংশ তিলাওয়াত করলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। 

এই প্রখ্যাত মসজিদে পুনরায় জুম্মার নামায আদায়ের প্রথম দিনটিতে শরিক হওয়ার জন্য শুধু ইস্তান্বুল বা আশপাশের এলাকা নয়, তুরস্কের দূর-দূরান্ত থেকে তুরস্কের নাগরিকরা হাজির হয়েছিলেন আয়া সোফিয়ার মসজিদের কাছে। সারারাত তাঁরা ক্যাম্প করে সেখানেই অবস্থান করেন, যাতে জুম্মার নামাযে তাঁরা শরিক হতে পারেন। ২৪ জুলাই এই হাজার হাজার পুরুষ ও মহিলা, তরুণ ও বৃদ্ধ অপেক্ষায় ছিলেন কখন আয়া সোফিয়ার মিনার থেকে গুঞ্জরিত হবে মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠে আযান ধ্বনি। 
আযানের পরেই দেখা গেল সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য। বেশ কয়েকটি ‘সিকিউরিটি গেট’ পেরিয়ে মুসল্লিরা মসজিদের ভেতর এবং মসজিদের আশপাশের সমস্ত জায়গা জুড়ে জুম্মার নামায আদায় করার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ অল্প একটু স্থান হাসিল করার চেষ্টায় নিয়োজিত হলেন। ইতিমধ্যে মুসল্লিরা দু’একটি জায়গায় পুলিশের কড়া বেষ্টনী ভেঙে এগিয়ে গেছেন। কিন্তু তেমন কোনও বিশৃঙ্খলা হয়নি। ইস্তান্বুলের গভর্নর আলি ইয়েরলিকায়াকে ঘোষণা করতে হল, আয়া সোফিয়া মসজিদ ও মসজিদের বাইরে প্রতিটি ইঞ্চি মুসল্লিতে ভরে গেছে। আর কাউকে এই বিশাল চত্বরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া করোনা ভাইরাসের জন্য মুসল্লিদের দূরত্বও বজায় রাখতে হবে। তিনি টু্ইট করে বেশ কিছু অপেক্ষারত কয়েক লাখ মুসল্লিকে আশ্বস্ত করেন, আপনারা সবর বজায় রাখুন। আর আয়া সোফিয়া মসজিদকে শনিবার ফজর পর্যন্ত বিভিন্ন ওয়াক্তের জন্য নামায আদায় করার জন্য খোলা রাখা হবে। আপনারা যাঁরা এসেছেন তাঁরা অবশ্যই এই ঐতিহাসিক মসজিদে নামায পড়ার সুযোগ পাবেন।
জুম্মার নামাযের সময় দেখা গেল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সেখানে নামাযের জন্য উপস্থিত প্রত্যেক নারী-পুরুষেরই চোখে পানি। বেশ কিছু বিরাট স্ক্রিনে নামাযের দৃশ্য বাইরে সমবেত মুসল্লিদের জন্য সম্প্রচারিত হচ্ছিল। এরদোগানের সঙ্গে তুরস্ক ও বিভিন্ন দেশের কয়েক শত আমন্ত্রিত মেহমানও নামায আদায় করলেন আয়া সোফিয়াতে।  জুম্মার নামাযের আগে ও পরে সমবেত ধর্মপ্রাণ নারী-পুরুষের ধ্বনি দিলেন আল্লাহু আকবর (ঈশ্বরই সর্বশ্রেষ্ঠ)। জনতার অনেকের হাতে ছিল তুরস্কের চাঁদ-তারা সম্বলিত লাল পতাকা এবং অটোমান খিলাফতের পতাকা। আয়া সোফিয়ার ভিতরে পর্দা দিয়ে খ্রিস্টান অনুষঙ্গের মোজাইক এবং মেরি ও যিশুর আঁকা মূর্তিগুলো ঢেকে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে এই ঐতিহাসিক মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্তের নামায অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হল। কর্তৃপক্ষ মহিলা ও পুরুষদের জন্য মসজিদের ভিতরে এবং বাইরের চারপাশে ওই বিশাল স্কোয়ারে  কাবামুখি আলাদা আলাদা জায়গা বরাদ্দ করেছিলেন। সাইত কোলাক বলে একজন মুসল্লি আল-জাজিরার সাংবাদিককে বলেন, আমাদের ৮৬ বছরের আকাঙ্ক্ষা আজ পূর্ণ হল। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইলেন, তাঁরা সামরিক স্বৈরশাসক কামাল আতাতুর্কের নির্দেশে ১৯৩৫ সাল থেকে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে নামায আদায় করতে পারেননি। কারণ, কামাল তাঁর এক আদেশে এই মসজিদটিকে মিউজিয়াম বা জাদুঘরে পরিণত করেছিলেন। ওই মুসল্লি আরও বলেন, আমাদের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং আদালতকে ধন্যবাদ যে, আমরা আজ এতদিন পরে আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে নামায আদায় করতে পারলাম। 

একজন মহিলা মুসল্লি আইনুর সাতসি বলেন, আমি পূর্বাঞ্চলের শহর ইরজুরামে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু যখনই শুনলাম শুক্রবার আয়া সোফিয়া মসজিদে নামায পড়তে পারব, আমি ছুটি বাতিল করে এখানে হাজির হয়েছি।

জুম্মার নামাযে হাজির হয়েছিলেন তুরস্কের সমস্ত ক্ষেত্রের শ্রেণি নির্বিশেষে নাগরিকরা। প্রত্যেক মুসল্লির সঙ্গে ছিল জায়নামায এবং মুখে মাস্ক। এই আয়া সোফিয়া মসজিদের জন্য তুরস্কের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ তিনজন ইমাম ও চারজন মুয়াজ্জিন নিয়োগ করেছেন। তবে জুম্মা নামাযের ইমামতি করেন আলি এরবাস। তিনি তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক ডাইরেক্টরেট (দিইয়ানেত-এর প্রধান)। তরস্কের অটোমান খলিফা ও সুলতানদের সময় থেকে শুধুই ইমামরা নন, ইসলাম বিষয়ক ধর্মীয় পণ্ডিত ও ঈমানদার বুদ্ধিজীবীরা নামাযের ইমামতি করতে পারেন। এক্ষেত্রে এরদোগান খলিফাদের ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করলেন। তিনি খুৎবায় বলেন, আয়া সোফিয়া হচ্ছে আমাদের বিজয় এবং ফাতিহ-র উপর আমাদের বিশ্বাসের প্রতীক। 

উল্লেখ্য, সুলতান মেহমেতই ইস্তান্বুল জয় করেছিলেন। এরবাস আরও বলেছেন, আজ বড় পবিত্র দিন। আমরা সকলে মিলে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছি। আজ আয়া সোফিয়া মসজিদ জামাতে নামায আদায় করার ক্ষমতা ফিরে পেল। আজ হচ্ছে পবিত্র যিলহজ্ব মাসের তৃতীয় দিন। এই মাসেই হজ ও ঈদ-উল-আযহা পালিত হয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহরই সমস্ত প্রশংসা। আজ হচ্ছে সেই দিনগুলির অন্যতম যখন যিলহজ্ব মাসে যখন আমরা তকবির, নামায ও দরুদ আদায় করব। আজ হচ্ছে সেই দিনের মতো, যখন ১৬টি মিনার থেকে একসঙ্গে আযানের ধ্বনি আকাশ-বাতাস পূর্ণ করে তুলত। তিনি আরও বলেন, আয়া সোফিয়া ১৫০০ বছর ধরে খাড়া রয়েছে। এটি হচ্ছে সেই ভূমি যা ছিল বিজ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ইবাদতের জন্য প্রখ্যাত। তিনি আরও বলেছেন, সুলতান মেহমেত যিনি ইস্তাম্বুল জয় করেছিলেন, তিনি ক্রয় করে এই স্থাপত্যকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্বাসীদের ইবাদতের জন্য প্রদান করেন। আয়া সোফিয়া হচ্ছে এমন একটি জায়গা যা ইসলামের বিপুল শান্তি ও দয়াকে  কেয়ামত পর্যন্ত সাক্ষ্য দেবে। ইস্তান্বুল বিজয় করে সুলতান মেহমেত ফতিহ বলেছিলেন, নগরের যে অধিবাসীরা আয়া সোফিয়ায় আশ্রয় নেবে তারা নিরাপদ থাকবে। 

আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর থেকে ফের মসজিদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ায় পোপ থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন পাশ্চাত্য দেশ যেমন রাশিয়া, গ্রিস, আমেরিকা এবং ইউনেস্কো প্রতিবাদ জানিয়েছে। আয়া সোফিয়া যদি কামাল আতার্তুক যদি চার্চে পরিণত করতেন, তাহলে না হয় চার্চকে মসজিদ করলে পাশ্চাত্যের আপত্তির একটা কারণ বোঝা যেত। কিন্তু একটি জাদুঘরকে মসজিদ করে তার পূর্ণ মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ায় তাদের কেন আপত্তি, তা কিন্তু ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অর্থাৎ যাই হোক না কেন আয়া সোফিয়াকে কোনওমতেই মসজিদ করা যাবে না, সেটি জাদুঘর হিসেবে থাকলেই তারা খুশি। এই যুক্তিটি কিন্তু খুব বেশি গ্রহণযোগ্য নয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only