সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০

রেলের চাকার সাথে হকারদের জীবন ও থমকে গেছে

‘লাস্ট টাইম কম দামে বিক্রি করে দিচ্ছি, বর্ষা এসে গেল পেট পরিষ্কার করুন, ট্রেনে বলেই এতো সস্তায় পাচ্ছেন, বাজারে গেলে হাত পুড়ে যাবে, আর মাত্র দুই জন পাবেন’--- এই ধরনের বিভিন্ন কথা যারা আমরা ট্রেনে গেছি বা যাই শুনতে পাই। কিছু উক্তি আমাদের মুখস্ত হয়ে যায়। সেই সব কথা মনে পড়ে আমাদের। যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, হকাররা যেন খুব কাছের আপনজন হয়ে ওঠেন। সেই সব হকার বন্ধুদের আজ বহুদিন হল জীবন যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। যাদের হকারি ছাড়াও কিছু ইনকাম ছিল তারা হয়ত বেঁচে গেছেন। কিন্তু বাকিরা? যাদের ট্রেনের চাকায় ছিল জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা তারা আজ কেমন কাটাচ্ছেন জীবন? কিভাবে চলছে তাদের সংসার? কিভাবে তারা দিচ্ছেন বাচ্চাদের স্কুলের ফি? জানি না আমরা অনেকেই। খোঁজ রাখাও আর হয়ে ওঠে না।

একদিন বাজারে পেছন থেকে কেউ পিঠে হাত দিয়ে ডাকতে শোনা গেল। মুখে মাস্ক ছিল, তাই চিনতে একটু সময় লাগল। চিনতে পারলাম। হাওড়া-বর্ধমান কড লাইনে ঝাল মুড়ি বিক্রি করেন। বাড়ি ফেরার পথে নিয়মিত কাস্টমার ছিলাম আমরা কজন। ওনার বাবা আগে মুড়ি বিক্রি করতেন। ট্রেনের চাকায় একদিন পা পিছলে পড়ে গিয়ে জীবন চলে গেছে। তারপর উনি এই কাজ করেন। রোজ জীবনে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। কোনও উপায় নেই। এই করেই পাঁচটা পেট চলে। 

রেশনের চাল শুধু পেলে তো হবে না, বাকি অনেক খরচ তো আছে! তাই দুঃখ করছিলেন, স্যার এবার না খেতে পেয়ে মরতে হবে। কিভাবে চলবে বুঝতে পারছি না। ওনার এক বন্ধুর কথা বললেন। লকডাউন-এর মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন। সুশান্ত সিং-এর মতো সেলেব নয়, তাই আমরা খবর পাইনি। ওনার মতো হাজার হাজার হকার আজ রোজকারহীন অবস্থায় পড়ে আছেন। প্রথম দিকে অনেক স্বেছাসেবী সংস্থা খাবার, সাবান, মাস্ক দিয়ে গেছে। কিন্তু সেগুলি কত দিন চলবে? আবার শোনা যাচ্ছে প্যাসেঞ্জার ট্রেন বেসরকারি হাতে গেলে প্রায় ষাট হাজার হকার কাজ হারাবে। একেই তো কাজ নেই মানুষের, তার ওপর পরিযায়ী শ্রমিকরা দেশে ফেরায় কাজের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে গেছে।

মানুষ আজ টাকার জন্য যে কোনও কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আজ চার মাস ধরে হকারদের কিভাবে চলছে আমরা জানি না। হকারদের মতো আরও সাধারণ মানুষ যারা কাজ হারিয়েছেন তাদের কিভাবে সংসার চলছে আমাদের হয়ত অনেকেরই কোনও ধারণা নেই।

জানি না আবার কবে ট্রেনের চাকা ঘুরবে, কবে স্বাভাবিক হবে সব কিছু? কবে আবার সেই চেনা পরিচিত ডাকগুলি শুনতে পাবো--- আগে খান পড়ে বাড়ির জন্য নিয়ে যান, বাড়িতে তৈরি করি গাড়িতে বিক্রি করি ইত্যাদি।

আনিসুল হক
নজরুল পল্লী,পুর্ব বর্ধমান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only