বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০

বাংলা চালাবে বাংলার মানুষরা, বহিরাগতরা নয়


ডেরেক ও’ব্রায়েন 

তৃণমূল দলের ইতিহাসে ২১ জুলাইয়ের আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আবেগ। ১৯৯৩ সালের এই দিনে তৎকালীন যুব কংগ্রেসের সভাপতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ মিছিল করেছিলেন কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে। আন্দোলনকারীদের উপর নির্মম লাঠিচার্জ করে পুলিশ। প্রতিবাদকারী নির্দোষ তরুণদের যাদের চোখে ছিল আদর্শের স্বপ্ন,পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। স্বয়ং মমতা ব্যানার্জিকেও সেদিন পুলিশ ব্যাপক মারধর করে।

২১ জুলাই, ১৯৯৩ সাল দিনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে মমতা ব্যানার্জির জীবনে। দু’টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর সংঘাত চরমে ওঠে এই ২১ জুলাই। একদিকে বাংলার কর্তৃত্ববাদী সিপিআই (এম) রেজিম– অপরদিকে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অন্তর্ঘাত। সেই দুঃসময়ে,একা দাঁড়িয়েছিলেন দিদি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলি রাজ্যের সমস্ত শক্তি লেলিয়ে দিয়েছিল তাঁর ওপর। নিজের দলও তাঁকে বহিষ্কার করে। তারা মনে করেছিল যে, দিদি স্নায়ুযুদ্ধে হেরে যাবেন। এই দিনেই তৃণমূল দলের স্বপ্ন বপন করা হয়েছিল। যদিও আরও কয়েক বছর পর আত্মপ্রকাশ করে তৃণমূল কংগ্রেস। 

১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর তাঁর সরে আসা আগের দল থেকে। ‘মাই আনফরগেটেবল মেমোরিজ’ নামে স্মৃতিকথায় মমতা ব্যানার্জি পরে লিখেছিলেন, ‘‘খবর এল যে কংগ্রেস আমাকে ছ’বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কার করেছে। আমি বিস্মিত হয়েছিলাম কিন্তু ভেঙে পড়িনি। আমি জানতাম, যদি আমি ভেঙে পড়ি তাহলে আমার সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে পড়বে।’’ ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ঘোষণা করা হয়। 

অনেকেই সেদিন এই নতুন দলের মৃতু্য পরোয়ানা লিখে দিয়েছিল। কংগ্রেসের ইতিহাসে দেখা যায়– বহুবার তাদের দলে ভাঙন ধরেছে কিন্তু দল থেকে বেরিয়ে এসে খুব কম জনই নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করতে পেরেছে। বাংলাতেই শুধু পাঁচবার ভাগ হয়েছে কংগ্রেস। অনেকে নিজের মতো দল গড়তে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। যেমন অজয় মুখার্জি (বাংলা কংগ্রেস– ১৯৬৭)– প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি (কংগ্রেস সমাজবাদী– ১৯৭৯)– এমনকী প্রণব মুখার্জিও। তিনি গড়েছিলেন রাষ্টÉীয় সমাজবাদী কংগ্রেস ১৯৮৬ সালে। রাজনৈতিক অস্তিত্ব রûক্ষার জন্য এঁদের প্রায় সকলেই আবার কংগ্রেসে ফিরে গিয়েছিলেন। 
কিন্তু মমতা ব্যানার্জি ব্যতিক্রমী। তিনি সকলের চেয়ে আলাদা। নিজের দল প্রতিষ্ঠার সময় তিনি বলেছিলেন– ‘আমি একজন যোদ্ধা। লড়াই থেকে আমি কখনও পিছু হটিনি। আমরা খোলা মনে সবাইকে ভালোবাসি। মা-মাটি-মানুষের আশীর্বাদ নিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি।’ এই মানসিক দৃঢ়তা ও জেদ নিয়ে তিনি আজও এগিয়ে চলেছেন। 

যে কংগ্রেস মমতা ব্যানার্জিকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল, সেই কংগ্রেসের ধীরে ধীরে পতন হতে শুরু করল। আর একমেবাদ্বিতীয়ম জননেত্রী হিসাবে উত্থান হল মমতা ব্যানার্জির। সিপিআই (এম)-এর সঙ্গে লড়াইটা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু হেরে গিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া দিদির চরিত্রে নেই। সংসদে একটি মাত্র আসন নিয়েও তিনি লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। ৩৪ বছরের শাসনের পর ২০১১ সালের বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই (এম) নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। মমতা ব্যানার্জির জীবনে দু’টি বড় রাজনৈতিক লড়াই এমন চরম সীমায় পৌঁছেছিল যে, তা আজও নজির হয়ে রয়েছে। 
এ বছর ২১ জুলাই তাঁর কেটেছে বিষাদে। তারপরও তিনি ছিলেন ইস্পাত কঠিন। দিদি উৎসাহব্যঞ্জক বক্তব্য রেখেছিলেন এই দিনে, যে দিনটিকে আমরা শহিদ দিবস হিসাবে স্মরণ করি। আমার কাছে– এই ভাষণের দু’টি বার্তা ভীষণ জরুরি। তিনি বললেন, ‘আমি রক্তমাংসে গড়া মানুষ। আমি যন্ত্র নই। আমার হ*দয় আছে।’ এরপর এল তাঁর সেই ঘোষণা– ‘বাংলা চালাবে বাংলার মানুষ, বহিরাগতরা নয়।’ 

এই বাক্যগুলি, বিশেষত দ্বিতীয়টি শুনে আমার শরীরে শিহরণ খেলে গেছে। আমি উপলব্ধি করলাম, আমার নেত্রী, আমার মেন্টর তাঁর জীবনের তৃতীয় নির্ণায়ক লড়াইয়ের জন্য তৃণমূল কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছিলেন। আর সেই লড়াইয়ের প্রতিপক্ষ হল বিজেপি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল, এই যুদ্ধ বাংলার আত্মাকে রক্ষা করার লড়াই। 

প্রথম কথাতেই তিনি তৃণমূল ও বিজেপির ফারাকটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তৃণমূল হ*দয়ের রাজনীতি করে। জয় করে নিতে চায় মানুষের মন। আর বিজেপি হল একটা শীতল, ক্লিনিক্যাল রাজনৈতিক যন্ত্র। দ্বিতীয় মন্তব্যকে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে। আমি যতদিন তাঁকে চিনি তা থেকে বলছি, মমতা ব্যানার্জির মধ্যে কোনও পূর্বসংস্কার নেই। ধর্ম, ভাষা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, জাতিগত পরিচয়,এই সবকিছু দেখে তিনি রাজনীতি করেন না। তাঁর পরিবার, তাঁর বাংলা,তাঁর ভারতে ‘বহিরাগত’ বা ‘অন্তর্গত’ বলে কিছু নেই। তাহলে কেন তিনি রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের পটভূমিতে এই ‘বহিরাগত’ মন্তব্য করলেন? 

বিষয়টি সহজ। যে শক্তি তৃণমূলকে উৎখাত করতে চাইছে,তারা শুধু একটা নির্বাচন জিতেই থেমে যেতে চায় না, বরং বাংলার সামাজিক ঐক্য, সম্প্রীতি ও দীর্ঘলালিত কাঠামো ও বুননকে স্তব্ধ করে দিয়ে বিনাশ করতে চায়। যাদের এই বাংলার সঙ্গে নাড়ির যোগ নেই, যারা এই বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নয়, তারাই ‘বহিরাগত’। বাঙালি ও বাঙালির ইতিহাস বিপদের মুখে। সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করে বাঙালির যে মিশ্র ইতিহাস রয়েছে, সেটাও আজ সংকটে পড়েছে। আর এটাই মমতা ব্যানার্জির উদ্বেগের কারণ। এই জন্য দিদির রাজনৈতিক পথযাত্রার তৃতীয় বড় লড়াইটা এত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন ও ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তাই সাহসী মায়ের মতো তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only