রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

১২ টি ইংরেজি মাদ্রাসায় ভূগোল শিক্ষক নিয়োগ, ১ জন মুসলিমকেও যোগ্য মনে করল না পিএসসি!

পুবের কলম প্রতিবেদক: পশ্চিমবঙ্গ সরকার সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রতিযোগিতার বাজারে সক্ষম করে তুলতে ১৪টি ইংরেজি মিডিয়াম ‘মডেল মাদ্রাসা’ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ডাইরেক্টরেট অব মাদ্রাসা এডুকেশন ফলে ইংরেজিমাধ্যম এই মাদ্রাসাগুলি সম্পূর্ণভাবে সরকার পরিচালিত মাদ্রাসা। আর নাকি নিয়ম রয়েছে, সরকার পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলে তার শিক্ষক নিয়োগ করবে পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। সেই অনুযায়ী, পিএসসি-র কাছে শিক্ষক নিয়োগের জন্য চাহিদা জানিয়ে আবেদন করেছে ডাইরেক্টরেট অফ মাদ্রাসা এডুকেশন (ডিএমই)। ডিএমই  পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কাছে ১২টি মাদ্রাসার জন্য ১২ জন ভূগোল শিক্ষককে চেয়ে পাঠিয়েছিল।

ভূগোল পরীক্ষায় পিএসসি যে ১২ জন প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে, তার ফলাফল বের হওয়ার পর মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ দেখা যাচ্ছে, ইংরেজি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা হিসেবে পিএসসি যে ১২ জনকে নিয়োগ করার ছাড়পত্র দিয়েছে, তাঁদের সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এরই মধ্যে একজনও মুসলমান নেই। ফলে মুসলিম তরুণ-তরুণী, ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক ও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভের প্রকাশ্য স্রোত দেখা যাচ্ছে। যেকোনও সোশ্যাল মিডিয়ায় গেলেই তাঁদের সরব বেদনার্ত ও রাগান্বিত পোস্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাঁরা বলছেন, ১২ জনের মধ্যে একজন মুসলিম প্রার্থীকেও কি পিএসসি যোগ্য বলে মনে করল না? অথচ ইংরেজিতে ভূগোল পড়ানোর মতো প্রচুর মুসলমান তরুণ রাজ্যে রয়েছে। আমরা পিএসসি কর্তৃক ভূগোল পড়ানোর জন্য নির্বাচিত সফল প্রার্থীদের তালিকা তুলে ধরছি। 
১. সৌমেন ঘোষ, ২. মৌমিতা সর, ৩. বৈশালী কুণ্ডু, ৪. সুশোভন মজুমদার, ৫. মেঘদূত সাউ, ৬. সুরোজ ঘোষ, ৭. শুভাশিষ কর্মকার, ৮. সঞ্জিব চক্রবর্তী, ৯. পল্লব নন্দী, ১০. চন্দ্রদীপ পাল, ১১. মৃন্ময় পাল, ১২. রেখা মণ্ডল।

সোশ্যাল মিডিয়া ও মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি ইংরেজি মাদ্রাসার জন্য পিএসসি-র প্রার্থী নির্বাচনের পরীক্ষায় কোনও মুসলিম আবেদনকারী ছিলেন না? এর উত্তর অবশ্য পিএসসি-র প্রকাশিত তালিকাতেই পাওয়া যাচ্ছে। লিখিত পরীক্ষায় সফল প্রার্থীদের যে তালিকা পিএসসি প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে,  ২০২০ সালের ৪ মার্চ ইন্টারভিউয়ের জন্য ১৬ জনকে ডাকা হয়েছিল। এঁদের মধ্যে তালিকায় এক নম্বরে  রয়েছেন রিন্টু সরকার। আর তালিকার শেষে রয়েছেন পিঙ্কি ঘোষ (ওবিসি-বি)। এই তালিকার বাকি ১৪ জনই হচ্ছেন মুসলমান। এঁরা হচ্ছেন--- ২. ফিরদৌসি রহমান সিদ্দিকা (ওবিসি-এ), ৩. জয়নাব খাতুন (ওবিসি-এ), ৪. রোজিনা খাতুন (ওবিসি-এ), ৫. মেহেদি হাসান মণ্ডল (ওবিসি-এ), ৬. সায়রুদ্দিন সেখ (ওবিসি-এ), ৭. বুলবুল হাসান (ওবিসি-এ), ৮. মুহাম্মদ নাসিবুল হক (ওবিসি-এ), ৯. মুন্সি মুহাম্মদ আমীন (ওবিসি-এ), ১০. তরিকুল ইসলাম (ওবিসি-এ), ১১. আরিফুল মল্লিক (ওবিসি-এ), ১২. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান (ওবিসি-এ), ১৩. ইমান সেখ (ওবিসি-এ), ১৪. মুহাম্মদ জুবের আলম (ওবিসি-এ), ১৫. মুহাম্মদ আজিজুল হোসেন (ওবিসি-এ)। 

এই তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে, মাত্র দু’জন বাদে ৪ মার্চের তালিকায় এক সঙ্গে সব মুসলিম প্রার্থীকে ডাকা হয়েছে। এই তালিকা ছাড়াও ২ মার্চ, ৩ মার্চ ও ৫ মার্চে আরও ৪৮ জন  লিখিত পরীক্ষায় সফল প্রার্থীকে ডাকা হয়েছিল। তাঁরা সকলেই অমুসলিম। প্রশ্ন উঠেছে, সমস্ত মুসলিম প্রার্থীকে পিএসসি কেন বেছে বেছে শুধুমাত্র ৪ মার্চের তালিকায় ঢোকাল? এভাবে সাম্প্রদায়িকভাবে প্রার্থীদের বিভক্ত করে পিএসসি কোন বার্তা দিতে চেয়েছে?

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে, পিএসসি ইতিমধ্যে ৪টি বিষয়ে ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসার জন্য ৩৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে নিয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে। এদের ধর্মীয় পরিচয় আগামীতে প্রকাশ করা হবে।

১২টি মাদ্রাসার জন্য ১২ জন আরবি শিক্ষক চাওয়া হয়েছিল। ডাইরেক্টরেট অফ মাদ্রাসা এডুকেশন থেকে জানা গিয়েছে, পিএসসি যোগ্য আরবি শিক্ষক খুঁজে পায়নি।  ইন্টারভিউ নেওয়ার পর অনেক কষ্ট করে পিএসসি মাত্র একজন প্রার্থীকে আরবি শেখানোর যোগ্য মনে করে নিয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে। ফলে ইংরেজিমাধ্যম বাকি ১১টি মাদ্রাসাতে আরবি শেূানোর ব্যবস্থা খুব সংকটের মধ্যে পড়েছে। অনেকে বলছেন, পশ্চিমবাংলায় আরবি শেখানোর মতো যোগ্য প্রার্থীর অভাব হওয়ার কথা নয়, কারণ এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি কলেজ, কলকাতা ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, গৌরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি পঠন-পাঠনে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের পিএসসি মাদ্রাসায় আরবি শেখানোর যোগ্য মনে করল না এটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য লজ্জা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ছাড়া ইংরেজি মাদ্রাসার আরবি শিক্ষক পদে পশ্চিমবাংলা ছাড়াও ভারতের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে পাশ করা আরবি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা অবশ্যই আবেদন করতে পারত। তাহলে কী পিএসসি ঠিকমতো বিজ্ঞাপন প্রদান করেনি? অবশ্য এ কথা ঠিক, আরবি বিভাগে খুব কম অমুসলিম পড়াশোনা করে। তাহলে পিএসসি তাদের পছন্দমতো যোগ্য প্রার্থী কোথা থেকে সংগ্রহ করবে?

কয়েকটি মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, ইংরেজি মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের অন্যতম দু’টি শর্ত ছিল। একটি হচ্ছে, ইংরেজিতে শিক্ষা প্রদানের যোগ্যতা, দ্বিতীয় ভারতীয় সংস্কৃতি ও ইসলামি সংস্কৃতিতে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। তাই অনেকে বলছেন,  নিয়োগের ছাড়পত্র পাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকারা উপরোক্ত শর্তদু’টি পালন করার ক্ষেত্রে কতটা দক্ষ। এ ছাড়া মাদ্রাসার মানোন্নয়ন নিয়ে আগ্রহীরা আরও একটি সওয়াল করছেন, তা হল--- মুসলিম প্রার্থীদের মধ্যে সবাইকেই (১৪ জন) ইন্টারভিউতে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু কতজন এই পিএসসি-র পরীক্ষায় বসার জন্য আবেদন করেছিল, তাদের নাম ও সংখ্যা পিএসসি-র প্রকাশ করা উচিত। 

সাংবাদিক জিম নওয়াজ ‘পুবের কলম’-এর বিশেষ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটা শুধুমাত্র ব্যক্তির বিষয় নয়, এখানে দেখতে পাচ্ছি একটি সম্প্রদায়কেই বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি মুসলিমরা মাদ্রাসাতেই শিক্ষক হিসেবে সুযোগ না পান, তাহলে তারা কোথায় রুজি-রোজগারের জন্য যাবেন---‘আরবে না তুরস্কে’?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only