বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

আমির-উল- মুলক, মুনশী মুহাম্মদ সোনাউল্লাহ

ব্রিটিশ সরকারের বদান্যতায় জলপাইগুড়িতে বেসরকারি ব্যক্তিদের যে সব সরকারি খেতাব বিতরণ করা হয়েছিল, সেগুলি প্রধানত খানবাহাদুর, খানসাহেব, রায়বাহাদুর, রায়সাহেব, নবাব, নাইট, এস.বি.ই., মেরিট সার্টিফিকেট প্রভৃতি। একমাত্র ভারতীয়দেরই এরূপ উপাধি লাভের জন্য বেছে নেওয়া হতো। নাইট, এম.বি.ই., মেরিট সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের খেতাব ছিল ভিন্নরূপ। যে সব ইউরোপীয় ভারত সরকারের উচ্চপদে সমাসীন ছিলেন এবং সরকারের আশানুরূপ কর্ম সম্পাদনে সফল হয়েছিলেন, সরকার তাঁদের মনোবল ও কর্মবল বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর খেতাব প্রদান করতেন। এরূপ সরকারি কর্মচারীদের দেওয়া খেতাবের দু’একটি উদাহরণ দেওয়া হল। যেমন K.T., C.I.E., O.B.E-র সম্মান (order)। খেতাব হল Title, সরকারি কর্মচারীরা যে খেতাবলাভ করতেন, তা হল order order শব্দটির সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ করতে না পারায় তা খেতাব/সম্মান ইত্যাদি দ্বারা বিশেষিত করা হয়েছে। এছাড়া ছিল C.I.E সম্মান। সম্মানলাভের বৈচিত্র্য বোঝাতে এ উদাহরণই যথেষ্ট। 

সরকারের ব্রিটিশ কর্মচারীদের মতো অনেক সময় দেশীয় সরকারি কর্মচারীও K.T, M.B.E প্রভৃতি খেতাব পেতেন। তবে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় রংপুর-নিবাসী (অবশ্য, কর্মক্ষেত্র জলপাইগুড়িও বটে) পঞ্চানন বর্মার ক্ষেত্রে। তিনি পেয়েছিলেন রায়সাহেব।  এছাড়া ছিল খান বাহাদুর, নওয়াব, M.B.E প্রভৃতি সম্মানও। জলপাইগুড়ি জেলার অধিবাসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার এ. এফ. রহমান K.T. সন্মানলাভ করেছিলেন।
জনসাধারণের ভক্তিতে, শ্রদ্ধায় জাতীয় সম্মানলাভ করেছিলেন দেশের অসংখ্য নেতৃবৃন্দ। রাষ্ট্রগুরু, দেশগৌরব, দেশপ্রিয়, দেশবন্ধু, মহাত্মা, দেশপ্রাণ প্রভৃতি অসংখ্য জাতীয় সম্মানলাভ করেছিলেন ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের কাণ্ডারীগণ। বিপরীত-পক্ষে এরূপ সম্মানিত রাষ্ট্রনায়কেরাও স্বদেশি আন্দোলনের সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক ব্যক্তিদেরও জাতীয়তাবাদী সম্মান বা খেতাব প্রদান করতেন। এরূপ উপাধিলাভ করেছিলেন জলপাইগুড়ির দানবীর মুহাম্মদ সোনাউল্লাহ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁকে ‘আমির-উল-মুল্ক’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। ব্রিটিশ প্রদত্ত খানবাহাদুর-রায়বাহাদুরদের ক্যানভাসে এরকম বিরল সম্মানলাভের ঘটনা ব্যতিক্রমী বিষয় হলেও তা উল্লেখ না করলে দানবীর মুনশী সোনাউল্লাহের প্রতি অমর্যাদা করা হবে।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ১ জানুয়ারি স্বরাজ্য দল গঠিত হলে সে-বছরই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ জলপাইগুড়িতে আসেন। ইতিপূর্বে তিনি কংগ্রেস নেতা হিসেবে ১৯২০ সালেও এ জেলায় এসেছিলেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রায়কতপাড়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এবার তিনি এসেছেন বিখ্যাত ব্যবহারজীবী প্রীতিনিধান রায়ের বাড়িতে। সভা করেছেন বর্দ্ধন প্রাঙ্গণে। জ্যোতিষ চন্দ্র সান্যাল তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ দুইবন্ধুর কাছে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত দলের জন্য সদস্য ও তহবিল সংগ্রহ।

সভায় লোকজন বেশি না হলেও দেশবন্ধু দমবার পাত্র নন। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তিনি অত সহজে দমবেনই বা কেন! তিনি তহবিল সংগ্রহের জন্য রাজপথে নামলেন। প্রধান সঙ্গী মাত্র দু’জন---প্রীতিনিধান রায় ও জ্যোতিষ সান্যাল। প্রত্যেক বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দেশবন্ধুর মতো মহান ব্যক্তিকে সকলে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে লাগলেন---দেশবন্ধুর ভিক্ষার ঝুলিও ভরে উঠতে লাগল অর্থ ও অলংকারে। এভাবে অর্থ সংগ্রহ করতে করতে তিনি একসময় হাজির হলেন মুহাম্মদ সোনাউল্লাহর কাছে। মুনশী সোনাউল্লাহ শহরের ধনাঢ্য ব্যক্তি নিঃসন্দেহে---কিন্তু তিনি চা-কাঠ-তামাক ব্যবসায়ী নন, নন উকিল-ব্যারিস্টার। তিনি সামান্য একজন দেশীয় কৃষক। ধান-পাট নিয়েই তাঁর কারবার। সাধারণ ধনী তিনি।

কিন্তু দেশবন্ধুর আবেদনে সাড়া দিয়ে মুনশী সোনাউল্লাহ স্বরাজ্য পার্টি তহবিলে এক হাজার একটি রৌপ্যমুদ্রা দান করলেন। আনন্দিত ও বিস্মিত দেশবন্ধু বলে উঠলেন---‘আমির! আমির-উল-মুল্ক! আজ থেকে আপনার উপাধি হবে আমির-উল-মুল্ক।’ (জলপাইগুড়ি জেলার স্বাধীনতা সংগ্রাম---১৯৪২ সাল পর্যন্ত, চারুচন্দ্র সান্যাল– শারদীয় জনমত, ১৩৭২ সাল)।

মুনশী মুহাম্মদ সোনাউল্লাহ ছিলেন স্থানীয় মুসলমান। তাঁর পূর্ব-পুরুষেরা জলপাইগুড়ি শহরের অনতিদুরে পাহাড়পুরে বসবাস করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ধান ও পাটের ব্যবসার সুবিধার জন্য বেগুনটারীর সন্নিকটে বাড়ি করেন। তবে তিনি ধনী জোতদার মাত্র! অথচ সেদিন ছিল তাঁরই সর্ব্বোচ্চ দান। তিনি কগ্রেস দলের কোনও পদাধিকারী নন। তবুও তিনি দেশের ডাককে উপেক্ষা করতে পারেননি। পরাধীনতার অপমান তাঁর অন্তরকে স্পর্শ করছিল বহুদিন থেকেই---আজ তিনি সৎ উদ্দেশ্যে দান করতে পেরেও হলেন কৃতার্থ।

সোনাউল্লাহ ছিলেন প্রকৃতপক্ষে দেশভক্ত। তিনি ছিলেন দানবীর। দেশবন্ধুকে যে অর্থ তিনি প্রদান করেছিলেন, তা কিন্তু তাঁর একমাত্র দান নয়। তাঁর দানেই গড়ে উঠেছিল আজকের জলপাইগুড়ির অন্যতম, শ্রেষ্ঠ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ‘সোনাউল্লাহ উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। ১৯২১ সালের ১ জুলাই জুম্মাবারে গণেশচন্দ্র সান্যালের উপস্থিতিতে তিনি ‘সোনাউল্লাহ ইনস্টিটিউশনের’ স্থাপনার্থে জমি ও পাঁচ হাজার টাকা দানের অঙ্গীকার পত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। রাজবাড়ির ক্যানপি হাউসে রাজা ফণীন্দ্র দেবের মাতা অমৃতেশ্বরীর নামে একটি বিদ্যালয় চালু ছিল। ওই বিদ্যালয়টি ২০.১১.১৯ খ্রিস্টাব্দ  থেকে রাজবাড়ি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। জলপাইগুড়ি রাজবাড়ি সিপাহী বিদ্রোহ ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের  মদদ দিয়ে চলেছিল বলে ব্রিটিশ সরকার রাজবাড়ির প্রতি কোনওদিনই সদয় ছিল না। এমনকি জগদীন্দ্র দেব রায়কতকে ব্রিটিশ সরকার ‘অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট’-এর পদ দিলেও জগদীন্দ্র দেব রায়কত সেই পদবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাই রাজবাড়ির পরিচালিত বিদ্যালয়টিকে এম.ই. স্কুলে উন্নিত করতে রাজবাড়িরও আপত্তি ছিল না। ফলে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগণের সন্তানাদির শিক্ষার জন্য ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তাঁরই দানে গড়ে উঠেছিল ‘সোনাউল্লাহ ইনস্টিটিউশন। মুনশী সোনাউল্লাহ মুসাফিদের থাকা ও খাওয়ার জন্য যে মুসাফিরখানা গড়ে তুলেছিলেন, তাতে বিদ্যালয়টি স্থানাস্তরিত হয় এবং ধীরে ধীরে বর্তমান রূপ লাভ করে।

শুধু তাই নয় স্বদেশপ্রেমিক সোনাউল্লাহ তাঁর আদি নিবাস পাহাড়পুর গ্রামে পিতামহ ডেঠা মুহান্মদের পুণ্যস্মৃতিতে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা ও পুষ্করিণী করে দিয়েছিলেন।

জলপাইগুড়ির ঐতিহ্যবাহী সংস্থা ‘আর্য নাট্যসমাজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শশীকুমার নিয়োগী। কিন্তু সেই সংস্থার গঠন কার্যে মুহাম্মদ সোনাউল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতা ছিল অপরিসীম। ‘উত্তর দর্পণ’ পত্রিকা (৩ মে, ১৯৭৯) পাঠে জানা যায় যে সোনাউল্লাহ সেই সমাজগৃহের টিন, ইট, কাঠ, দরজা, জানালা প্রভৃতি দান করেছিলেন।

সমসাময়িককালে আর্যসমাজগৃহে কলকাতার স্টার থিয়েটারের অভিনয় নিয়ে এক তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সমাজ কতৃর্পক্ষ স্টার থিয়েটারকে আর্যসমাজগৃহে অভিনয় করবার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। কতৃর্পক্ষ দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এ বিতর্ক অবসানে এগিয়ে আসেন মুনশী সোনাউল্লাহ। ১৯২৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ‘ত্রিস্রোতা’ পত্রিকা জানায়---‘গত সোমবার ৬ ফেব্রুয়ারি হইতে সোনাউল্লাহ সাহেবের বাড়ির সন্নিকটে (বর্তমান সেন্ট্রাল গার্লস উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে) তাঁবুর নীচে স্টার থিয়েটার সম্প্রদায় অভিনয় আরম্ভ করিয়াছেন।’ স্বদেশি নাটকের অভিনয়ের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে তাঁর এ উদ্যম সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ঘটনা থেকে তাঁর দেশপ্রেম, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অকুতোভয় মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়---যা মুসলমান সমাজে ছিল বিরল।

দানবীর মুহাম্মদ সোনাউল্লাহ শুধু যে নবপ্রতিষ্ঠিত ‘সোনাউল্লাহ ইনস্টিটিউশনের’ জন্য ভূমি ও অর্থ প্রদান করেছিলেন তা নয়, তিনি পরবর্তীকালে বহুবার এ প্রতিষ্ঠানকে অর্থ জুগিয়ে গিয়েছেন। ‘ত্রিস্রোতা’ পত্রিকা (২৭/৫/২৮, ৮/১২/২৯ এবং ১৬/৩/৩০) সূত্রে জানা যায়, যে তিনি প্রতি বছর শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য ক্রমান্বয়ে অর্থ সাহায্য করেছিলেন।

তাঁর দানের সীমা-পরিসীমা ছিল না। প্রকৃত শিক্ষাবিদের ন্যায় তিনি অন্যান্য শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানেও অকাতরে অর্থ সাহায্য করেছিলেন। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুল সরকারি বিদ্যালয়। সরকার তাঁর পরিচালনায় প্রভূত অর্থ প্রদান করে থাকেন। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যালয়গুলির অবস্থা বড়ই করুন। তাই তিনি যেমন সোনাউল্লাহ ইনস্টিটিউশনে অর্থ জোগান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তেমনই শহরের আর একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘ফণীন্দ্রদেব ইনস্টিটিউশন’কে প্রভূত অর্থ প্রদান করেন। ১৯৩০ সালে তিনি ওই ফণীন্দ্রদেব ইনস্টিটিউশনকে দুই কিস্তিতে ১২ হাজার টাকা প্রদান করেছিলেন (ত্রিস্রোতা, ১৫.১১.১৯৩০)। তাঁরই দানে শহরের পশ্চিম প্রান্তে ৪নং গুমটিতে গড়ে উঠেছিল ‘করিমন্নেছা প্রাথমিক বিদ্যালয়’। তিনি তাঁর মাতার পুণ্যস্মৃতিতে এ বিদ্যালয়টি স্থাপন করেছিলেন।

একটা প্রচলিত ধারণা গড়ে উঠেছিল যে দেশপ্রেমিক সোনাউল্লাহ নিরক্ষর ছিলেন। সোনাউল্লাহ উচ্চতর বিদ্যালয়ের হীরক জয়ন্তী অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে এ বিষয়ে একটা বিতর্ক গড়ে উঠেছিল। সে বিতর্কটি শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের স্টাফ কাউন্সিলের সভাতেও গড়িয়ে এসেছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী বীরেন্দ্রনাথ মিত্র এবং সহ-শিক্ষক শ্রী উমেশ শর্মা শেষ পর্যস্ত সে ভ্রান্ত ধারণা অবসানকল্পে সোনাউল্লাহ সাহেবের পুত্র মজনু’র নিকট থেকে একটা পুরনো দলিল সংগ্রহ করে দানবীর সোনাউল্লাহর ‘স্বাক্ষর’ ফটোকপি করে ‘হীরকজয়ন্তী স্মারক পত্রিকা’য় তা ছেপে দিয়েছিলেন। তবে এ কথা সত্যি যে মুহাম্মদ সোনাউল্লাহ উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর বিদ্যানুরাগ ছিল প্রবল। শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই যে বিদ্যানুরাগী একথা সর্বত্র সঠিক নয়।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত সোনাউল্লাহ বিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্ররা আজ পৃথিবীর সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত। প্রাক্তন এম.পি. শ্রী দেবপ্রসাদ রায়ের কথা এ প্রসঙ্গে একটি কারণে উল্লেখ করা প্রয়োজন। তিনিও এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীর প্রাক্কালে তিনি তাঁর সংস্থা ‘আইকার্ড’-এর পক্ষ থেকে শহরের কেন্দ্রস্থলে বেগুনটারী মোড়ে সোনাউল্লাহ সাহেবের একটি আবক্ষমূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং স্থানীয় পৌরসভার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেন। নিঃসন্দেহে এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

দানশীল সোনাউল্লাহের মানবতাবোধ ছিল এক উচ্চ আদর্শবোধের দ্বারা অনুপ্রাণিত। তিনি মনে করতেন দরিদ্র সেবাই হল ঈশ্বর সেবা। ধর্মভীরু মুনশী সোনাউল্লাহর দানে তাই কোন অহংবোধ ছিল না। তাই তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দরিদ্রদের সাহায্য করতেন। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িকতার উর্দ্ধে। তাঁর দরিদ্র সেবার একটি অন্যতম মাধ্যম ছিল খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ। এরূপ দান তিনি প্রতি বছর করতেন। যে-কোনও সাহায্যপ্রার্থী তাঁর দরজায় এসে দাঁড়ালে তিনি তাকে যথাসাধ্য সেবা করতেন, কিন্তু বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে তিনি অকাতরে খাদ্য ও কম্বলসহ বস্ত্রাদি দান করতেন। ত্রিস্রোতা পত্রিকা (২১.১১.১৯২৬) এরূপ দানের প্রসঙ্গে লিখেছিল--- ‘‘বঙ্গদেশের নানা জেলা হইতে (এ বৎসর এমনকি বারাণসী হইতে) হিন্দু-মুসলমান অনেকে কম্বল লইতে আসেন। গত ৩রা অগ্রহায়ণ ১৩৩৩, শুক্রবার কম্বল বিতরণ করা হইয়াছে।’’ এরূপ দানশীল ব্যক্তি যদি ‘আমির-উল-মুল্ক’ অর্থাৎ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী না হন, তবে কৃপণ ধনীরা কখনোই সে উপাধির উপযুক্ত হতে পারেন না।

ধর্মনিষ্ঠ মুনশী সোনাউল্লাহ ছিলেন খাঁটি মুসলমান এবং প্রকৃত ধার্মিক। শহরের ধনী ও মানী মুসলমান খানবাহাদুর রহিম বক্স পারিবারিক ধর্মোপাসনার জন্য নিজ বাড়িতে স্থাপন করেছিলেন সুবৃহৎ ‘বাণী মসজিদ’। মুনশী সোনাউল্লাহ কিন্তু তাঁর বাড়িতে মসজিদ স্থাপন করেননি। তিনি সর্বসাধারণের জন্য দিনবাজারে একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। উভয়ের চিন্তাধারার মৌলিক পার্থক্য এখানেই।

এছাড়াও তিনি তাঁর দাদাশ্বশুর দিনু গোমস্তার সহযোগিতায় ৪নং গুমটির কাছে সুপ্রাচীন (১২০৬ খ্রি.) তৈরি পুরাতন মসজিদটির সংস্কার সাধন করেছিলেন। এ’কাজ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ, কিন্তু জনসেবার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। (ভূমিলক্ষ্মী পত্রিকা-২১শে অগ্রহায়ণ, ১৩৮৬)। প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাঁর উদ্যম ও প্রয়াস তাঁকে কালজয়ী মহিমা প্রদান করেছে। 

তিনি স্বল্পশিক্ষিত হলেও ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে তিনি মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে কখনোই দ্বিধা করেননি। ঐতিহ্য অনুসারী হলেও তিনি ছিলেন সমকালীন যুগে প্রগতিশীল ব্যক্তি। নিজে হেকিমি চিকিৎসা ব্যবস্থায় আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও তিনি ছিলেন গুণগ্রাহী। তাই তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ইদার মুহাম্মদের অকাল মৃত্যু হলে মুনশী সোনাউল্লাহ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসারে এবং সুব্যবস্থা সাধনের জন্য উদ্যোগী হন। জলপাইগুড়ি জেলা সদর হাসপাতালে তিনি এজন্য একটি ‘ব্লক’ তৈরি করে দেন। আজও সে ব্লকটি ‘ইদার মুহাম্মদ ব্লক’ নামে পরিচিতি নিয়ে বর্তমান।

পুতঃ চরিত্র সোনাউল্লাহের আর একটা বিশেষ দিক উল্লেখ না করলে এ রচনা অসম্পূর্ণ থাকবে--- সেটি হল তাঁর ক্রীড়ামোদী মনোভাব। তিনি কাবাডি, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা প্রভৃতি দেশীয় খেলাধূলায় যেমন উৎসাহী ছিলেন, তেমনি ফুটবল খেলাতেও তাঁর আগ্রহ ছিল সমধিক। জলপাইগুড়ি ‘টাউন ক্লাবের’ তিনি ছিলেন উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক। তাঁরই উদ্যোগে চালু হয়েছিল ‘সোনাউল্লাহ শীল্ড’, ‘লীজ রানার্স কাপ’ প্রভৃতি। সোনাউল্লাহ শীল্ড ছিল জলপাইগুড়ি জেলার সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট। তাঁর বিশেষ বন্ধু ছিলেন জলপাইগুড়ির ডেপুটি কমিশনার মি. লীজ। সে বন্ধুর নামেই তিনি ওই কাপটি চালু করেছিলেন। অপর এক বন্ধু প্রসন্নদেব রায়কত, ভূপবাহাদুরের সঙ্গে সোনাউল্লাহ সাহেব ঘোড়ায় চড়ে ঘুরতেন। দেশ, পরিবেশ, পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতেন। এই নিভৃত ভ্রমণের রোজনামচা চিরদিন অপ্রকাশিতই থাকবে। 

চিন্তায়-চেতনায় উভয়ে ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী। তাই বহু অকথিত কাহিনী লুকিয়ে আছে সেই ভ্রমণসূচির অন্তরালে। তবে এ অশ্বারোহণ শুধু অবসর বিনোদনের জন্য নয়। তিনি ছিলেন দক্ষ অশ্বারোহী। জলপাইগুড়ি রেসকোর্সের মাঠেও তিনি বহুবার অশ্বারোহণ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

তাঁর স্বদেশপ্রেম ও স্বদেশচেতনা ছিল সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ভালোবাসতেন তাঁর দেশ ও জাতিকে। খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা লাভে তিনি ছিলেন নির্মোহ। যদি তিনি সামান্যতমভাবে ব্রিটিশ সমর্থক হয়ে উঠতেন, তাহলে আজ এরূপ ব্যক্তিত্ব প্রচারের পাদপীঠে চলে আসতেন। কিন্তু তিনি তা কখনও কামনা করেননি। তিনি ছিলেন নীরব দেশপ্রেমিক। জুমা মসজিদে মুসলমানগণ সাপ্তাহিক নামায শেষে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন। মুনশী সোনাউল্লাহ ছিলেন সেক্ষেত্রে নীরব শ্রোতা মাত্র। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে মার্চ অমৃতবাজার পত্রিকা খিলাফত আন্দোলনে জলপাইগুড়ির মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে লেখে---
Mohamedans of Jalpaiguri assembled at the Juma Mosque, after the usual prayer, most respectfully urge upon His Excellency to Convey His gracious, the King Emperor to the humble prayer of the Musalmans that the harm of peace with the Khalifatul of Muslemin, the Sultan of Turkey, be not Contrary to the dictates of Shariat and the Commandments of Islam. 

এ মসজিদটি স্পষ্টতই জুমা মসজিদ, বাণী মসজিদ নয়। আর তাছাড়া খানবাহাদুরদের মসজিদে এ ধরনের আলোচনাও সম্ভব নয়। তাই জুমা মসজিদটি গঠন করে নীরবে দেশসেবারও পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন সোনাউল্লাহ,  জনজাগরণে হয়েছিলেন সহায়ক।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে জলপাইগুড়ির ‘হাতেমতাই’, মুহাম্মদ সোনাউল্লাহ ইহলোক ত্যাগ করেন!

সোনাউল্লাহ ৩টি বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু ৩ স্ত্রীর সন্তান সংখ্যা ছিল মাত্র সাতজন। প্রথমা স্ত্রীর নাম করিমুন্নেছা। এই স্ত্রীর দু’টি কন্যা এবং তিন পুত্র। কন্যা দু’জনের নাম এজারন্নেছা ও আকিরুনেছা। তিন পুত্রের নাম ছিল--- সাহাজাদ মুহাম্মদ, সাফায়াত মুহাম্মদ ও সফিউল্লা। এ তিন পুত্রই অকালে মারা যায়। ফলে তিনি বংশরক্ষার জন্য পুত্রসন্তান কামনায় দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন। সে স্ত্রী অকালে পরলোক গমন করলে তিনি তৃতীয়বার আমিরুন্নেছাকে বিয়ে করেন। প্রথম পর্যায়ে তাঁরও সন্তানাদি না হওয়ায় তিনি চতুর্থবার দার পরিগ্রহ করেন। কিন্তু অবশেষে তৃতীয়া পত্নীর গর্ভে ফজলে করিম (ওরফে কাল্টু মিঞা) এবং চতুর্থা পত্নী গমিয়ন্নেছার গর্ভে আজিজুর রহমান (ওরফে মজনুর) জন্ম হয়। দু’পুত্রই বর্তমান বাংলাদেশের নাগরিক। ১৯৪৭ সালের পর সৃষ্ট বিরূপ পরিস্থিতিতে তাঁরা বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য হন।

জলপাইগুড়িতে খানবাহাদুর-খানসাহেবদের সঙ্গে আমির সোনাউল্লাহর চরিত্রগত মূল পার্থক্য হল মানসিকতায়। একদল ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের সহযোগী ও কৃপাপ্রার্থী, কিন্তু অপরদলের নিঃসঙ্গ পথিক ছিলেন তিনি। তাঁর ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছিল তাঁর চরিত্র মাধুর্যে, আচরণে ও দানে। তাই কোনও সরকারি খেতাব লাভের যোগ্য তিনি হতে পারেননি। অবশ্য স্থানীয় কোনও হিন্দু জোতদার যে কেন সরকারি খেতাব লাভ করতে পারেননি, তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। রাজবংশী জোতদারদের মানসিকতা কি ব্রিটিশ-বিরোধী ছিল--- এ প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। সোনাউল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের কৃপাপ্রার্থী ছিলেন না। কারণ তিনি যে ‘আমির-উল-মুল্ক’। ‘শাশ্বত ধনে যে ধনী’ তাঁকে আর কী সম্মান জানাবে বিদেশি সরকার? তাই তো পুরাতন মসজিদের পাশে অনাড়ম্বর তাঁর সৌধ। অনুরাগী জনেরা প্রতি বছর সে সৌধ চুনকাম করতে করতে তাঁর নামের ফলকটিও মুছে ফেলেছে। তিনি বেঁচে আছেন অজস্র গুণমুগ্ধের অন্তরে। সেখানেই তাঁর স্থায়ী আসন পাতা---সে আসন আমিরের, সে আসন ফকিরের।
তথ্য ও ছবি সংগ্রহে মুস্তাক আলি, 
আহমদ হাসান ইমরান ও রুবাইয়া 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only