সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২০

এখন সংবাদ মাধ্যমকেও কি দেশভক্তির পরীক্ষা দিতে হবে?

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে ভারত ক্রমশই আন্তর্জাতিক সূচকে পিছু হটছে। গত ৫/৬ বছরে পালা করে নামছে সূচকের মাত্রা। তারই মধ্যে দেশের বৃহত্তম সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর উপর রাষ্ট্রীয় হুমকি কীসের অশনি সংকেত? বিশ্লেষণে প্রদীপ মজুমদার

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা কী সত্যিই আছে ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে? এই প্রশ্নটা উঠছে গ্লোবাল প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সের র‍্যাঙ্কে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখি বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংএ আরও দুই ধাপ নেমে গিয়েছে ভারত। সৌজন্য বিজেপি শাসন। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে ভারতের স্থান ১৪২তম স্থানে।

দ্য ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সের ডেটা বলছে, ২০১৯ সালে ভারতে একজনও সাংবাদিককে খুন করা হয়নি। তবুও ২০১৮ থেকে বেশ কয়েক ধাপ নিচে নেমে গিয়েছে ভারতের অবস্থান। ২০১৮ সালে ভারতে ৬ জন সাংবাদিক খুন হয়েছিলেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার নিরিখে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খানিকটা উন্নতি করলেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পদে পদে খর্ব হয়ে চলেছে। যা গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষদের কাছে যথেষ্ট চিন্তার।

তথ্য বলছে, চলতি বছরে ভারতে সাংবাদিক খুনের ঘটনা না ঘটলেও সাংবাদিকদের উপর পুলিশের অত্যাচার, রাজনৈতিক নেতাদের চাপ সৃষ্টি, দুর্নীতিবাজ অফিসার ও অপরাধমূলক গোষ্ঠীর প্রতিশোধের হুমকি--- সব মিলিয়ে ভারতে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স ২০২০’-র রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘হিন্দুত্ববাদী সরকারের লাইনে থাকতে সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। যে সব সাংবাদিক হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী বা কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে লিখছেন বা মুখ খুলছেন, তাঁদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চরম হেনস্থা ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে হেনস্থার শিকার মহিলা সাংবাদিকরা। কেবল চলতি বছর নয়, বিগত তিন-চার বছর ধরেই প্রেস ফ্রিডমে ভারতের র‍্যাঙ্ক এক-দুই ধাপ করে নামতে শুরু করেছে। ২০১৮-তেই ভারতের র‍্যাঙ্ক ছিল ১৩৮।

ক্ষমতাকে সত্যি কথাটা শোনানো সাংবাদিকদের কাজ। অন্যথা হলে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনও কালেই কোনও দেশেই শাসক সত্যি কথাটা শুনতে পছন্দ করে না। তবে, মাত্রার তফাৎ ছিল। মিলিটারি জুন্টা কিংবা একনায়ক রাষ্ট্রের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার বলে কিছু হয় না। এমন শাসক সমালোচনা কিংবা গণবির্তক সহ্য করে না। সাংবাদিকরা বেশি সাহসী হলে সেখানে কোতল হবে কিংবা জেলে পচবে--- এটাই নিয়ম। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে তুলনামূলকভাবে যতখানি স্বাধীন পরিবেশ ছিল, সেটাও পরিসরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের এমন বহু রাষ্ট্রই আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসার দিতে রাজি নয়। তবে স্বতন্ত্রতা ছিল ভারতের ক্ষেত্রে। এ দেশের সংবিধান সংবাদ মাধ্যমকে পূর্ণমাত্রায় স্বাধীনতা দিয়েছে, কেবল তাই নয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে তথ্য জানার অধিকারও দিয়েছে নাগরিকদের। কিন্তু সাম্প্রতিককালে অনেক ক্ষেত্রেই সংবিধানের নীতির উলঙ্ঘন দেখা যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে তারই প্রতিফলন ঘটছে। ২০১৬ সালে যে তালিকায় ভারতের স্থান ছিল ১৩৩ নম্বরে। তারপর থেকে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে ক্রমাগত ভারতের অবস্থান নিচের দিকে যাচ্ছে।

বেশকিছু দিন ধরে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরোধিতা করলে তাকে জাতীয়তাবাদ বিরোধী কিংবা দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করা হচ্ছে। দেশজুড়ে এমন একটা ভাবধারা গড়ে তোলার ভরপুর চেষ্টা চলছে যে, কেন্দ্রের সরকার ও শাসক দল বিজেপি, যেটা ঠিক বলে মনে করবে সেটাই জাতীয়তাবাদ, সেটাই দেশপ্রেম। সরকারের কাজের সমালোচনা যে দেশদ্রোহী হতে পারে না কখনোই, সেই চিরাচরিত ধারাকে জোর করে বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে ভরপুরভাবে। সেই স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদীদের রোষানলে পড়ল এবার দেশের অন্যতম বৃহৎ সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া বা পিটিআই, কখনও দেশ বিরোধী সংবাদ প্রকাশ করেছে, অতীতে এমন কোনও নজির নেই। জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করেছে এমনও রেকর্ড নেই। অথচ দেশের বৃহত্তম সেই সংবাদ সংস্থাই হয়ে গেল জাতীয়তা বিরোধী? ভারত-চিন সীমান্ত বিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে পিটিআই সম্পর্কে এমনই গুরুতর অভিযোগ তুলেছে কেন্দ্রীয় সরকারের সংবাদমাধ্যম প্রসার ভারতী।

ভারতে ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই। দুই পক্ষের বক্তব্য দিয়ে সঠিক সংবাদ পরিবেশন করার ক্ষেত্রে এই সংবাদ সংস্থার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। একপেশে খবর পিটিআই থেকে পাওয়া যায় না বললেই চলে। কিন্তু ভারত-চিন সাম্প্রতিক বিরোধের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। তারা জাতীয়তা বিরোধী খবর পরিবেশন করছে। তাদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বার্থ এবং আঞ্চলিক সংহতি বিরোধী কাজ করারও অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগটা করেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা প্রসার ভারতী, যাদের অধীনে রয়েছে দূরদর্শন ও আকাশবাণীর মতো সরকার নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিও কেন্দ্র। এই কেন্দ্রীয় সংস্থা এবার পিটিআই-এর সঙ্গে সমস্ত আর্থিক সম্পর্কও ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছে। প্রসঙ্গত, প্রতি বছর প্রসার ভারতী পিটিআইকে সাত কোটি টাকা দেয়।

কেবল দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম পিটিআই-এর দেওয়া খবর প্রকাশ করে কিংবা সংবাদ সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে। যে কারণে প্রসার ভারতী পিটিআই’কে কাঠগড়ায় তুলেছে তার মূলত দু’টি কারণ রয়েছে। একটি খবর আর একটি টু্ইট। খবরটি হল, দিল্লিতে নিযুক্ত চিনের রাষ্ট্রদূতের একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রতিবেদন। সেখানে চিনা রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন, ভারতই লাদাখের চিনা এলাকায় ঢুকেছিল। সংঘর্ষের দায় চিনের নয়। ভারতের ঘাড়েই তিনি যাবতীয় দায় চাপিয়ে দিয়েছেন। পিটিআই-এর ‘দোষ’ সঠিক সংবাদের সংজ্ঞা মেনে বিরোধী পক্ষের মতামতও তুলে ধরেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশের তরফ থেকে তাঁর প্রতি উত্তর দেওয়া হবে--- এটাই স্বাভাবিক। চিনের দাবি যে ঠিক নয়, তাও ভারতীয় নেতৃত্বের বয়ানের মাধ্যমে তুলে ধরেছে ভারতের এই সংবাদ সংস্থা। তবুও তাকে কাঠগড়ায় তোলা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।

দ্বিতীয় বিষয়টি হল চিনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য নিয়ে একটি টু্ইট। সেখানে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বার বার ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া এবং নির্মাণ কাজ চালানোর অভ্যাস চিনকে ছাড়তে হবে। এটাও একশ ভাগ জাতীয়তাবাদী বার্তা। কিন্তু এই বার্তাটাই প্রচার করে কেন্দ্রের রোষে পড়তে হল পিটিআইকে। এর একটাই কারণ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলছেন, ভারতীয় ভূখণ্ডে বহিরাগত কেউ ঢোকেনি। কোনও পোস্টও অন্য দেশের দখলে নেই। সেখানে কেন চিনা অনুপ্রবেশের কথা বলা হল? এরপরই জোরদার বিতর্ক শুরু হয়েছে। এটা কেবল একটি সংবাদ সংস্থার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টিও। বিশ্ব জুড়ে গণমাধ্যম প্রশ্ন তুলেছে। আর আমাদের দেশের বিরোধী দলগুলিও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ তুলেছে। প্রশ্ন উঠছে প্রতিপক্ষ দেশের মতামত তুলে ধরাও কি জাতীয়তা বিরোধী? আমরা কি সেই মতামতের যোগ্য জবাব দিতে পারি না? দুই পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরাই তো সঠিক খবর। বক্তব্যের ধারেভারেই তো জনগণ বুঝে নেয়। বলা হচ্ছে, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই হল গণতন্ত্রের কষ্টিপাথর। গণতন্ত্রের সেই ধারণাকে বজায় রাখা উচিত।

প্রসার ভারতীয় পিটিআই-এর কাছে একটি হুমকি পত্র পাঠিয়েছে। সেখানে তাদের সিদ্ধান্তের কথাও বলা হয়েছে। প্রসার ভারতীকে বলা হয় স্বশাসিত সংস্থা। তাতে কি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই? কিংবা প্রভাব? যে প্রতিবেদনটি নিয়ে দেশ বিরোধী অভিযোগ উঠছে, তার শুরুতেই চিনের বিরুদ্ধে আঙুল তোলা হয়েছে। তারপরই চিনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। তারপরেও ভারতের বক্তব্য রয়েছে। এটা কী করে দেশ বিরোধী হয়? দাবি ওই সংবাদ সংস্থারই।

ভারতের প্রথম শ্রেণির সংবাদ সংস্থা হিসেবে পিটিআই-এর একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্বাধীনতার আগে কে সি রায় তৈরি করেছিলেন অ্যাসোসিয়েট প্রেস অফ ইন্ডিয়া বা এপিআই। ১৯১৯ সালে সংস্থাটি ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স অধিগ্রহণ করে। তবে এপিআই নাম রেখে দেয় তারা। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার মাত্র কয়েকদিন পর ২৭ আগস্ট তৈরি হয় প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া বা পিটিআই। দু’বছর পর সংস্থাটি এপিআই-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে রয়টার্সের সঙ্গে তাদের সংযোগ ছিল। সেটা আর্থিক কারণেই বেশি। সেই সংযোগ ছিন্ন হয় ১৯৫৩ সালে। তারপর থেকে পিটিআই দেশের প্রতি আনুগত্য রেখেই নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে আসছে। দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম পিটিআই প্রদত্ত সংবাদকে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। সেই আস্থাশীল সংবাদ সংস্থার প্রতি প্রসার ভারতীর এমন হুমকিকে অনেকেই গণমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস হিসেবে দেখছেন। এটা যদি সত্যিই সেটা হয়, তবে দেশের গণতন্ত্র ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার মর্যাদাক্ষুন্ন হবে। এটা সংবিধানেরও পরিপন্থী। কারণ গণমাধ্যম মজবুত না হলে গণতন্ত্রও মজবুত হতে পারে না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only