শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

শাহাদাত দিবসে সিরাজ স্মরণ

আহমদ হাসান ইমরান
আজ ৩ জুলাই সিরাজের শাহাদাত দিবস। বাংলা-বিহার-ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা পলাশির যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার জেরে পরাজয়ের পর পত্নী লুৎফুন্নিসাকে নিয়ে পাটনার পথ ধরেছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল, সেখান থেকে পটনায় পৌঁছে তাঁর নায়েব সুবেদার রাজা রাম নারায়ণের অধীনে সেখানে তাঁর যে সেনাবাহিনী ছিল এবং সেই সৈন্যদের সঙ্গে ফরাসি সেনাপতির সাহায্য নিয়ে ও তাঁর নিজের বাহিনীকে সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করে তিনি আবার মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করবেন। 

সিরাজের বিশ্বাস ছিল, এবার  লড়াই হলে তিনি মুর্শিদাবাদ পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। কারণ পলাশির যুদ্ধে তিনি লক্ষ্য করেছেন, বিশ্বাসঘাতকতার জেরে তিনি হেরেছেন। ইংরেজ বাহিনীর কোনও পরাক্রম বা বীরত্ব তাঁর পরাজয়ের নেপথ্যে ছিল না। আর তাঁকে এই সুযোগ না দেওয়ার জন্যই তরুণ নবাবকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদে হাতিতে চড়িয়ে নবাব সিরাজের মৃতদেহ ঘোরানো হয়।

তরুণ নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা মাত্র ১ বছর ২ মাস রাজত্ব করেন। এরমধ্যেই তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবিলা ও তাঁদের কয়েকজনকে দমন করেন। সিরাজ বিদেশি ও স্বদেশি চক্রান্তকারীদেরও দমন করার জন্য পদক্ষেপ নেন। তিনি মতিঝিল অধিকার করে তাঁর শত্রুতাকারী ঘসেটি বেগমকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসেন। 

তরুণ সিরাজের সিংহাসন আরোহণ করার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বা ২২ বছর।  সিংহাসনে বসার পর প্রথম থেকেই সিরাজ বিদেশি ইংরেজদের কু-মতলব এবং ঔদ্ধত্য দমন করার দিকে নজর দেন। তিনি ইংরেজদের কাশিমবাজার দুর্গ অবরোধ করেন। কাশিমবাজার দখল করে তিনি দুর্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইংরেজ সেনাপতি ওয়াটসনকে তাঁর দরবারে হাজির হতে আদেশ করেন। সিরাজ তাঁকে হত্যা বা গ্রেফতার না করে, নবাবের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা হবে এই অঙ্গীকারপত্র লিখে স্বাক্ষর করতে বলেন। 

ইংরেজদের দমন করার জন্য এরপর সিরাজ-উদ-দৌল্লা তাঁদের ঘাঁটি তৎকালীন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে সেনা অভিযান করেন। ১৮ থেকে ২০ জুন তুমুল লড়াইয়ের পর ওই দুর্গ সিরাজের দখলে আসে। ইংরেজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করার জন্য চিহ্নিত করেও উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভকে ক্ষমা করেন সিরাজ। তিনি মানিকচাঁদকে দুর্গের শাসনভার দিয়ে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন। অবশ্য মানিকচাঁদও পরে সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।  তিনি কলকাতার নামকরণ করেন ‘আলিনগর’।

এরপর সিরাজ নবাবগঞ্জে অভিযান চালিয়ে বিদ্রোহী শওকত জঙ্গ-এর সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁকে পরাজিত করেন। শওকত জঙ্গ ইংরেজদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সিরাজের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যুদ্ধে শওকত জঙ্গ নিহত হন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সিরাজ তাঁর মাত্র ১ বছর ২ মাসের শাসনকালে পরপর তিনটি যুদ্ধযাত্রা করে বিজয়ী হন। একইসঙ্গে তিনি রাজ দরবারের প্রভাবশালী কুচক্রীদেরও দমন করার চেষ্টা করেন। 

কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে, ইংরেজ ও আমাদের কিছু ভারতীয় ঐতিহাসিক নবাব সিরাজের নানা রকম ‘অপকর্মের কথা’ প্রমাণ ছাড়াই লিখতে থাকেন, যেমন--- সিরাজ ছিলেন নারীলোলুপ, সুরাপায়ী, প্রজাদের নির্যাতনকারী, উচ্ছৃঙ্খল ইত্যাদি। কিন্তু সিংহাসনে আরোহণ করার পর নবাব সিরাজ এই সব দুষ্কর্ম করার সময় কোথায় পেলেন আর এসব কথার প্রমাণ কী, তা অবশ্য এসব ‘মান্যগণ্য’ লেখকরা বলার প্রয়োজনবোধ করেননি। সিরাজকে ইতিহাসে কলঙ্কিত করার চেষ্টাই তাঁরা করেই চলেছেন। 

তৎকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী, নাটকপ্রণেতা ও ভদ্রলোক সমাজের অনেকেই এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। অবশ্য পরবর্তীতে বেশ কিছু নিরপেক্ষ গবেষক দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে এসব মিথ্যা অপবাদ দূর করার চেষ্টা করেছেন। 

কিন্তু এখনও ‘সিরাজ বিদ্বেষ’ বহু বুদ্ধিজীবীর মন-মস্তিষ্ক থেকে মুছে যায়নি। বামফ্রন্ট সরকার তাদের রাজত্বের মাঝামাঝি বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে ২টি প্রস্তাব পাশ করেছিলেন। একটি ছিল, কলকাতা বিমানবন্দরের নাম হোক নেতাজি সুভাষচন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আর ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের নাম হোক ‘সিরাজ দুর্গ’ এবং মুর্শিদাবাদগামী একটি ট্রেনের নামকরণ করা হোক ‘সিরাজ এক্সপ্রেস’। প্রথম প্রস্তাবটি মেনে নিলেও, বাংলার বেশ কিছু ঐতিহাসিক ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের নাম এবং ট্রেনের নাম সিরাজ এক্সপ্রেস রাখার তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। এর বিরুদ্ধে তাঁরা নানা রকম কু-যুক্তি খাড়া করতে থাকেন। তাই ট্রেনটির নাম রাখা হয় ‘ভাগিরথী এক্সপ্রেস’ আর ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সম্পর্কে বলা হয়, সিরাজ-উদ-দৌল্লা কলকাতায় গঙ্গাপাড়ে ফোর্ট উইলিয়াম নামে যে দুর্গ দখল করেছিলেন সেটা একটু ভিন্ন জায়গায় অবস্থিত ছিল। কাজেই...।

ভারতীয় উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলনের প্রথম শহিদ সিরাজ-উদ-দৌল্লার নামে কলকাতায় এখনও কোনও স্মারক কিংবা একটি রাস্তার নামকরণও করা হয়নি। তাঁর মৃত্যু বা শাহাদাত দিবসে তেমন কোনও সেমিনার বা আলোচনাচক্র ও স্মরণসভার আয়োজন হতে দেখা যায় না। আমরা বাংলার সেই সময়ের ইতিহাসকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বিজয়গাঁথা  হিসাবেই দেখতে পছন্দ করি। এর দ্বারা আমরা আমাদের নয়া প্রজন্মকে কীভাবে দেশপ্রেম শিক্ষা দিচ্ছি তা শুধু আমরাই জানি। 

সিরাজ-উদ-দৌল্লা কলকাতা দখল করে নাম দিয়েছিলেন ‘আলিনগর’। নবাব সিরাজ নিজের সুখ, ঐশ্বর্যের জন্য কখনই কারও সঙ্গে আপস করেননি। নইলে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে মিত্রতা করে সহজেই নিজ নবাবি বজায় রাখতে পারতেন। বিভিন্ন সময়ে কলকাতার বিভিন্ন এলাকার ও রাস্তার নাম পরিবর্তন হতে দেখেছি। আমরা তো কলকাতার কোনও এলাকার নাম পরিবর্তন করে সিরাজের সম্মানে ‘আলিনগর’ রাখতে পারি। কিন্তু এইসব প্রস্তাব তোলাকে আজ হয়তো ‘দেশ বিরোধী’ বলে গণ্য করা হবে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only