সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২০

ইংরেজি মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে আরটিআই, বিস্তারিত পড়ুন

 


সেখ কুতুবুদ্দিন 

১২টি ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসার ভূগোল শিক্ষক নিয়োগে একজনও মুসলিমকে নিয়োগ না করায় কিছু অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী আরটিআই করে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন। ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে পিএসসি-র মাধ্যমে। আরবিতে ১২টি পদের মধ্যে পিএসসি মাত্র একজনকে যোগ্য মনে করেছে। 

সম্প্রতি পশ্চিমবাংলা সরকার ১৪টি মুসলিম প্রধান এলাকায় ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসা স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ১২টি ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, বাকি দু’টি ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসা চালু করার প্রক্রিয়া জারি রয়েছে। 

এই ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসা স্থাপনে সরকারের সদিচ্ছার পরিচয় পাওয়া যায়। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে যে– সংখ্যালঘু প্রধান এলাকায় ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসা স্থাপিত হলে সেখান থেকে প্রচুর মুসলিম ছেলেমেয়ে ইংরেজিতে দক্ষ হয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ পাবে এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও চাকরির বাজারেও তারা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে মুসলিম আবেদনকারীরা চাকরি পাচ্ছেন না কিংবা অত্যল্প সংখ্যায় চাকরি পাচ্ছেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে– যদি মাদ্রাসাতেই মুসলিম প্রার্থীরা চাকরি না পান তাহলে কোথায় পাবে। 

অবশ্য যেমন পশ্চিমবাংলায় সরকার পরিচালিত সমস্ত মাদ্রাসায় হিন্দু ছেলেমেয়েদের প্রবেশে কোনও বাধা নেই। ঠিক তেমনি ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতেও অমুসলিম ছাত্রছাত্রীদের প্রবেশ ও পঠন-পাঠনের উন্মুক্ত সুযোগ রয়েছে। 

ইংরেজিমাধ্যম সরকারি মাদ্রাসাগুলি ‘সরকার পরিচালিত’ হওয়ায় এর শিক্ষক নিয়োগ হয় পিএসসি বা পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে। কেন ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসার ক্ষেত্রে এই নিয়ম তা নিয়ে অবশ্য কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছে। 

সম্প্রতি এই ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে ভূগোল শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। এই নিয়োগের দায়িত্বে ছিল পাবলিক সার্ভিস কমিশন। দেখা যাচ্ছে, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ৬৪ জনকে ভূগোল বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ডেকেছিল। এর মধ্যে ১৪ জন ছিলেন মুসলিম। রেজাল্ট বেরোবার পর দেখা গেল, ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে নিয়োগের জন্য যাদের নাম সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে একজনও মুসলিম নেই। অর্থাৎ মাদ্রাসাগুলিতে ভূগোল শিক্ষক হিসেবে একজনও মুসলিম থাকবে না।

এই বিষয়টি বাংলার শিক্ষিত মুসলিম মহলে ব্যাপক শোরগোল তোলে। বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্র&প ও ফেসবুকে এই নিয়ে প্রবল সমালোচনা হয়। প্রায় সকলেরই বক্তব্য ছিল, পশ্চিমবাংলায় এখন শিক্ষিত মুসলমানদের সংখ্যা এখন ব্যাপক হারে বেড়েছে। তা সত্ত্বেও যদি মাদ্রাসাতেও মুসলিমদের ভাগ্যে চাকরি না জোটে তাহলে তারা কোথায় চাকরি পাবে। আর পিএসসি পরীক্ষায় কেন  একজনও মুসলমান সুযোগ পেল না? মুসলিম ছেলেমেয়েরা এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক হারে পড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়,অসম, ত্রিপুরা, বিহার এমনকী দিল্লিতেও তারা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ইন্সটিটিউশনে পড়ানোর জন্য এবং গবেষক হিসেবে চাকরি পাচ্ছে। 

তবে কি রাজ্য পিএসসি-র মতে– পশ্চিমবাংলায় মুসলিমদের মধ্যে ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসায় পড়ানোর মতো প্রতিভা গড়ে ওঠেনি! এ ছাড়া পিএসসি ও ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলিতে আরবি পড়ানোর জন্য শিক্ষক চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। প্রচুর ছেলেমেয়ে আবেদনও করেছিল। কিন্তু পিএসসি পরীক্ষা নিয়ে তাদের মধ্যে মাত্র একজন আরবি শিক্ষক নিয়োগ করে। পিএসসি জানায়– বাকি ১১টি পোস্টে কেউই যোগ্য কোনও আরবি শিক্ষক পাওয়া যায়নি। যখন পশ্চিমবাংলার আলিয়াসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবির অধ্যাপক পাওয়া যাচ্ছে, পিএসসি আরবি পড়ানোর মতো যোগ্য শিক্ষক পাচ্ছে না! স্বভাবতই আরবি শিক্ষকের পদে কেবলমাত্র মুসলিম প্রার্থীরাই আবেদন করেছিল। 

আগে অবশ্য বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ থাকার সত্ত্বেও পরীক্ষার পর বলা হত, ‘যোগ্য কোনও তপশিলি প্রার্থী এই পদের জন্য পাওয়া গেল না’। পরে ব্যাপক আন্দোলনের পর পরিস্থিতি খানিকটা পালটায়। মনে হচ্ছে মুসলিমদের ভাগ্যেও একই পরিণতি হতে চলেছে। 

ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসা হলেও মাদ্রাসার ভাবধারা বজায় রাূা যে আগামীতে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে, তা শিক্ষক নিয়োগ দেূেই বোঝা যাচ্ছে বলে একাধিক শিক্ষক সংগঠন ও বুদ্ধিজীবী মহল মন্তব্য করেছে। 

পিএসসি-র নির্বাচনে একজন মুসলিমও মাদ্রাসায় ভূগোল পড়ানোর জন্য যোগ্য বিবেচিত না হওয়ার বিষয়টিকে মুসলিম সমাজের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। কিছু অধ্যাপক ও সমাজসেবী এ বিষয়টি নিয়ে আরটিআই করে তথ্য চেয়েছেন। 

ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পিএসসি এবং মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের কাছে আরটিআই করে তাঁরা এ সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছেন।

আইটিআই-এ জানতে চাওয়া হয়েছে, পিএসসি’র ভূগোল বিষয়ের ইন্টারভিউয়ে কারা ছিলেন? চাকরির বিজ্ঞাপনে দেওয়া হয়েছিল, ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসায় শিক্ষকতার জন্য ইসলামিক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। নিয়োগের ইন্টারভিউয়ে ইসলামিক জ্ঞানের বিষয়গুলি কে বা কারা যাচাই করেছিলেন? সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নিয়ম থাকে না। এই নিয়োগের ক্ষেত্রেও তাই ছিল? এই মাদ্রাসাগুলি কি সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান?  কোন নিয়মে পিএসসি মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক 

নিয়োগ করছে? 

 মাদ্রাসা শিক্ষা অধিকর্তা আবিদ হোসেন বলেন– ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলি পুরোপুরি সরকারি। রাজ্যের সরকারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের মতো ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্বও পিএসসিকে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসাগুলিও যেহেতু সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান। তাই এতে কারও সংরক্ষণ নেই। সাধারণ নিয়মেই নিয়োগ করা হয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলির জন্য সমস্ত বিষয়ের শিক্ষক চাওয়া হয়েছে। সেই তালিকা অনুসারে আরবি বিষয়ের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ জনকে। পদ ছিল ১২টি কিন্তু পিএসসি মাত্র একজনকে যোগ্য মনে করেছে। ফলে আরবিতে বাকি ১১টি পদ খালি রয়েছে। বিজ্ঞান বিষয়ে ১২ জনকে নিয়োগ করা হয়েছে, এর মধ্যে ৫ জন মুসলিম। গণিত বিষয়ে ১২ জনের মধ্যে ৫ জন মুসলিম। ইংরেজি বিষয়ে ১২টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এর মধ্যে ৫ জন মুসলিম।

অনেকের বক্তব্য, এই মাদ্রাসাগুলি সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান বলে মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর জানিয়েছে।  তবে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে সংখ্যালঘুদের কোনও ভূমিকা পিএসসি রাূেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ইসলামি জ্ঞান থাকা বাধ্যতামূলক। 

আবিদ হোসেন বলেন, ইসলামি জ্ঞান নিয়ে ইন্টারভিউয়ে তেমন কোনও প্রশ্ন করা হয়নি। তিনি বলেন, নিয়োগের ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের অর্থাৎ রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি থাকলেও তাঁদের ওই বোর্ডে বসে থাকা ছাড়া কোনও ভূমিকা ছিল না। কারণ, পিএসসি একটি স্বশাসিত সংস্থা। নিয়োগের সিদ্ধান্ত সবটাই পিএসসিই করে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া মেধাভিত্তিক হয়েছে বলে দাবি করেন আবিদ হোসেন।

ইংরেজিমাধ্যম মাদ্রাসা নিয়োগ প্রসঙ্গে বঙ্গবাসী কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ আবদুর রহিম জানান, মাদ্রাসার চরিত্র বজায় রেূে শিক্ষক নিয়োগ হওয়া উচিত। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only