বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

অগ্নিযুগের কবি নজরুল



বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদিরামের ফাঁসি, আলিপুর বোমার মামলায় বিপ্লবীদের অভিযুক্তকরণ, জালিয়ানাওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড এবং তার প্রতিবাদে বিশ্বকবির নাইট উপাধি ত্যাগ, মহাত্মা গান্ধির হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির আদর্শ হিসেবে খিলাফত-অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে বাংলা যখন উত্তাল তখন ‘বিদ্রোহী’ ও অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ১৯২২ সালে ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয়। অগ্নিযুগের প্রতীক হিসেবে বিদ্রোহী কবিতাটি সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই অগ্নিবীণা বইটি নজরুল অগ্নিযুগের বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন।   


ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলের ছিল সীমাহীন ক্ষোভ, ঔপনিবেশিক শোষণ কবির হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। ব্রিটিশ অপশাসনের অবসান ঘটানোই তাই তিনি জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় তিনি সেই  কথাই লিখে গিয়েছিলেন। তাঁর ‘সর্বহারা’ বইতেও আমরা রাজনৈতিক বিপ্লবের বাণীর কথা দেখতে পাই। 


১৯২২ সালে নজরুলের সম্পাদনায় ‘ধূমকেতু’ পত্রিকাটিতে সর্বপ্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা দাবি করা হয়। অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে হিংসার ঘটনা ঘটলে গান্ধিজি আন্দোলন বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা করাতে জনসমাজ হতাশাতে নিমজ্জিত হয়। এই পরিস্থিতিতে জনসমাজকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবে তিনি ‘ধূমকেতু’ নামে এক পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। 


এই পত্রিকার দীপালী সংখ্যাতে ‘মেয় ভূখা হুঁ’ প্রবন্ধ পড়ে ব্রিটিশ সরকারের নজর পরে তাঁর রচনার ওপর। তবে পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমন’-এর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে সরকার রাজদ্রোহের মামলা আনেন। আদালতের বিচারে নজরুল সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। আদালতে জবানবন্দিতে তিনি বলেন যে, ‘দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এতো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না।’ 


প্রথমে বিচারাধীন অবস্থাতে নজরুল প্রেসিডেন্সি জেলে  ছিলেন, পরে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, হুগলি জেল এবং অবশেষে বহরমপুর জেলে কারাবাস কাটিয়ে এখান থেকে মুক্ত হন। হুগলি জেলে রাজনৈতিক বন্দি ও সাধারণ কয়েদীদের মধ্যে কোনও পার্থক্য ছিল না। এই জেলের সুপার অত্যাচারি এবং দুর্ব্যবহারের জন্য অখ্যাত ছিলেন। এই অত্যাচারি সুপারকে বিদ্র‍ূপ করার জন্য রবীন্দ্রনাথের ‘তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে’ কবিতাটির সুপার রচনা করে একটি প্যারডি লেখেন নজরুল। 


জেলের ভিতর স্থান আস্বাস্থ্যকর ছিল, খাবার ও ছিল অখ্যাদ্য। বিভিন্ন প্রকারের শিকল দিয়ে নজরুল ও তাঁর সাথীদের বেঁধে রাখা হত, যা ছিল অমানবিক। ভাঙার গান ও দুঃশাসনের রক্তপান ইত্যাদি গান ও কবিতা তিনি রচনা করেন জেলেতেই। তাঁর কারাগারে থাকাকালীন ‘দোলন চাঁপা’ প্রকাশিত হয়।


জেলে এই অমানবিক আচরণ ও অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটকটি নজরুলের নামে উৎসর্গ করে জেলে পাঠিয়ে ছিলেন এবং সাহিত্যের স্বার্থে তাঁকে অনশন ত্যাগের আবেদন জানিয়েছিলেন। প্রায় ৩৯ দিন টানা অনশনের পর বিরজাসুন্দরী দেবীর কাতর অনুরোধ মেনে লেবুর জল খেয়ে অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।    

সৌপ্তিক অধিকারী

সোনারপুর, কলকাতা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only