বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

উনুনের আঁচ থেকে স্বস্তি, এবার বইয়ের বেষ্টনীতেই মনোরঞ্জন



 আসিফ রেজা আনসারী

জীবনের একটা অধ্যায় যেমন কেটেছে নকশাল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, তেমনি সাহিত্য সাধনার সময়কালটাও দীর্ঘ। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা আকাদেমি-সহ একাধিক নামিদামি সংস্থার পুরস্কার। ১৯৯৭ সালে মুকুন্দপুরের হেলেন কেলার বধির বিদ্যালয়ে রান্নার কাজ পেয়েছিলেন। কিন্তু বয়সের ভারে ক্লান্ত হয়ে উঠছিলেন প্রায় সত্তরোর্ধ্ব মনোরঞ্জন ব্যাপারী। শরীর তেমন সায় দিচ্ছিল না। অন্যদিকে, প্রেসার-সুগারের সমস্যা রয়েছে, দু’টো হাঁটুই প্রতিস্থাপিত হয়েছে। তাছাড়া ছানির অস্ত্রোপচার করা হয়েছে দু’চোখে। 


এ দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে আগুনের সামনে ভারী কাজ করতে বারণও করছিলেন। তবু পেট চালাতে দীর্ঘ ২৩ বছর ওই কাজ করতে হয়েছে। সে কথা জানিয়েই বিকাশ ভবন থেকে নবান্ন দরবার করেছেন বহুবার। সে কথা গিয়ে পৌঁছয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কানে। তিনিই উদ্যোগ নেন। মঙ্গলবার মনোরঞ্জনবাবুকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিদ্যানগর জেলা গ্রন্থাগারে নিয়োগ করা হয়। এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী।


এক প্রশ্নের জবাবে মনোরঞ্জন ব্যাপারী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে তিনি সরকারি বদলির নির্দেশের কপি হাতে পেয়েছেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকেই নতুন জায়গায় কাজে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে আছে তাঁর। তিনি মুখপুস্তিকায় লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, শুভচিন্তক, সহায়তাকারী, দরদি, বন্ধু, আপনজন, একটা ভয়াবহ অন্ধকার দুঃসহ কালপর্ব পেরিয়ে আগামীকাল আমার জীবনে একটা নতুন সূর্য উঠবে। সেই যে ছোট্ট ডোবাটা জলাভাবে শুকিয়ে গিয়েছিল, জলচর প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি করছিল, কাল ঝরঝর করে বৃষ্টি নামবে।’ 


রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বাংলার দিদিকে। যিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে আমার সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। এই তুচ্ছ অনুরোধ নিয়ে বছরের পর বছর আমি এ অফিস থেকে ও অফিসে ছুটে বেড়িয়েছি। আমার আস্থা, বিশ্বাস, ভরসা ছিল একমাত্র দিদির ওপর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দাদা আমার খবর দিদির কানে পৌঁছে দিয়েছেন।’ 


তিনি আরও লিখেছেন, ‘আজ এই দিনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি বাংলা আকাদেমির সভাপতি শাঁওলি মিত্র দিদিকে। উনি সেই ২০১৪ সাল থেকে কতশত জনকে যে আমার জন্য বলেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই দাদা অনন্ত আচার্যকে। আমার জন্য উনি ৮৬ বার বিকাশ ভবনে গেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছেন অফিসারের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য। আমি কৃতজ্ঞ অধ্যাপক ভাই একরামূল হকের প্রতি। আমার একটা ভাল কিছু হোক এই জন্য পাগলের মতো এক মন্ত্রীর দফতর থেকে আর এক মন্ত্রীর দফতরে দৌড়ে বেড়িয়েছে।’


সালটা ১৯৫৩। বাংলাদেশ ছেড়ে এ দেশে চলে আসেন মনোরঞ্জনবাবু। সেই থেকে ঠাঁই হয় উদ্বাস্তু ক্যাম্পে। বয়স যখন ১৪-র কোঠায় তখন পেটের টানে দণ্ডকারণ্যে পাড়ি জমান। জড়িয়ে পড়েন নকশাল আন্দোলনে। একসময় ঠাঁই হয় শ্রীঘরে। জেল থেকে বেরিয়ে রিকশা চালানো শুরু করেন। ঠিক এই সময়েই জীবনে নতুন মোড় আসে। একদিন তাঁর প্যাসেঞ্জার হিসাবে মহাশ্বেতা দেবীর সংস্পর্শে আসেন। তারপর থেকেই লেখালেখি শুরু করেন তিনি। ‘নমঃশুদ্র’ মনোরঞ্জনের বিখ্যাত বই ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ পাঠক মহলে ব্যাপক পরিচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only