বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

বাঙালিকে মন খুলে হাসতে শিখিয়েছেন ‘একাই ১০০’ ভানু

অগ্নিযুগে বিপ্লবী দলে ভিড়েছিলেন দীনেশ গুপ্তর হাত ধরে। নেমেছিলেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনে। স্বাধীনতার এক বছর আগে থেকে শুরু অভিনয়। বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর প্রিয় ছাত্র ভানু এরপর বাঙালিকে হাস্যরসে মু? করে গিয়েছেন। ২৬ আগস্ট সেই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের শতবর্ষ পূর্তিতে স্মরণ করলেন প্রদীপ মজুমদার

ছিলেন সাম্যময়, হয়ে গেলেন ভানু। বাংলা চলচ্চিত্রে সূর্যের মতোই দীপ্তি ছিল তাঁর। বাঙালিকে প্রাণ খুলে হাসতে শিখিয়েছেন। তিনি নিজেকে নিয়ে মজা করে বলতেন, ‘ছিলাম বাড়‍ুজ্যে, হয়ে গেলাম ভাঁড়‍ুজ্যে’। তবে বাঙালি জানে, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনে কখনও ভাঁড়ামি করেননি। তাঁর কমিকে ঝলসে উঠেছে মেধার দীপ্তি, সমকালের সংকটের টুকরো টুকরো দৃশ্য। যদিও বাঙালির শ্রেষ্ঠ কমিডিয়ান ছাড়াও তিনি হতে পারতেন অনেক কিছুই। অধ্যাপক, শিক্ষক কিংবা স্বদেশী আন্দোলনের বিপ্লবী। অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের সঙ্গে মেলামেশা, খবরা-খবর দেওয়া কিংবা স্কুল-কলেজে যাতায়াতের পথে টিফিনবক্সের মধ্যে রিভলবার পৌঁছে দিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরাও পড়তে পারতেন। যেতে পারতেন কারাগারে।


কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকার বিক্রমপুরের ছেলে, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রিয় ছাত্র সাম্যময় হয়ে উঠলেন গোটা বাঙালির প্রিয় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও জীবনে অন্যান্য সব সম্ভাবনাগুলোর সঙ্গেও তাঁর বিচ্ছেদ  হয়নি কখনও। তাই খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছে যাওয়ার পরও একসময় তাঁকে একঘরে করে দিয়েছিল চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি। কারণ তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, নতিস্বীকার করেননি, নিজের অবস্থান বদলাননি। আদর্শ থেকেও বিচ্য‍ুত হননি। সেই সময় পাঁচ পাঁচটা বছর সিনেমায় কাজ পাননি। তবে মাথানত না করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে যাত্রাপালায় অভিনয় করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তাঁর অন্তরে যে বিপ্লবীর মন্ত্র। আদর্শ ছিলেন শহিদ দীনেশ গুপ্ত। বিনয়-বাদল-দীনেশের সেই দীনেশ। যে বিপ্লবীর সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেক জায়গায়। যাঁর সাইকেলের পেছনে বসে ছুটে বেড়িয়েছেন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।


বুধবার একশ বছর জন্মদিবস অতিবাহিত হল। শতবর্ষে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে শহরে অনেক অনুষ্ঠান হওয়ারই সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু করোনা আবহে তেমন কিছু হতে পারল না। বাঙালি সমবেতভাবে স্মরণ করতে পারল না দুই বাংলার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কৌতুকশিল্পীকে। ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট ঢাকার বিক্রমপুরে জন্ম। বাবা জীতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নবাবী এস্টেটে উঁচু পদে চাকরি করতেন। মা সুনীতিদেবী সিনিয়র কেমব্রিজ পাশ করা প্রথম মহিলা স্কুল পরিদর্শক। বাবা নাম রাখলেন সাম্য নয়। যদিও জনমনে সেই নামের চিহ্নমাত্র নেই।


মুন্সিগঞ্জ কাজির পাগলা এ.টি ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা সেরে ভানু প্রথমে ভর্তি হলেন ঢাকার পোগোজ স্কুলে। এরপর সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল হয়ে জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ পাশ করলেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তখন আক্ষরিক অর্থেই চাঁদের হাট। বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর প্রিয় ছাত্র ছিলেন ভানু। ছিলেন কবি জসীমুদ্দিন ও মোহিতলাল মজুমদার, রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো শিক্ষকদের স্নেহধন্য। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কেবলমাত্র ভানুই বিজ্ঞানী সত্যেন বসুকে ‘সত্যেনদা’ বলে ডাকতেন।


সত্যেন বসুর বাড়িতেই ভানুর কৌতুক নকশার সূচনা। তাঁর জন্মদিনে দেখা করতে আসতেন বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা। সেই নক্ষত্র সমাবেশে কৌতুক বলার ডাক পড়ত ভানুর। সত্যেন বসুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভানুর প্রতি ছিল অটুট স্নেহ। ভানু যখন বিখ্যাত চিত্র তারকা, তখনও মাঝে মধ্যে সত্যেন বসুর ডাক পড়ত। প্রবীণ মাস্টারমশাই বলতেন, ‘মাথা যে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, একটু রস ঢেলে দিয়ে যা, জীবদ্দশায় পরিচিত জনদের কাছে বহুবার ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সত্যেন বসু ও বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তর কথা বলতেন। কিশোর বয়সেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল দীনেশ গুপ্ত এবং চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক অনন্ত সিংহ’র সঙ্গে।


দীনেশ গুপ্তর মৃত্য‍ুর পর ভানুর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে অনুশীলন সমিতির সঙ্গে। ঢাকায় এই বিপ্লবী সংগঠন ছিল বেশ শক্তিশালী। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ১৯৪১ সালে পুলিশের নজরে পড়ে যান ভানু। একটি রাজনৈতিক হিংসায় তাঁর নাম জড়ায়। গ্রেফতারি এড়াতে ঢাকা ছাড়তে হল তাঁকে। একজনের গাড়ির পিছনের সিটের নিচে শুয়ে চলে এলেন কলকাতায়। ততদিনে অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের একটি বড় অংশ কমিউনিস্ট হয়ে উঠেচেন। তৈরি হল বামপন্থী দল আরএসপি। ভানু সেই দলে নাম লেখালেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিলেন। তবে কলকাতায় আসার পর শুরু হল নতুন জীবন সংগ্রাম।  


কলকাতায় অভিনয় শিল্পী হিসাবে ভানুর আত্মপ্রকাশ অবশ্য স্বাধীনতার আগের বছর, ১৯৪৬ সালে। চন্দ্রগুপ্ত নাটকে চাণক্যের ভূমিকায় ওই বছরই বিয়ে করলেন বেতারশিল্পী নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিয়ের পরই প্রথম সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ এলো। পরপর ‘মন্ত্রমু?’, ‘বরযাত্রী’, ‘পাশের বাড়ি’, জনপ্রিয় হয়। তবে ১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ভানুকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বাংলা চলচ্চিত্রে তিনিই একমাত্র অভিনেতা, যিনি মহানায়কের তকমা না পেলেও তাঁর নিজের নামে একাধিক সিনেমা হিট হয়েছে। ‘ভানু পেল লটারি’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ তারই নিদর্শন। তিনি তাঁর নিজস্ব সত্ত্বায় বিশুদ্ধ ঢাকাইয়া বাংলাকে ব্যবহার করে চলচ্চিত্রে অন্যমাত্রার সঞ্চার করেন। 


সেই থেকে তিনি বাঙালিকে প্রাণ খুলে হাসতে শিখিয়েছেন। তাঁর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর সংলাপ ‘মাসিমা মালপোয়া খামু’ আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। তাঁর কৌতুক নকশার রেকর্ডগুলো এখনও বাঙালির বিষাদ মুক্ত করে। তবে তিনি ভাঁড় ছিলেন না। কৌতুক করলেও, অন্তরে ছিল সমাজতন্ত্রের দৃঢ় প্রত্যয়। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তর স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানিয়ে একবার তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘ভগবান তোমার লীলা বোঝা ভার! তুমি আত্মার নিজস্ব কোনও শক্তি দিলে না কেন! দিলে দীনেশদার আত্মা এখনকার বাকসর্বস্ব, অসৎ রাজনীতিওয়ালাদের ম‍ুণ্ড‍ু ছিঁড়ে ফেলতেন।’


৬২ বছর বয়সে ১৯৮৩ সালে তাঁর প্রয়াণ ঘটে। যদিও চিরকাল বাঙালিকে প্রাণ খুলে হাসাবে তাঁর রেখে যাওয়া কৌতুক নকশা আর ঢাকাইয়া সংলাপগুপো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only