রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০

ইয়াওমে আশুরা দিবসে মুসলমিরা কেন রোযা রাখেন, শোকাতুর হন

আজ পবিত্র ইয়াওমে আশুরা। ইসলামি ইতিহাসের ঘটনাবহুল এই দিনে বিশেষভাবে ইবাদাতের তগিদ রয়েছে। তবে করোনা অতিমারির কারণে এবার ইরাক, ইরাক, লেবাননের মতো শিয়া প্রধান দেশগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সরকারি নির্দেশিকা জারি করেছে। যাতে বিশেষ করে কারবালা প্রান্তরের বিয়োগান্তক ঘটনার শোক প্রকাশের লক্ষ্যে জমায়েত না হয়। তবে বহু নবী-রাসূলগণের সঙ্গে আশুরা দিবসের যে স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, সেই পরম্পরায় কাকতালীয়ভাবে হলেও এই দিনেই কারবালার ইতিহাস রক্তে লেখা হয়। তাই শিয়া নেতারা বলছেন, এদিন শোক-মাতম নিয়ে বেশি মাতামাতি করলে আশুরার প্রকৃত মাহাত্ম্য বিনষ্ট হয়। এসব থেকে বিরত হয়ে বরং রোযা এবং অন্যান্য শরয়ী ইবাদাতের মাধ্যমে আশুরা পালনের নিদান দিয়েছেন তাঁরা। এ নিয়ে লিখেছেন আবদুল ইল্লা আস-সাদি

ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ঘটেছিল এক মহা বিয়োগান্তক ঘটনা। মুহাররম মাসের ১০ তারিখ আখেরী নবী সা.-এর দৌহিত্র হুসাইন রা.-কে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল ইয়াজিদবাহিনী। ইসলামের ইতিহাসে আশুরা দিবসে এই রক্তেলেখা অধ্যায়কে স্মরণ করেই এদিন মুসলিম উম্মাহ শোকাচ্ছন্ন হন। মহানবী সা.-এর ওফাতের ৫০ বছর পর সেই কালো দিনটিতে হযরতইমাম হুসাইন রা. সপরিবারে ও সপারিষদে মোট ৭২ জন শাহাদাত বরণ করেন।

উল্লেখ্য, ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুসারে আরবি হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররম। এই মাসের ১০ তারিখ হল ইয়াওমে আশুরা। আল্লাহর বিধান মোতাবেক ৪টি পবিত্র ও সম্মানিত মাসের একটি হল এই মাস।

ঘটনাবহুল আশুরা দিবসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নবী নূহ আ. ও তাঁর উম্মতরা ভয়াবহ প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। মিশরীয় স্বৈরশাসক বাদশাহ ফেরাউনের অকথ্য যুলুম থেকে নবী মুসা আ.-কে মুক্ত করেছিলেন আল্লাহ্তায়ালা। মানবজাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আ.-কে দাজ্জাল শাসক নমরুদের অগ্নিকুণ্ডলী থেকে হেফাজত করেন আল্লাহ্।


মুহাররমের ১০ তারিখে এ রকম বহু নবী-রাসূলগণের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাসমৃদ্ধ ইতিহাস জড়িয়ে রযেছে। মক্কা থেকে হিজরত করে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা. মদিনা গিয়ে দেখেন বনি ইসরাইল বা ইহুদিরা ১০ই মুহাররম রোযা রাখে। তাই তিনি ইরাদা করেন, আগামী বছর হায়াতে থাকলে ইহুদিদের থেকে একটু ব্যতিক্রম করে ৯ ও ১০ মুহাররম রোযা রাখবেন। সেই মতোই আজও উম্মতে মুহাম্মদী ইয়াওমে আশুরা উপলক্ষ্যে দুদিন বা তিনদিন রোযা রাখেন। উল্লেখ্য, অনেক আগে থেকেই আশুরার রোযা রাখার প্রচলন ছিল।


তবে শিয়া মুসলিমদের কাছে এই দিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। ইরাকের ফুয়াত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে হুসাইন ইবনে আলি আল-হুসেন, তাঁর পরিবার ও সঙ্গীসাথীদের গণহারে শাহাদাত হাসিলের দিনটিকে স্মরণ করেন শিয়ারা। কারবালাস্থিত ইমাম আল-হুসাইনের রওজা মুবারকেও এই বিশেষ দিনে সফর করেন শিয়া মুসলিমরা। সিয়ামরতম অবস্থায় সেখানে গিয়ে তাঁরা জিয়ারত-ইবাদাত এবং শোক প্রকাশ করেন। তবে এ বছর করোনা অতিমারীর কারণে ইরাক ও ইরান সরকারিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আশুরা পালন ও স্মরণে নির্দেশিকা জারি করেছে। যাতে বলা হয়েছে, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং সহ যাবতীয় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে শিথিল জমায়েত করতে হবে।


চলতি মুহাররম মাসের প্রথমেই এ ব্যাপারে সতর্ককতামূলক ব্যবস্থা নিতে ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাঈদ নামাকি’কে চিঠি দেন সে দেশের মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের সংগঠন। তাঁদের দাবি ছিল, কোভিড ইস্যুকে সামনে রেখে এবার আশুরার জমায়েত নিষিদ্ধ করা হোক। বিশেষ করে শোক প্রকাশের চিরাচরিত ধরনের ওপর যেন লাগাম টানা হয়। ইরানের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ঈশাক জাহাঙ্গিরী সম্প্রতি কোভিডে আক্রান্ত হলে ট‍ুইট বার্তায় দেশবাসীকে সতর্ক করে তিনি বলেন, এবার সম্ভবত আশুরা দিবসে শোকপালনের জমায়েত হবে না।


হিজবুল্লাহ-র সর্বোচ্চ নেতা সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ ১৭ আগস্ট এক বার্তায় শিয়া মুসলিমদের আহ্বান জানান, যাতে কোভিড ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি বিবেচনা করে পবিত্র আশুরা দিবসে ভিড় বা জমায়েত না করা হয়। তিনি এও বলেন, করোনার প্রকোপ ক্রমশই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেক মানুষ এই মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে করোনা রোগীদের যথাযথ পরিষেবা দিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। তাই পথে নেমে মিছিল বা পদযাত্রা না করে বাড়ির বাইরে, দোকানের সামনে শুধুমাত্র কালো পতাকা টাঙিয়ে এবারের মতো আশুরার শোক জ্ঞাপন পর্ব সম্পন্ন করার আহ্বান জানান তিনি।


ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুসলিমদের একটা বড় অংশ চতুর্থ খলিফা হিসেবে নবী মুহাম্মাদ সা.-এর জামাতা হযরত আলি রা.-কে সমর্থন করেছিলেন। তাহলে নবী সা.-এর পরিবারের মধ্যেই খিলাফত সীমাবদ্ধ থাকত। তাতে ইসলামি নীতিমালার যথাযথ প্রতিফলন ঘটবে। হযরত আলি ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে শহিদ হলে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান খলিফা পদে আসীন হন। মুয়বিয়ার ইন্তেকালের পর তাঁর উত্তরসূরী ইয়াজিদ পরবর্তী খলিফা হতে চান। 


কিন্তু ইয়াজিদকে খলিফার আসনে বসানোর ঘোর বিরোধী ছিলেন হযরত আলি রা.-এর পুত্র আল-হুসাইন রা.। তিনি জোরালো আপত্তি করেন। কারণ, ইয়াজিদ ছিলেন চরম ইসলাম-বিদ্বেষী। তাঁর কাজকর্মে ইসলামের নীতিমালা ভীষণভাবে লঙ্ঘিত হত। স্বভাবতই হুসাইন রা.-র অনুগামীরা বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনি ছাড়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাই যুযুধান দুই পক্ষ সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে মাথানত করতে রাজি হননি হযরত  হুসাইন রা. ও তাঁর সাথীরা। অগত্যা কারবালার লড়াইয়ে তৃষ্ণার্ত শিশুপুত্র সহ হুসাইন রা. সহ ৭২ জন ইসলামের সিপাহীকে নির্মমভাবে হত্যা করে ইয়াজিদবাহিনী। 


হযরত হুসাইন রা. ও তাঁর অনুগামীদের শাহাদাত বরণকেই শিয়া মুসলিমরা এই দিন শোকভরে স্মরণ করেন। এটা মূলত ইনসাফের পক্ষে এবং ইয়াজিদের না-ইনসাফির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বর‍ূপ। বলা যায়, কারবালার মর্মস্পর্শী ইতিহাস গণতন্ত্র কায়েম রাখার পক্ষে হুসাইন রা.-র আপসহীন লড়াই। সংগত কারণে এই অনুষঙ্গে শোক প্রকাশ ও ইয়াজিদবাহিনীর মোকাবিলায় রণকৌশলের প্রতীকি শসস্ত্র মহড়াও দেখা যায়। 


যদিও ইদানিংকালে অস্ত্রসহ মিছিল, শারীরিক কসরত ও নিজদেহকে রক্তাক্ত করার বিপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করছেন শিয়া নেতৃত্ব। কারণ, এতে করে পবিত্র আশুরার মাহাত্ম কমে গিয়ে কারবালার হত্যাকাহিনী বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই এই দিনটিতে রক্ত না ঝরিয়ে বরং রক্তদানের প্রতি উৎসাহিত করার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা। যাতে রক্তের জন্য যেসব মুমূর্ষ রোগী জীবন-মৃত্য‍ুর সন্ধিক্ষণে গুরুতর সংকটজনক অবস্থায় রয়েছেন, তাঁদের জীবন বাঁচাতে সহায়ক ও মানবিকতার নজির সৃষ্টি হয়।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only