রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০

মুসলিমরা ইউপিএসসিতে সুযোগ কেন পাবে? গোঁসা সুদর্শন টিভির

 বিশেষ প্রতিবেদন

আরএসএস নিয়ন্ত্রিত ‘সুদর্শন’ টিভি সম্প্রতি মুসলিমদের বিরুদ্ধে লাগাতার বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে। তাদের এক টিভি শোতে প্ররোচনামূলক প্রশ্ন তুলেছে, এই ধর্মের মানুষরা কেন আইএএস, আইপিএস ইত্যাদি প্রথম শ্রেণির পরীক্ষায় সফল হবে? দিল্লি হাইকোর্ট এই টিভি শো-এর ওপর আপাতত নিষেধাজ্ঞা দিলেও এক শ্রেণির মানুষ কিন্তু এই নিয়ে ধর্মযুদ্ধ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। সমগ্র বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন জ্যোতি যাদব


ভারতীয় মুসলিমরা শিক্ষাদীক্ষা ও চাকরিতে পিছিয়ে, এই পরিস্থিতি বহু পুরনো। তারা শুধু ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ করে, চাকরির জন্য পড়াশোনা করে না।

 

এই সব মন্তব্যকে ভুল প্রমাণ করে দিতে নিজদের চেষ্টায় লড়াই করে তারা যখন ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (আইএস, আইপিএস, আইএফএস ইত্যাদি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে, তখন তাতে ভয় পাচ্ছে কারা? সাভারকর ভক্ত ও সুদর্শন নিউজ চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক সুরেশ চাভাঙ্কের মতো লোকেরা। সুদর্শন চ্যানেল ইতিমধ্যেই আরএসএস-এর চ্যানেল হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।  


ইউ পি এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইএএস, আইপিএস বা আইএফএস হবেন, এমন স্বপ্ন বহু ভারতীয় যুবক-যুবতী দেখেন। কারণ একে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রসরতার একটি প্রবেশদ্বার বলা যেতে পারে। ভারতীয় স্বপ্ন ভারতীয় আদর্শ মহিমান্বিত হচ্ছে বলা হয়, যখন কোনও নিচু জাতের হিন্দু এই পরীক্ষায় সফল হয়। কিন্তু যখন একজন মুসলিম পরীক্ষা দিয়ে নিজ যোগ্যতায় সরকারি উঁচুপদে অফিসার হয়ে যায়, তখন সেটা এক শ্রেণির মানুষের কাছে শিরঃপীড়ার কারণ হয়। তারা এটাকে সহজভাবে নিতে পারে না এবং এর সঙ্গে ‘জিহাদ’ শব্দটি লাগিয়ে দেয়। 


যখন ভারতীয় মুসলমানরা দরিদ্র ছিল, তখন তাদেরকে বলা হত ‘পাংচারওয়ালা’ অর্থাৎ তারা নাকি টায়ার সারাবার দোকানদারের বেশি কিছু নয়। যখন তারা নাগরিকত্বের অধিকার আদায়ের জন্য পথে নামে প্রতিবাদ করতে তখন তাদেরকে শুধুমাত্র পোশাক দেখেই চিনে নেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। যখন তারা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে, তখন পুরো সম্প্রদায়কে সমালোচনার কাঠগড়ায় তোলা হয়। অভিযোগ করা হয়, তারা আধুনিকতাকে আলিঙ্গন করতে চায় না, পিছিয়ে থাকতে চায়। যখন তারা কঠোর পরিশ্রম করে ইউপিএসসিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে তখন সেটাকে বলা হচ্ছে ‘ইউপিএসসি জিহাদ’ এবং তাদেরকে ‘জামিয়া কা জিহাদি’ আখ্যায় অভিহিত করা হচ্ছে। এই সবগুলি উদাহরণকে একসঙ্গে যোগ করলে যেটা দাঁড়ায়, সেটা একটিমাত্র শব্দে আখ্যায়িত করা যায় ‘ঘৃণা’। 


২০১৮ সালে দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামগ্রিক বিকাশ নিয়ে তাঁর মতামত জাহির করেছিলেন। বলেছিলেন, যখন মুসলিম যুবকরা এক হাতে কুরআন নেবে এবং অন্য হাতে কম্পিউটার ধরবে, তখনই ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ সম্ভব হবে।


কিন্তু সুদর্শন টিভির সম্পাদক প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে ভাগ করে নেননি। মুসলিম যুবকদের সাফল্যে তিনি খ‍ুঁজে পাচ্ছেন এক গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ। দিল্লি হাইকোর্ট ২ দিন আগে তার টিভি শো সম্প্রচারকে মুলতবি হচ্ছে করার আদেশ দিয়েছে। এই টিভি শো’তে সুদর্শন টিভির সম্পাদক নিজেকে দাবি করেছেন, মুসলিমরা যেভাবে আমলাতন্ত্রে বা ব্যুরোক্রাটদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করছে সেই ষড়যন্ত্রের নীলনকশার উদ্ঘাটন কর্তা হিসেবে। এসব তো এখন খোলাখ‍ুলি ভাবে বলা যায়। এর জন্য কোনও টেলিভিশন চ্যানেল আজকের ভারতবর্ষে দরকার নেই। হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড এর জন্য যথেষ্ট।


কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন। এই হিন্দুত্ববাদী ও ঘৃণা প্রচারকারীরা কি চান যে মুসলিমরা দরিদ্র ও অশিক্ষিত থাকুক? নাকি তারা পড়াশোনা করুক, কাজ করুক ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া গড়ার জন্য?

সুদর্শনের ক্রোধ

দিল্লি হাইকোর্ট তার ‘বিন্দাস বোল’ এপিসোড বন্ধ করে দেওয়ার আগে সুরেশ চাভাঙ্কে নিজেকে সাভারকারের ভক্ত বলে জাহির করেছেন। তারপর তিনি বাকস্বাধীনতার ওপর একটি শো চালিয়েছেন। কললাইনে সাধারণ দর্শককে আহ্বান করেছেন তাদের ‘মনের কথা’ খ‍ুলে বলার জন্য। ইসলামি ষড়যন্ত্র, গাদ্দারি, ঘুষপেটিয়া, লুঠ এই শব্দ‍গ‍ুলি তিনি সেখানে ব্যবহার করেছেন বারবার। চাভাঙ্কে সাংবাদিকতা ও তার আদর্শ যখন ব্যাখ্যা করছিলেন তখন সেটা আসলে হিন্দুরাষ্ট্র এবং অখণ্ড ভারতের আদর্শের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছিল।


সাংসদ ওয়েইসিকে হেনস্থা, ভারতে মুসলিমদের উপস্থিতি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তোলা, নেহরু, গান্ধিকে দেশভাগের জন্য দায়ী করা এবং বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক মন্তব্য উঠে আসছিল তাঁর শোতে। এগুলো হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ডিংয়ে প্রায়ই পাওয়া যায়। আইপিএস অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধেও তিনি গোঁসা প্রকাশ করেছেন যারা তার ঘৃণ্য মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সবশেষে তিনি বারবার বলেছেন যে তিনি থামবেন না এবং ‘ইউপিএসসি’ ‘জিহাদে’র নীলনকশা সবার সামনে উন্মোচিত করবেন। সেটা করবেন ‘এই আদালতের ও এই বিচারপতিদেরই’ অনুমতি পাওয়ার পর।


তাৎক্ষণিকভাবে এটা মনে হবে যে ২০১৮ সালের ইউপিএসসিতে ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে গতবছর ৫ শতাংশ মুসলিম পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ হওয়া তার ক্রোধের কারণ। কিন্তু বারবার হিন্দুরাষ্ট্রকে হাইলাইট করা এবং মুসলিমদের উপর অনিয়ন্ত্রিত আক্রমণ এটা প্রমাণ করে যে এটি একটি হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডার অংশ, যা গত ৬ বছর ধরে এ দেশে ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 


সবাইকে সন্দেহভাজন বানানো 

হিন্দুত্ববাদীরা শুধুমাত্র সেই সব মুসলিমদের সহ্য করতে পারে যারা তাদের ভাষাতেই কথা বলে। যেমনঃ রুবিকা লিয়াকত, সাঈদ আনসারীর মতো নিউজ অ্যাঙ্কার, মুক্তার আব্বাস নাকভি, আরিফ মুহাম্মদ খানের মতো নেতা। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ জারি র‍ুখতে নতুন নতুন ভিলেনের প্রয়োজন হয়। আমলাতন্ত্রের মতো শক্তিশালী ক্লাবে তারা প্রবেশ করছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো শক্ত অস্ত্র আর কি বা হতে পারে। এক ঝটকায় একজন আইপিএস অফিসার থেকে একজন কূটনৈতিক, দেশের সাধারণ হিন্দুদের চোখে সন্দেহভাজন হয়ে দাঁড়ায়। বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র,খেমচাঁদ শর্মা, সরোজিনী আগরওয়াল, আইটি সেল, সোশ্যাল মিডিয়ার হিন্দুত্ববাদী সমর্থকরা চাভাঙ্কেকে বিপুল সমর্থন দিচ্ছেন। এটা কোনও আশ্চর্যের বিষয় নয়।


সরদার প্যাটেল সিভিল সার্ভেন্টদের বলতেন ‘স্টিল ফ্রেম অফ ইন্ডিয়া’। প্রশাসনের বিরুদ্ধে বহু প্রশ্ন উঠেছে, তাদের কর্মসংস্কৃতি উন্নতির জন্য বহু দাবি-দাওয়া এসেছে বছরের পর বছর। কিন্তু সিভিল সার্ভিসকে কখনও সাম্প্রদায়িক সীমারেখা দিয়ে ভাগ করা যায়নি। সুরেশ ইউপিএসসি সিস্টেমকে প্রশ্নের ম‍ুখে দাঁড় করিয়েছেন এবং এর সম্মানহানি করেছেন। রাষ্ট্রসংঘে ভারতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার জন্য অবসরপ্রাপ্ত কূটনৈতিক সৈয়দ আকবরউদ্দিন ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিলেন, এটা আমাদের ভুললে চলবে না। তিনি সেখানে সেলিব্রিটির চেয়ে কম কিছু ছিলেন না। 


যখন ২০০৯-এর আইএএস পরীক্ষায় কাশ্মীরের শাহ ফয়সাল দেশসেরা হলেন, তখন এটাকে ভারত সরকারের একটি কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। একইভাবে কাশ্মীরের আতহার আমির খান ২০১৬-তে দ্বিতীয় হলেন দেশের মধ্যে। তারপর ২০১৯-এ শাহিদ রেজা খান বিহার থেকে ইউপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। তিনি একটি মাদ্রাসা থেকে গ্রাজুয়েশন করেছিলেন। মুসলিমদের নিয়ে যে বদ্ধমূল ধারণা প্রচলিত, সেটা ভেঙে দিচ্ছিল এই ঘটনাগুলি।


ইউপিএসসিতে সাফল্য পাওয়া ভারতীয় যুবকদের এক লালিত স্বপ্ন। বছরভর কঠোর পরিশ্রম এবং অনেকবার ব্যর্থ হওয়ার পর এই এলিট ক্লাবে কেউ প্রবেশ করতে পারেন। ধর্মের ভিত্তিতে তাদেরকে আক্রমণ শুধু সিভিল সার্ভিসের প্রতি আক্রমণ নয়, যারা বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধা ডিঙিয়ে ইউপিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছেন, তাদের সবার সাফল্যের উপরও এক প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেওয়া। এর মূল লক্ষ্য ভারতের সংখ্যালঘ‍ুদের ভারতীয়ত্বের মানচিত্র থেকে বহিষ্কার করা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only