বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২০

বিএসএফ-এর গুলিতে নিহত তরুণ, আহত ২, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রতিকার চাইবেন নিহতের পরিবার

 

রুবাইয়া, তুফানগঞ্জ­‌: রাতের খাওয়া সেরে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়িয়েছিল বছর উনিশের তরুণ সাহিনুর হক। খানিকক্ষণ বাদে আচমকা গুলির শব্দ। বন্ধুদের সামনেই লুটিয়ে পড়ে সাহিনুর। এক চেনা আশঙ্কায় ঘুম ভেঙে যায় গ্রামের মানুষের। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা যে আশঙ্কার আঁচ হামেশাই পেয়ে থাকেন। শুধু জায়গা আর চরিত্রগুলো বদলে যায়। ঘটনাগুলো তো একই।


এবারও বিএসএফ-এর ছোড়া গুলি লেগে নিহত হয়েছে ১৯ বছরের তরুণ সাহিনুর। বিএসএফের গুলিতে এক তরতাজা তরুণের মৃত্য‍ুর ঘটনায় রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় কোচবিহারের তুফানগঞ্জ। ঘটনায় আরও দু’জন জখম হয়। রবিবার রাত থেকেই লাশ ঘিরে বিক্ষোভ দেখায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। সোমবার সকালে মৃতদেহ উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশকেও উত্তেজিত জনতার রোষে পড়তে হয়। 


লাশ পোস্টমর্টামের জন্য নিয়ে জেতে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ মানুষ। ওইসময় অ্যাম্বুলেন্সেও ভাঙচুর চালানো হয়। দফায় দফায় চলে পথ অবরোধ। শেষে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ এবং স্থানীয় বিধায়কের হস্তক্ষেপে মৃতদেহ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য তুফানগঞ্জ থানায় পাঠানো হয়। সমগ্র ঘটনাটির তদন্ত চলছে। তবে এখনও ওই এলাকা থমথমে হয়ে আছে। বসানো হয়েছে পুলিশ ক্যাম্প।


ঘটনার সূত্রপাত রবিবার রাতে তুফানগঞ্জের বালাভূত গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্য বালাভূত এলাকায়। স্থানীয় ও মৃতের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বাড়ি থেকে বের হন সাহিনুর হক। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বসে অন্যান্য দিনের মতোই আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেই সময় বিএসএফের জওয়ানরা সীমান্ত ছেড়ে ওই এলাকায় আসেন। হঠাৎ সাহিনুর হক ও তার বন্ধুদের গালিগালাজ করে জওয়ানরা। ঘটনার জেরে উভয়পক্ষ বচসায় জড়িয়ে পড়ে। এরপর কয়েকটি বোমা ফাটানো হয়। 


স্থানীয়রা বলছেন, বিএসএফ-এর পক্ষ থেকেই বোমা ফাটানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সেই সময় সাহিনুর হকের হাত থেকে তার মোবাইলটি পড়ে যাওয়ায় সে নিজের মোবাইল তুলতে যায়। আর ঠিক সেই সময়ই বিএসএফ জওয়ানরা গুলি করে হত্যা করে সাহিনুর হককে। অন্যরা কোনও ক্রমে পালাতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, বিএসএফের ছোড়া গুলিতে আরও দুইজন মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে। তুফানগঞ্জ তৃণমূল বিধায়ক ফজল করিম মিঞা এই প্রতিবেদককে বলেন, সাহিনুর গরু পাচারকারী ছিল বলে যে খবর রটানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। 


রাতের খাওয়া সেরে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে পাড়ার মোড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিল ওই যুবক। এলাকার একটি উনিশ বছর বয়সি তরুণকে বিনা দোষে গুলি করে মারা হয়েছে। এর সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার। এটা মেনে নেওয়া যায় না। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ জানান, গবাদি পশু পাচারকারী ছিল এই সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে মেরে ফেলতে পারে না বিএসএফ। 


যদি কোনও ব্যক্তি হাতেনাতে ধরা পড়ে তবে আপনারা পদক্ষেপ করুন, কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে গুলি করতে পারেন না। বিষয়টি আমরা |র্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরব। এটা অমানবিক ঘটনা। আগেভাগেই আপনি কাউকে খুন করে ফেলবেন এবং তারপরে অভিযোগ করবেন যে, সে গরু পাচারকারী, এ হতে পারে না। মন্ত্রী ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিষয়টি জানিয়েছেন বলেও জানিয়েছিন।


অন্যদিকে বিএসএফের দাবি, আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতেই গুলি চালিয়েছি। এই বিষয়ে মৃতের বাবা এছা হক, মা রেহেনা বিবি অভিযোগ করেন, ‘বিএসএফ ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রামে ঢুকে আমার ছেলেকে গুলি করেছে। আমরা মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই। পুরো ঘটনার যথাযথ তদন্ত হোক। আমরা ছেলের হত্যার বিচার চাই।


ওয়াকিফহাল মহল বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ সিমান্তে মুর্শিদাবাদ, মালদা, দিনাজপুরে প্রায় বিএসএফ-এর জওয়ানরা গ্রামবাসীদের লক্ষ করে গুলি চালান কিংবা নির্যাতন করেন। এ বিষয়ে জঙ্গিপুরের সাংসদ থাকাকালীন প্রণব মুখোপাধ্যায় বেশ কয়েকবার সীমান্তরক্ষীদের এ ধরনের কাজ বন্ধ করতে সক্রিয় হয়েছিলেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only