বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২০

অসমিয়াভাষী মুসলমানরা ভূমিপুত্র হলেও বঙ্গমূল বা বাংলাভাষীরা নয়! অসমে ফের বিতর্ক উসকে দিল শর্মা কমিটির রিপোর্ট

অসমিয়াভাষী মুসলিমদের চলতি কথায় বলা হয় ‘গড়িয়া’। নিজেদের তাঁরা অসমের ভূমিপুত্র বা খিলঞ্জিয়া বলেই দাবি করে থাকেন। তবে অসমিয়া জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলো তাঁদের সেই দাবিকে গ্রাহ্য করত না। এবার ‘গড়িয়া’ অর্থাৎ অসমিয়া মুসলিমদের দাবি স্বীকৃতি পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অসমিয়া মুসলিম বা গড়িয়াদের আত্মপরিচয়ের যে দাবি দীর্ঘদিন ধরে ধ্বনিত হচ্ছে, তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে অসম চুক্তির ৬নং ধারা র‍ূপায়ণ সংক্রান্ত বিপ্লব কুমার শর্মার কমিটি। অসমিয়া ভূমিপুত্রের যে সংজ্ঞা কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত এই কমিটি নির্ধারণ করেছে ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারিকে ভিত্তি করে, তার আওতার মধ্যে রাখা হয়েছে অসমিয়া মুসলিমদেরও।


অথচ অসমে বিপুল সংখ্যক বাংলা মূলের মুসলমান বসবাস করে আসছেন স্মরণাতীতকাল ধরে, পরবর্তীকালে এঁদের বেশিরভাগই অসমিয়া ভাষাকে আপন করে নিয়েছেন। অথচ তাঁদেরকে খিলঞ্জিয়া আখ্যা দিতে রাজি হয়নি শর্মা কমিটির রিপোর্ট। এই প্রসঙ্গে অসমের বিশিষ্ট আইনজীবী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে জানান, অসমের মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন ঘটানোর গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। বঙ্গমূলের বহু মুসলমান অসমে বসবাস করছেন, যাঁদের ১০০ বছর আগেরও জমির দলিল রয়েছে। তারা কেন ভূমিপুত্র হবে না?


অসমের আদি বাসিন্দা মুসলিমদের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, অসমের আদি বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও সেভাবে কখনও তাদের দিকে কোনও সরকারই নজর দেয়নি। ফলে তাদের উপর প্রত্যাশিত উন্নয়নের আলোও পড়েনি। ধর্মীয় সংখ্যালঘ‍ুদের জন্য নির্ধারিত জনম‍ুখী প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই চলে যায় অভিবাসী মুসলিমদের দিকে। ফলে বহু ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন অসমের আদি বাসিন্দা মুসলিম বা গড়িয়ারা। এবার তাদের সামনে রেখে শুরু হয় অন্য এক রাজনীতি।


বিচারপতি শর্মার নেতৃত্বাধীন উচ্চস্তরীয় কমিটি তার রিপোর্টে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, অসমিয়া মুসলিমরা নিশ্চিতভাবেই অসমিয়া সম্প্রদায়ের অংশ। কাজেই খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্রের সংজ্ঞার মধ্যে তাদেরকেও র‍‍ুখতে হবে। শর্মা কমিটি এই তথ্যও উল্লেখ করেছে, কয়েকশো বছর আগেও অসমিয়া মুসলিমদের পূর্বপুরুষরা অসমেই ছিলেন। অতএব এটা পরিষ্কার যে তাদের পরিচিতির শেকড় অনেক গভীরে গ্রথিত। অসমিয়া মুসলিমদের মাতৃভাষা অসমিয়া এবং তারা ওই রাজ্যের সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।


অন্যদিকে, অসম চুক্তির ৬নং ধারা র‍ূপায়ণ কমিটি মনে করে, এই অসমিয়া মুসলিমদের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে অভিবাসী মুসলিমদের মূলগত পার্থক্য আছে। লক্ষ্যণীয় হল যে, শর্মা কমিটি স্পষ্টভাবে দুই ভাগ করতে চেয়েছে অসমের মুসলিমদের। সে রাজ্যের অসমিয়াভাষী মুসলিমদের খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্র হিসেবে মেনে নিলেও বাংলাভাষী বা বঙ্গমূলের মুসলিমদের পূর্ববঙ্গ বা অধুনা বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসী মুসলিম হিসেবে উল্লেখ করেছে। ওই রিপোর্টে এ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম জনস্রোত অসমের খিলঞ্জিয়াদের সামনে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকী এই ‘অভিবাসী’ মুসলিমদের চাপে নিজেদের রাজ্যেই খিলঞ্জিয়ারা সংখ্যালঘ‍ুদের পরিণত হতে পারেন। আইএমডিটি আইন নিয়ে বর্তমান ম‍ুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল বনাম ভারত সরকারের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বহির্দেশীয় আগ্রাসনের যে অশনি সংকেতের কথা তুলে ধরেছিল তারও উল্লেখ করা হয়েছে কমিটির রিপোর্টে।


শর্মা কমিটির রিপোর্টে মুসলিম বিষয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মুসলিম অনুপ্রবেশে নিম্ন অসমের জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার কথাও রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। এই রিপোর্টের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন। অসম সংখ্যাল‍ঘ‍ু ছাত্র সংস্থার দাবি, অসমের স্বাধীনতার আগে তো বটেই শতাধিক বছর আগে থেকে বাংলাভাষী মুসলমানরা বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। তাদের অস্বীকার করার প্রয়াস চলছে। আর মুসলিমদের মধ্যে যাঁদের ভূমিপুত্র বলে স্বীকার করা হচ্ছে তাঁদের সংখ্যা ৬-৭ লাখের বেশি নয়।


গুয়াহাটি হাইকোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরি এই প্রসঙ্গে বলেন, মুসলিম অনুপ্রবেশের যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে তার কোনও ভিত্তি নেই। উলটে অসমে বসবাসকারি বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলমানদের ভোটাধিকার ছাড়া বাকি সব অধিকার খর্ব করার চেষ্টা চলবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only