মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

বেইর‍ুট বিস্ফোরণে তিন সদ্যোজাতকে বাঁচিয়ে ‘জাতীয় নায়িকা’ হয়ে উঠেলেন নার্স পামেলা

বিস্ফোরণের পর থেকে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে লেবাননের রাজধানী বেইরুটে। আত্মীয়-পরিজনদের হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে আমজনতা। পদত্যাগ করেছেন তথ্য দফতরের মন্ত্রী। এমন রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে এখন ‘জাতীয় নায়িকা’ হয়ে উঠেছেন পামেলা জাইনওন। পেশায় নার্স পামেলা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিস্ফোরণের দিন পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে তিন সদ্যোজাতকে বাঁচান। পামেলা যে হাসপাতালে কর্মরত বেইরুট বন্দরে হওয়া বিস্ফোরণের আগুনে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে। তবে তাঁর বিচক্ষণতায় বেঁচে গিয়েছে, নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি থাকা তিন শিশুর প্রাণ।


পামেলা জানিয়েছেন, মধ্য বেইরুটের রমেল এলাকারা সেন্ট জর্জ হাসপাতালে তিনি কর্র্মরত। হাসপাতালের চারতলায় থাকা সদ্যোজাত বিভাগের তিনি নার্স। ওদিন বিস্ফোরণের তীব্রতায় গোটা হাসপাতাল কেঁপে উঠেছিল। সেই সময় ওই বিভাগেরই অন্য প্রান্তে তাঁর কেবিনে ছিলেন পামেলা। বিপদের আঁচ পেয়েই নিজের জীবনের পরোয়া না করেই তিনি ছুটে যান হাসপাতালের সদ্যোজাতদের জন্য তৈরি বিশেষ বিভাগ ‘নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট’-এর দিকে। 


তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের তীব্রতায় গোটা হাসপাতাল চত্বর নড়ে উঠেছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল যে, ভূমিকম্প হচ্ছে। কেবিন থেকে বের হতেই কষ্ট হচ্ছিল। হাসপাতালের সমস্ত দরজা-জানালা, চিকিৎসার সরঞ্জাম লন্ডভন্ড অবস্থায় পড়ে রয়েছিল। সকল সদ্যোজাত ও প্রসূতিদের সেখান থেকে স্থানান্তর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তবে মনে একটা জেদ চেপে গিয়েছিল, যে ওই একরত্তিদের যেকোনও উপায়ে বাঁচাতে হবে। তাই মনের সাহস জুটিয়ে ধ্বংসস্ত‍ুপ সরিয়ে হাসপাতালের অন্যপ্রান্তে থাকা নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকি। 


চারিদিকে দুমড়ে-মুছড়ে পড়ে থাকা হাসপাতালের সরঞ্জামগুলি সরাতে হিমশিম খেতে হয়। তবু হার মানিনি।  তিনি আরও বলেন, বিভাগটি আমার কেবিনের পিছন দিকে অবস্থিত। তাই ধ্বংসস্ত‍ুপ সরিয়ে কিছুটা গেলেও সমস্ত দরজা তখন বন্ধ। আমি অন্য একটি দরজা থেকে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করলে দেখি, আমার সহকর্মীরা সকলেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। তাদের মাথা, হাত-পা থেকে রক্ত ঝড়ছে। খুব ভয় পেয়ে গিয়ে ছিলাম। বাইরে আসলে কি ঘটেছে? আমরা সে সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। 

অবশেষে আমি কোনও রকমে ওই বিভাগে ঢুকতে পারি। সেই সময় এক ব্যক্তিকে দেখতে পাই। তিনি তখন তাঁর সদ্যোজাত কন্যা সন্তানকে দেখতে এসেছিলেন। তাঁকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করি। ওই ব্যক্তির সাহায্যেই ইনকিউবেটারে থাকা তিন সদ্যোজাতকে আমি বাইরে বের করে আনতে পারি। সদ্যোজাতদের কোলে নিয়ে চিকিৎসকদের সাহায্যের জন্য চিৎকার করে ডাকতে থাকি। তবে হাসপাতাল থেকে বাইরে বের হওয়া সহজ ছিল না। হাসপাতালের লিফট তখন কাজ করছে না। কোলে রয়েছে সেই তিন সদ্যোজাত। পিচ্ছিল সিঁড়ি দিয়ে অতি সাবধানে কোনও রকমে নীচে নামতে সক্ষম হই।


এরপর হাসপাতালের ইমারজেন্সি দরজার দিকে যাওয়ার সময় হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাদিম হাজলালের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। আমার কোলে সদ্যোজাতদের দেখে তিনি একজনকে কোলে নিয়ে নেন। এরপর তাঁরা দু’জনেই রাস্তায় বেরিয়ে হন্যে হয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল খুঁজতে থাকেন। নিকটবর্তী আরও একটি হাসপাতালের দিকে গেলেও সেখানেও ওই একই অবস্থা। 


দু’কিলোমিটার হাঁটার পর তাঁরা একজন স্বেচ্ছাসেবককে খুঁজে পান। তাঁর কাছ থেকে সাহায্য চাইলে তিনিও এক সদ্যোজাতকে কোলে নিয়ে তাঁদের অনুসরণ করেন। ওই শিশুদের নিয়ে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটার পর তাঁরা একটি গাড়ি খুঁজে পান। সেই গাড়িতেই বেইরুট থেকে বের হতে পেরেছিলেন তাঁরা।


উল্লেখ্য, বেইরুটের এই হাসপাতাল বিস্ফোরণ স্থল থেকে মাত্র আধ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরণে প্রায় ১৫৮ জনের মৃত্য‍ু হয়েছে। আহত প্রায় ৬০০০। মৃতদের মধ্যে এই হাসপাতালের চারজন নার্সসহ ১২ জন রোগী এবং একজন রোগীর পরিবারের সদস্য রয়েছেন। ১০০ জন চিকিৎসক, আবাসিক, নার্স এবং হাসপাতাল পরিচালন বিভাগের কর্মী আহত।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only