বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২০

ঘরে ফেরার প্রহর গ‍ুনছে ৮৪ জন বিদেশি তবলিগ-ই-জামাতের অন‍ুসারিরা

এ এইচ ইমরান

তবলিগ-ই-জামাতের অনুসারী ৮৪ জন বিদেশিকে পশ্চিমবাংলার স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রক সাড়ে চারমাসেরও বেশি সময় ধরে রাজারহাটের মদিনাতুল হুজ্জাজে আটকে রাখেন। করোনা আবহের মধ্যে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তবলিগ জামাতের মারকাজ বা হেড কোয়ার্টার্সে যে ইজতেমা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেই সময় দিল্লিতে ব্যাপকভাবে করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই কারণেই দিল্লির ক্রাইম ব্রাঞ্চ তবলিগ জামাতের এই বিদেশি অনুসারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছিলেন। ফলে টিভি, সংবাদপত্র এবং কিছু রাজনীতিবিদ করোনা প্রসারের জন্য তবলিগ-ই-জামাতের ওই ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদেরই দায়ী করতে থাকেন। পরবর্তীতে এদের নিশানা হয়ে পড়ে ভারতের সমগ্র মুসলিম সমাজ। তবলিগ-ই-জামাতের ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বিদেশি নাগরিকদের গ্রেফতার করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে আটক ৮৪ জন তবলিগ-ই-জামাত অনুগামী যারা বিভিন্ন দেশের নাগরিক, তাদেরকে কলকাতার হজযাত্রীদের জন্য গড়া মদিনাতুল হুজ্জাজে নিয়ে আসা হয়। 


বলা হয়, এদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে। যদিও সে সময় এই তবলিগ-ই-জামাতের কেউই কোভিড-১৯’এ আক্রান্ত ছিলেন না। শেষপর্যন্ত প্রায় চার মাস এই তবলিগের বিদেশি নাগরিকরা মদিনাতুল হুজ্জাজেই আটক থাকেন। বর্তমানে অবশ্য এই তবলিগ অনুগামীদের সরিয়ে এনে কৈখালির হজ টাওয়ারে রাখা হয়েছে।


কলকাতায় তবলিগ সংগঠনের কর্মকর্তারা বলছেন, পশ্চিমবাংলায় আসা তবলিগ-ই-জামাতের এই সদস্যরা ২১, ২২ ও ২৩-এ মার্চ দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের ওই অনুষ্ঠানে কোনওভাবে উপস্থিত ছিলেন না। কারণ তারা ১২ মার্চই পশ্চিমবাংলায় চলে এসেছিলেন। কিন্তু তবুও তাদেরকে দিল্লিতে ক্রাইম ব্রাঞ্চের দায়ের করা এফআইআর-এ এই ৮৪ জনের নামও অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হয়। 


এর পর গঙ্গা নদী দিয়ে বহু পানি বয়ে গিয়েছে। দিল্লি হাইকোর্টে তবলিগ-ই-জামাতের সদস্যদের মুক্তির জন্য পিটিশন দায়ের করা হয়। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে, দিল্লি ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তকারী সদস্যরা তবলিগ-ই-জামাতের আটককৃত সদস্যদের জেরা করার জন্য কলকাতায় আসেন। তাঁরা এই বিদেশিদের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের অপরাধের প্রমাণ পাননি। 


ফিরে গিয়ে তারা দিল্লি হাইকোর্টে রিপোর্ট দাখিল করেন যে, ৮৪ জন তবলিগ-ই-জামাতের অনুসারীদের জেরা করেছেন। তাঁরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, তাদের এই মামলায় আর প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া দিল্লি পুলিশ এফআরআরও (Foreigners Regional Registration Office)-কেও জানিয়ে দিয়েছে, এই বিদেশিদের বিরুদ্ধে যে লুকআউট সার্কুলার জারি করা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। 


শেষপর্যন্ত দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি রায় দেন যে, এই বিদেশিদের বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁরা এখন নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন। তবলিগ-ই-জামাতের উকিল এও জানান যে, তাঁদের মক্কেলরা নিজখরচে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য পরিবহণের ব্যবস্থা করবেন। 


দিল্লি হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, ১৪ আগস্ট ২০২০। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দিষ্ট বিভাগ এদের ফেরানোর জন্য কোনও উদ্যোগ এখনও গ্রহণ করেনি। 


ফলে বর্তমানে কৈখালির হজ টাওয়ারে এই বিদেশিরা পুলিশ প্রহরায় আটক হয়ে রয়েছেন। সাড়ে চার মাসেরও বেশি সময় এই নিরপরাধ তবলিগ অনুসারীরা আটকে রয়েছেন। ঘর-বাড়ি ও পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে, নিজেদের শিক্ষা, ব্যবস্যা-বাণিজ্য, চাকরি পরিত্যাগ করে তাঁরা অসহায় অবস্থায় দিন গুজরান করছেন। কবে তাঁরা মুক্তি পাবেন, সে সম্পর্কে কেউই তাঁদেরকে কোনও  খোঁজখবর দিতে পারছেন না। আটক এই ৮৪ ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের নাগরিকরা। এই দেশগুলির প্রত্যেকটি ভারতের বন্ধু-রাষ্ট‌্র। 


‍বর্তমানে এঁদের স্বাস্থ্যের দেখাশোনা ও খাবারের ব্যবস্থা করেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। আর হজ কমিটির ব্যবস্থাপনায় এদের থাকা-খাওয়া ও বাসস্থানের বন্দোবস্ত হওয়ায় রাজ্য হজ কমিটিও এই আটককৃত ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তাঁদের কাছেও এঁদের নির্গমনের ব্যাপারে সঠিক কোনও খোঁজখবর নেই। ফলে তবলিগ-ই-জামাতের আটককৃত বিভিন্ন দেশের এই নাগরিকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। 


কবে তাঁরা মুক্তি পেয়ে ঘরে ফিরে যাবেন, তার জন্য শুরু হয়েছে অনিশ্চিত প্রহর গোনা। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only