মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

জীবন বিপন্ন করে যাত্রীদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মালাপ্প‍ুরমের ম‍ুসলিমরা

তারা বিমানযাত্রীদের জিনিসপত্র লুঠ করেনি। পকেট থেকে টাকাও চুরি করেনি। তারা পোশাক দেখে বিপদগ্রস্ত যাত্রীদের পরিচয় জানার চেষ্টা করেনি। কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে মাথায় টুপি পরে আছে কে নেই, কার কপালে তিলক, এসব কিছুই দেখেনি মালাপ্পুরমের মুসলিমরা। বরঞ্চ নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আহত দুর্ঘটনাগ্রস্ত যাত্রীদের উদ্ধারের কাজে। সঠিক সময়ে হাসপাতালে ভর্তি করে বাঁচিয়েছে বহু জীবন। এভাবেই কেরলের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অধিবাসীদের কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা করেছেন গো এয়ারের ক্যাপ্টেন কুলবীর সিং। 


শুধু তিনি নন, নেটিজেন থেকে শুরু করে কেরলের ম‍ুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন পর্যন্ত আপ্ল‍ুত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায়। অথচ এই কিছুদিন আগেই মালাপ্পুরম খবরের শিরোনামে এসেছিল গর্ভবতী হাতি বাজি দিয়ে আহত হওয়ার কারণে। সমালোচনাও হয়েছিল খ‍ুব। কিন্তু গত শুক্রবার কোঝিকোড়ে এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস বিমান দুর্ঘটনা ঘটার পরে মালাপ্পুরমের মুসলিমদের কাজের প্রশংসা করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। এই দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন, আহত ১৭২। 

শুক্রবার সন্ধ্যায় শুহাইব বিকট এক আওয়াজ শুনতে পান। তাঁর কথায়, এমন নিনাদ আগে কখনও শুনিনি। প্রথমে আমরা ভাবি, কোঝিকোড় বিমানবন্দরের কাছে কোথাও ভূমিধস ঘটেছে। তাই সেখানে দৌড়ে যাই। প্রথমে এয়ারপোর্টের দরজা খোলা হয়নি। ২০ মিনিট পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঢুকতে দেওয়া হয়। 


তারা তখন জোর তৎপরতার সঙ্গে উদ্ধারকাজ শুরু করে। অফিসিয়াল রেসকিউ টিম পৌঁছনোর আগে স্থানীয় লোকজনই ৫০ জনের বেশি আশঙ্কাজনক যাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করে। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ২৪ বছর বয়সি মুহাম্মদ আসিফ জানাচ্ছেন, প্রথমে সেখানে যথেষ্ট সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। আমরা বুঝতে পারছিলাম না উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের হাসপাতালে নিয়ে যাব কীভাবে। ফেসবুকে এ নিয়ে একটি পোস্ট দিই, আশপাশের মানুষদের বড় গাড়ি এয়ারপোর্টে নিয়ে আসতে বলি। ১০ মিনিটের মধ্যে ৮০টি গাড়ি চলে আসে। গাড়ির পেট্রোল খরচের ভয় কেউ করেনি। অতি মহামারির কারণে আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। বেড়েছে জ্বালানির মূল্য। তবু মানবতা শব্দটির অপমান হতে দেয়নি মালাপ্পুরমের মুসলিমরা। শুধু উদ্ধারকাজই নয়, প্রয়োজনে হাসপাতালে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে রক্তও দিয়েছেন স্থানীয়রা। 


তবে সেসব ধর্ম না দেখেই করেছেন এই মুসলিমরা। পোশাকও দেখেনি। অথচ বর্তমান ভারতে ‘পোশাক দেখেই মানুষ চেনার’ পদ্ধতি চালু হয়েছে। শাফফি নামের এক বাসিন্দা জানাচ্ছেন, কোভিড-১৯ ভীতি ছিল। প্রচণ্ড বৃষ্টিও হচ্ছিল। ফুয়েল লিক হয়ে আগুন ধরার ভয় ছিল। এককথায় চরম জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও পুরো সম্প্রদায় প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এটাই তো কাজ করে দেখানোর সময়। আমরা পেরেছি, কেরলকে দেশের সামনে গর্বিত করেছি। 


আহত যাত্রীরা মাস্ক পরে আছেন কি না, তাদের ছুঁলে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে যাব কি না এসব কিছুই ভাবেননি মুসলিমরা। মুসলিমরা কাউকেই অস্পৃশ্য মনে করে না সাধারণত। কিন্তু করোনা ভাইরাস অতিমারির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে সেই শুক্রবারের রাতে সেসব কিছুকেই তোয়াক্কা করেননি তারা। ঝাঁপিয়েছেন জীবন বাঁচাতে। পরবর্তীতে উদ্ধারকারীদেরকে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হচ্ছে অবশ্য। 


সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন লিখেছেন, তারা ভাবেননি যে তাদের গাড়ির চামড়ার সিট কভারে রক্ত, কাদা মেখে যাবে আহত যাত্রীদের তুললে। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে জোরে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন আহতদের— জাত, ধর্মের তোয়াক্কা করেননি। বিশিষ্ট সাংবাদিক নিষেধ এম কে টু্ইটারে লিখেছেন, দেড় ঘণ্টায় প্রায় সব যাত্রীকেই উদ্ধার করা হয়েছে। মালাপ্পুরমের মানুষ যেভাবে তাড়াতাড়ি কাজ করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ। এই মালাপ্পুরমকেই এক বিজেপি নেতা কিছুদিন আগে ভারতের সবচেয়ে হিংস্র জেলা বলে কুমন্তব্য করেছিল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only