সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২০

‘সংসদকে প্রাঃ লিঃ কোম্পানি বানাতে চাইছে বিজেপি’



 ডেরেক ও’ব্রায়েন

৬ মাস কোভিড-জনিত বিরতির পর পার্লামেন্ট বসতে চলেছে। অনেক কিছু প্রথমবার হওয়ার সম্ভাবনা এই অধিবেশনে। সরকারি সূত্র উল্লেখ করে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখেছি যে বলা হচ্ছে, বিশাল বড় ডিসপ্লে পর্দা থাকবে, অডিওর ব্যবস্থা থাকবে, জীবাণুনাশক অতিবেগুনি রশ্মি থাকবে এবং সপ্তাহান্তও কর্মমুখর থাকবে। প্রবীণ মন্ত্রীদের মন্তব্য বিচার করে কারও সন্দেহ হবে যে পার্লামেন্টে বিরোধী স্বরকে স্তব্ধ করে দিতে অতিমারিকে ব্যবহার করবে সরকার। এখানে যাওয়ার আগে বুঝে নেওয়া যাক পার্লামেন্টের পাঁচ দিবসীয় সপ্তাহটা ঠিক কেমন। 


ছয় ঘণ্টা করে পাঁচ দিন কাজ করলে সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টা কাজের সময়। এই সময়কে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে সরকারি কাজ (বিল পাস করা) এবং বিরোধীদের প্রশ্ন করার জন্য বরাদ্দ সময়। প্রতিদিন প্রশ্ন করার জন্য রয়েছে এক ঘণ্টা সওয়াল প্রহর এবং এক ঘণ্টা জিরো প্রহর। অর্থাৎ সপ্তাহে মোট ১০ ঘণ্টা। এর সঙ্গে রয়েছে ‘স্বল্প সময়কালীন আলোচনা’ ও ‘সভার মনোযোগ আকর্ষণ’ নামে দু’টি বন্দোবস্ত। এতে পার্লামেন্টের সদস্যরা জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে উত্তর দিতে হয়। 


স্বাভাবিক সময়ে, সপ্তাহে প্রায় ১৫ ঘণ্টা হয়ে যায় এই কাজে আর বাকি পনেরো ঘণ্টা থাকে সরকারি কাজের জন্য। সহজভাবে বললে, পার্লামেন্টের সময়ের ৫০ শতাংশ সরকারের জন্য সংরক্ষিত এবং বাকি অর্ধেক শতাংশ বিরোধীদের।  এবারের পরিস্থিতিটা ব্যতিক্রমী। অতিমারির মধ্যেই আমাদের এবারের পার্লামেন্ট অধিবেশন। বিরোধী দল হিসাবে আমরা প্রতিটি কক্ষে দৈনিক ৪ ঘণ্টা অধিবেশনের জন্য প্রস্তুত? 


হ্যাঁ। সপ্তাহে ৭ দিন কাজ করতে প্রস্তুত? অবশ্যই। সওয়াল প্রহর বা কোশ্চেন ঘণ্টা তুলে দেওয়া কি আমরা মেনে নিচ্ছি? একেবারেই না। জিরো প্রহর লোপ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিচ্ছি? একেবারেই না। ‘স্বল্প সময়কালীন আলোচনা’কে কমিয়ে দেওয়াকে মেনে নিচ্ছি? না। পাক্ষিক ‘সভার মনোযোগ আকর্ষণ’-এর বিষয়টি তুলে দেওয়াকে মেনে নিচ্ছি? না। সংসদীয় গণতন্ত্রকে খুন করতে কেন্দ্র কোভিডকে অজুহাত হিসাবে আবারও ব্যবহার করতে পারে না।


যখন আমি এটা লিখছি, তখনও এমপিরা সরকারি বুলেটিন পাননি এবং সরকারি সূত্রের দেওয়া খবরের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই রিপোর্টগুলিতে বলা হচ্ছে, প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা করে প্রতিটি কক্ষ বসবে, সপ্তাহ শেষের দিন সহ। এর মানে হল, রাজ্যসভা ও লোকসভার জন্য সপ্তাহে মোট সংসদীয় সময় ২৮ ঘণ্টা। পার্লামেন্টের স্বাভাবিক ৩০ ঘণ্টায় যে সপ্তাহ তাই প্রায় রইল। এই যুক্তিতে সওয়াল প্রহর ও জিরো প্রহরকে কাটছাঁট করার কোনও কারণ নেই। 


যদি প্রাইভেট সদস্য বিলের জন্য দু’ঘণ্টা দেওয়া যায় তাহলে সমস্যা সমাধান সম্ভব। বিরোধীদের দিকে রুটির টুকরো ছুড়ে দিতে পারে না সরকার। নাগরিকরা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূল প্রত্যাশা করে প্রতি সপ্তাহে ৬০ মিনিট সওয়াল প্রহরের জন্য ব্যয় করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে এক ঘণ্টা করে জিরো প্রহর অব্যাহত রাখতে হবে। সেইসঙ্গে চলবে দৈনন্দিন সরকারি কাজ। পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে চলবে স্বল্প সময়কালীন আলোচনা ও বিকল্প সভা।


এইভাবে সরকার প্রায় ১৪ ঘণ্টা পাবে। অন্য সময়ে তারা যেমনটা পায় তার কাছাকাছি। আর বিরোধীরাও পাবে ১৪ ঘণ্টা। ট্রেজারি বেঞ্চের এমপিরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে জিরো প্রহর ও সওয়াল প্রহরে। এমনকী ‘বিরোধী সময়’-এর জন্য বরাদ্দ ১৪ ঘণ্টায়ও ছাড় দেওয়া যেতে পারে। এখন মনে হচ্ছে অর্ডিন্যান্স পাস করার দিকেই সরকারের মনোযোগ কিন্তু জনগণের স্বার্থ জড়িয়ে আছে এমন প্রশ্ন ও বিষয়গুলিকে শোনার সময় দিতে হবে। সেই সময় কেটে নিলে চলবে না। 


আরও একটা বাজে অজুহাত বাতাসে ভাসছে আর সেটা হল, সওয়াল প্রহর থাকলে মন্ত্রককে ব্রিফ করতে হবে বহু মন্ত্রণালয়ের আধিকারিকদের এবং তার ফলে তাঁদের যেতে হবে পার্লামেন্টে। আমাদের সহজ বক্তব্য হল, ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে মন্ত্রীদের কেন ব্রিফ করা যাবে না?


জনগণের পার্লামেন্টকে এম অ্যান্ড এস প্রাইভেট লিমিটেডে (এর অর্থ কী বুঝে নিন!) পরিণত করতে চাইছে বিজেপি। ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের ঐতিহ্য অনুযায়ী ‘পার্লামেন্ট বিরোধীদের’। সরকারকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য বিরোধীদের জন্য যথেষ্ট সময় বরাদ্দ রাখতে হবে। প্রতিটি দলের, এমনকী পার্লামেন্টে যাদের একটাই এমপি রয়েছে, দায়িত্ব হল মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের মহান ঐতিহ্যকে জীবিত রাখতে অংশ নেওয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only