শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০

বঙ্গাব্দ আপন হইল, হিজরি 'অপর'



নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর হিজরতের বছরকে সূচনা ধরে গণনা করা হয় বঙ্গাব্দ বা হিজরির। এ দেশে বখতিয়ার খলজি থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ বছর রাষ্ট্রীয় ভাবে হিজরি সন ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এখন ধর্মনিরপেক্ষ, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের দেশে হিজরি-স্মরণ ব্রাত্য কেন? প্রশ্ন তুলেছেন 
গোলাম রাশিদ



সংস্কৃতির প্রশ্নে সবসময় 'আধিপত্যবাদ' ব্যাপারটি চলে আসে। প্রাচ্যের জগতকে 'অপর' করে তোলা বা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, সাঈদ-চমস্কির হাত ধরে সবকিছুই উন্মোচিত হয়েছে। কিংবা, জাতীয়তাবাদের নাম করে গণতন্ত্রে কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য চেপে বসে, এমন নেহরুভিয়ান মন্তব্যও আমাদের এ ক্ষেত্রে স্মরণে রাখতে হবে। এ কথাগুলোর অবতারণা, কারণ আজ হিজরি ক্যালেন্ডারে নতুন বছরের সূচনা হচ্ছে। শুভ ১৪৪২ হিজরি। পয়লা বৈশাখ আসলে আমরা 'শুভ নববর্ষ' বলে সোশ্যাল মেসেজিংয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি, বা নিউ ইয়ারের উৎসব সেলিব্রেট করা হয়, হিজরির ক্ষেত্রে তেমন কিছু দেখা যায় না। অথচ ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার না করেই বলা যায়, বাংলা সন বা খ্রিস্টাব্দের চেয়ে হিজরি সন এ দেশে রাষ্ট্রীয় ভাবে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।ত্রয়োদশ শতকে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির শাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই হিজরিকে সরকারি কাজে ব্যবহারের শুরুয়াত, যার অবসান হয় প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর পর, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনে। মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের জন্য হিজরির বদলে সৌর সনের প্রবর্তন হয়। সেই সময় হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সমস্ত সরকারি কাজকর্ম পরিচালিত হত।হিজরি সন চান্দ্রমাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরের চেয়ে ১১-১২ দিন কম হয়। সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে প্রতি বছর ঋতুগুলি একই মাসে আসে না। কিন্তু কৃষিকাজ ও খাজনা আদায় মরশুম-নির্ভর। এ কারণে সম্রাট আকবরের সময়ে প্রচলিত হিজরি চান্দ্র ক্যালেন্ডারকে সৌর ক্যালেন্ডারে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আকবরের সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে এই নতুন ক্যালেন্ডারে গণনা শুরু হয়। ফলত ৯৬৩ হিজরি সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনার সূচনা হয়।সেই হিসেবে বাংলা সন চালু হওয়া পাঁচশো বছর অতিক্রম করেনি।আর খ্রিস্টাব্দের হিসেব ইংরেজরা এ দেশে আসার আগে নিশ্চয় চালু হয়নি।সেখানে হিজরি সন আটশো বছরের অধিক সময় ধরে এই উপমহাদেশে প্রচলিত। আর এটি শুরু হয়েছে সেই হযরত উমর রা.এর সময়কালে, ৬৩৯ খ্রিস্ট অব্দে। হিজরি ও বাংলা সনের মধ্যে কেউ আবার ভুল বুঝে আবেগ ঢালবেন না। দুটোই বলতে চায়, মুহাম্মদ সা.-এর মক্কা থেকে মদিনায় যাত্রার (এই দেশত্যাগকেই বলে হিজরত, মাইগ্রেশনও বলা যায়) কত বছর হল। পার্থক্য শুধু চন্দ্র-সূর্যের আবর্তনের সময়ে।তাই তো নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন বলছেন, ' বাঙালির চিন্তাধারার ঐতিহ্যের মধ্যে একটি গুণ হল বাঙালির সভ্যতার গ্রহণশক্তি সমন্বয়প্রীতি। ...আমাদের গ্রহণশক্তির পরিচয় বিভিন্ন ধরনের উদাহরণ দিয়ে ফয়সালা করা যায়। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দশকে সম্রাট আকবর নতুন একটি ক্যালেন্ডার স্থাপিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রচেষ্টার মধ্যে আকবরের সর্বসংস্কৃতির সমন্বয় করার প্রচেষ্টা ছিল।যে-বছর তিনি সিংহাসনে উঠলেন, সে বছরটি মুসলিম হিজরি সনে ৯৬৩ এবং হিন্দু শক বর্ষপঞ্জিতে ১৪৭৮ (যেটি ইউরোপীয় মতে ১৫৫৬ সাল)। তারিখ-ই-ইলাহি নাম দিয়ে এই ক্যালেন্ডারটি শক সনের সূর্যমুখী বর্ষ গণনা মানল; কিন্তু বছরের হিসাবটি শুরু হল হিজরি থেকে ৯৬৩ দিয়ে।এই সমন্বিত ক্যালেন্ডারটি অবিভক্ত ভারতবর্ষের অন্য কোনো অঞ্চলে বেশি দিন চলল না। কিন্তু সেটি নতুনভাবে গ্রহণ করা হল আমাদের সমন্বয়মুখী বাংলা সন হিসেবে। এর একটি আশ্চর্য ফল হচ্ছে, বাঙালি হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে সবাই এই সমন্বয়টি আজকেও মানেন। যেমন—একজন হিন্দু পূজারি যখন তাঁর কাজ এ বছরের সনটিকে আহ্বান জানিয়ে শুরু করেন, তখন তাঁর বোধহয় জানা থাকে না যে এই পুজো উপলক্ষে তিনি স্মরণ করছেন মুহাম্মদ সা.-এর মদিনা যাত্রার পবিত্র দিনের কথা।' এতসব হিসেব দিয়ে যেটা বোঝাতে চাইছি, সেই মোদ্দা কথাটা হল শকাব্দ ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে জাতীয় ক্যালেন্ডারের মর্যাদা পাচ্ছে যার সঙ্গে জুড়ে আছে বহিরাগত শকদের আক্রমণ।হিজরি তবে কী দোষ করল? সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বয়ানটাই এখানে খাটে। হিজরি ইসলামি সংস্কৃতি আর বঙ্গাব্দ বাঙালি সংস্কৃতি এই ন্যারেটিভ এখন গেড়ে বসেছে। পয়লা বৈশাখকে বিজাতীয় বলে দেগে দেওয়া যেমন রক্ষণশীলতা তেমনই হিজরিকে মুসলমানদের বছর বা আরবের সন বলাটাও সাম্প্রদায়িক ধূর্তামি। কঠিন কঠিন দাঁতভাঙা চিন, রাশিয়ার মানুষের নাম শুদ্ধ উচ্চারণের জন্য প্রচেষ্টা ষোলোআনা, কোনো অসুবিধা নেই। অথচ বাড়ির পাশের আরশিনগরের বাসিন্দাদের নাম নাকি 'কীরকম খটোমটো' আর 'আরবি'! এই যে 'বছর' বলছি। উর্দু শব্দ 'বরস' থেকে এর উৎপত্তি। 'সন' আরবি, 'সাল' ফারসি। এতকিছুর পরেও বঙ্গাব্দ আপন হবে, আর হিজরি অপর!


হিজরির সূচনা


হিজরি সন প্রচলনের আগে ঐতিহাসিক ঘটনা বা কাজের বছর অনুসারে সাল গণনা করা হত। গ্রামের দিকে এখনও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্মের বয়স জিজ্ঞাসা করলে বলেন, 'আমরা কি আর সাল-তারিখ জানি? মা বলতো, বানের বছরে জন্ম।' কেউ বলেন, বিয়ে হয়েছে জয় বাংলার বছরে। আরবেও এরকম বেশকিছু প্রসিদ্ধ মাইলস্টোন ছিল। বিদায়ের বছর,অনুমতির বছর, ভূমিকম্পের বছর, ইব্রাহিমের কাবাঘর নির্মাণের বছর বা কাবাঘর আক্রমণের বছর যাকে হস্তিযুদ্ধের বছর হিসেবে বলা হত। নবী হযরত মুহাম্মদের সা. জন্ম এই হস্তির বছরে বলে ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন। তারপর এই হস্তির বছরকেই প্রমাণ হিসেবে ধরে গণনা করতো আরবরা। এরপর এল সেই দিন। তখন (৬৩৯ খ্রি.) ইসলামি জাহানের খলিফা হযরত উমর রা.। তাঁর কাছে যেসব নথি বা পত্রাদি আসতো তাতে মাসের উল্লেখ থাকলেও সনের উল্লেখ থাকত না। ফলে তাঁর মনে হল, এগুলো কোন বছরের পরে তা কীভাবে বুঝব? এই চিন্তা তাঁর মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন আবু মুশা আশয়ারি রা.-ও। এরপর এর সমাধান নিয়ে বৈঠক বসলো । হযরত আলি রা. বললেন, নতুন বর্ষগণনা চালু করতে হলে সেটা হোক মক্কা থেকে মদিনায় নবীর হিজরতের বছর থেকে। কারণ এটিই ইসলামের ইতিহাস তথা মানব সভ্যতার ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত করেছে। হিজরতের গুরুত্ব যে কতটা তা এই সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়। জ্ঞান সাধনা বা আন্দোলন, যে- কোনও ক্ষেত্রে আজও হিজরতের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। হিজরি সাল বছর বছর যেন সে কথাই বলে। হিজরি সন গণনা কোনও ব্যক্তির জন্ম বা মৃত্যুর তারিখ থেকে  শুরু হয়নি। মক্কা থেকে মদিনায় গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ও রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন মুহাম্মদ সা.। হিজরি ও হিজরত সেই অর্থে অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী। রোযা, ঈদ, কুরবানি, হজ ইত্যাদি হিজরি সন মেনেই হয়। পুরো দুনিয়ার মুসলিমরা এ ক্ষেত্রে একটি ঐক্যের নিদর্শন রেখে চলেছেন। 

এখন হিজরি নববর্ষ উদযাপনের কথা বললেই বাংলা নববর্ষের মতো ইলিশ, এসো হে বৈশাখ, অনেক সময় একটু অশরীয়তি ফ্লেভারও চলে আসে। নিউ ইয়ারের মতো তা হলে কি পার্টি দিতে হবে? এমন প্রশ্নও করে বসতে পারেন কেউ কেউ।পয়লা মুহররমে তবে খেজুর-কাবাব উৎসব হবে নাখোদায়। রেড রোড গাওয়া হবে-এসো হে মুহররম।তবে সেখানে আপনার প্রতিবেশী শামিল হবে কি? যেমনভাবে ২৫ ডিসেম্বরের পার্ক স্ট্রিট আর সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল সর্বজনীন সেকুলার উৎসবের মিলনতীর্থ হয়ে যায়, তেমনভাবে ঈদ বা এই হিজরি সন পালনে কেউ কিন্তু সর্বজনীনতা খুঁজে পাবে না। সেখানে শুঁকে শুঁকে মৌলবাদের গন্ধ ঠিক বের করা হবে। বাংলাদেশে সং্খ্যালঘু নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাপলা চত্বর ভরে ওঠে। এপার থেকে বাহবা, স্যালুট , 'পাশে আছি'র বার্তা দেওয়া হয়। রাস্তায় নামতেও কেউ দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু গণতান্ত্রিক ভারতে মসজিদ ভেঙে মন্দির উদবোধনে কেউ ভার্চুয়াল ছি ছি-টুকুও করে না।তাই খেজুর, সিমাই, লাচ্চা খাওয়ার হিজরি নববর্ষ উৎসব পরে হলেও ক্ষতি নেই। আপাতত আরবি বারোটা মাসের নাম জেনে নিয়ে কাউকে বলতেই পারেন 'হ্যাপি পয়লা মুহররম'। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ভিন্ন স্বাদের খবর

...
আপনার ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only